সেই সন্ধ্যায় আজমির দুর্গে তাঁর কামরায় একাকী আওরঙ্গজেব ভেড়ার মাংসের তন্দুরি মশলা, দই আর নান রুটি দিয়ে অতি সাধারণ রাতের খাবার খাচ্ছিলেন। খাবার চিবোতে চিবোতে তিনি তাঁর ছেলের বিদ্রোহ কিভাবে সবচেয়ে ভালোভাবে দমন করা যায় তা নিয়ে ভাবছিলেন, এমন সময় কামরার ছায়াঘেরা দরজার ঝালর কেঁপে উঠলো আর আপাদমস্তক চাদরে ঢাকা একটি মূর্তি উদয় হল। কে আসতে পারে এসময়ে না বলে কয়ে? তার হাত চলে গেল কোমরে গোঁজা ছোরার দিকে, তারপর সাথে সাথে দেখলেন তাঁর বোন জাহানারা এসেছেন। মুয়াজ্জমের শিবির থেকে ফেরার পর জাহানারাও আজমিরে তাঁর কাছে চলে এসেছিলেন। তিনি এগিয়ে কামরার আরো ভেতরে আলোর কাছে আসতেই দেখা গেল তার চোখে পানি আর দুই হাত বিক্ষিপ্তভাবে অনবরত কচলাচ্ছেন। তিনি বললেন, “আওরঙ্গজেব, আমি এইমাত্র আকবরের ব্যাপারটা শুনলাম। আমি সবসময় তাকে একজন মর্যাদাবান মানুষ ভাবতাম…বল ব্যাপারটা আসলে সত্যি না। আমার মনে হয়না আমি এটা সহ্য করতে পারবো…এটা কি করে হতে পারে…’ তার মুখ থেকে কথা হারিয়ে গেল।
‘হ্যাঁ, এটা সত্যি। আকবর বিদ্রোহ করেছে।
‘তুমি এখন কী করবে? আমরা আবার আমাদের পরিবারে রক্তপাত আর ঘৃণা আনতে দিতে পারি না..অবশ্যই না..’।
তার শক্ত মনের বোনকে এরকম ভেঙ্গে পড়তে তিনি আর কখনও দেখেন নি। আওরঙ্গজেব তাঁর বোনের দুই হাতের কব্জি ধরলেন। তার সারা শরীর কাঁপছিল, আওরঙ্গজেব তাঁর চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বললেন, ‘শান্ত হোন। আমার উপর বিশ্বাস রাখুন। আমি ইতোমধ্যেই তাকে ধরে ফেলার পরিকল্পনা করে ফেলেছি। সব ঠিক হয়ে যাবে।’
তা কেমন করে হবে?
কারণ আমি এটা করে ছাড়বো। আকবর কিংবা হঠাৎ গজিয়ে উঠা আর কেউ আমাকে ভয় দেখাবে কিংবা আমার সাম্রাজ্যকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে, তা আমি হতে দেব না। সে তার কৃতকর্মের জন্য অবশ্যই ভুগবে।
‘আকবর তোমার ছেলে, অথচ তুমি এমনভাবে তার সম্পর্কে কথা বলছো, যেন। সে একজন বাইরের লোক।
‘এখন সে আমার কাছে একজন অচেনা মানুষ।
‘আওরঙ্গজেব, দয়া করে…এত শীতল হইও না। তাকে কিছু হলেও দয়া দেখাও।
‘কেন.হব? আমার কাছ থেকে সিংহাসন দখল করার জন্য সে বিধর্মী রাজপুতদের আমার বিরুদ্ধে ভিড়িয়েছে। আমার কাছে এসে বস, আমি তোমাকে সবকিছু খুলে বলছি সে কি করেছে। তারপর ভেবে দেখো সে কঠিন শাস্তি পাওয়ার যোগ্য কি-না।’
বিদ্রোহের বিষয়টি আর এর সমর্থকদের সম্বন্ধে তিনি যা জানতেন সবকিছু বলার পর তার বোনের অস্থিরতা মনে হল একটু কমে এল। এখন আর তার দুই হাত একবার মুঠো করে আবার খুলে দেওয়া ছেড়ে স্থির হয়ে কোলের উপর পড়ে রইল। আওরঙ্গজেবের বলা শেষ হওয়ার পর কিছুক্ষণ সময় পার হওয়ার পর জাহানারা কথা বললেন, আমাকে ক্ষমা কর। তোমার মনের এই অস্থির অবস্থায় আমার এখানে আসাটা উচিত হয় নি। তবে…’ এতটুকু বলে একটু থামলেন, যেন কি ভাবে কথাটা বলবেন তা মনে মনে সাজাচ্ছেন। তারপর বললেন, “আমার অবশ্য তোমাকে কিছু কথা বলা উচিত, যা আমি জানি তুমি শুনতে চাও না।
