*
জানালা দিয়ে অস্তগামী সূর্যের আলো আজমির দুর্গের দেওয়ান-ই-আমের ভেতরে এসে পড়ছে আর অনেক থামের লম্বা লম্বা অন্ধকার ছায়া সাদা মার্বেল পাথরের মেঝের উপর পড়ছিল। আওরঙ্গজেব তার ছেলের সংক্ষিপ্ত চিঠিটি পড়ছিলেন। তিনি এই প্রথম আকবরের বিদ্রোহের কথা শুনলেন আর চিঠিতে যা পড়ছিলেন তা তার বিশ্বাসই হচ্ছিল না। তবে হাতের লেখা আকবরের আর সিলমোহরও তার। যতই তিনি বিষয়টা নিয়ে ভাবলেন ততই তার মনে শীতল রাগ দেখা দিল। কি করে তার এই ছেলে–যে কি-না মারওয়াড়ের বিরুদ্ধে একটি সমরাভিযানও সফল করতে পারে নি সে আওরঙ্গজেবের চেয়ে নিজেকে সাম্রাজ্য শাসন করার উপযুক্ত মনে করতে পারলো? তার কী দুঃসাহস যে, এমন বিশ্বাসঘাতকতা করে তার বাবা আর তার ধর্মের শত্রু রাজপুতদের সাথে হাত মেলাতে পারলো? তিনি সব সময় আকবরকে নমনীয় আর দুর্বল ভাবতেন, বিদ্রোহ করা তো দূরের কথা সে কখনও সবার আড়ালেও তার বাবার মতের বিরুদ্ধে কোনোদিন উঠে দাঁড়ায় নি। এটা নিশ্চয়ই রাজপুতদের বিশ্বাসঘাতকতা, তারা তাকে মহান বানিয়ে তার মতিভ্রম ঘটিয়েছে। পুরো চিঠি জুড়ে হিন্দু আর মুসলিমের মাঝে ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা আর জিজিয়া কর তুলে দেবার বিষয়ে মেকি আর লোক দেখানো ধার্মিক লোকের মতো মন