বল।
জাহানারা বেশ ধীরে সুস্থে আর ভেবে চিন্তে তাঁর কথা শুরু করলেন আর সেই সাথে ডান হাতের আঙুল দিয়ে শালের এক প্রান্ত পেঁচাতে লাগলেন। আকবরের বিদ্রোহ করাটা ভুল হয়েছে। সম্পূর্ণ ভুল। ছেলে হয়ে এভাবে বাবাকে প্রকাশ্যে বিরোধিতা করা কোনো যুক্তি দিয়ে বিচার করা যায় না। আমি এটা তাকে বলবো, ঠিক যেরকম অনেক বছর আগে তুমি আমাদের বাবার বিরুদ্ধে একটা সেনাবাহিনী গড়ে তুলেছিলে। আর আমি–’।
‘কিন্তু সেটা সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপার। আমি যখন বাবার বিরদ্ধে গিয়েছিলাম, তখন সেটা করেছিলাম আমাদের সাম্রাজ্য রক্ষা করার জন্য। তিনি দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন আর দারা আর তার খারেজি মতবাদে প্রভাবিত হয়ে পড়েছিলেন। এটা ছিল আল্লাহর প্রতি আমার কর্তব্য।
এ বিষয়ে আমরা কখনও একমত হতে পারবো না, তবে পুরোনো যখম খুঁচিয়ে তোলার এখন সময় নয়। তুমি কর্তব্যের কথা বলছো? বর্তমান আর ভবিষ্যৎ ঝগড়া নিবারণ করা কী আমাদের কর্তব্য নয়? আমি তোমাকে সাহায্য করতে পারি…যদি আমরা একসাথে কাজ করি তাহলে এই বিদ্রোহ শুরু হওয়ার আগেই আমরা থামাতে পারি। আমাকে আকবরের শিবিরে যেতে দাও…আমি তাকে দেখাবো সে কিরকম ভুলভাবে চালিত হয়েছে।’
না। আমি এটা সম্পূর্ণ নিষেধ করছি।
জাহানারা দমে গেলেন। আওরঙ্গজেবের চেহারা একগুঁয়ে দেখাল। জাহানারার মনে পড়লো ছোটবেলায় তিনি এরকমই জেদি ছিলেন। তিনি বললেন, তুমি যদি আমাকে কিছু করতে না দাও, তবে দয়া করে বেশি দেরি হওয়ার আগেই তুমি নিজে তোমার তরফ থেকে মিটমাটের প্রথম পদক্ষেপটি নাও। যদি এটা কর, আমি নিশ্চিত আকবর আর রাজপুতরাও আসলে এতে সাড়া দেবে। তারা হয়তো ইতোমধ্যে এ ধরনের তাড়াহুড়া করার জন্য আফসোস করছে।
‘তুমি যা করতে বলছে, তা করলে আমাকে ওরা দুর্বল মনে করবে। বিদ্রোহীদের প্রতি এগিয়ে যাওয়াটা আমার কাজ নয়। বরং তাদেরকেই আত্মসমর্পণ করে উচিত বিচারের জন্য নিজেদেরকে উপস্থাপন স্বীকার করতে হবে, যাতে পুরো সাম্রাজ্য–পুরো পৃথিবী বুঝতে পারে বিশ্বাসঘাতকের কী হয়।
যদি তাদের নেতা তোমার ছেলে হয় তাও?
বরং আরো বেশি, কারণ, সে শুধু শাসকের সাথে একজন প্রজার যে আনুগত্যের বন্ধন আছে তা ছিন্ন করে নি, সে ছেলের সাথে বাবার সম্পর্কের বন্ধনও ছিন্ন করেছে। আমি তোমাকে মিথ্যা আশ্বাস দেব না–সবচেয়ে বেশি আকবর আশা করতে পারে, তা হল তার ভাই মোহাম্মদ সুলতানের মতো বাকি জীবন গোয়ালিয়র দুর্গে বন্দী হয়ে কাটান।
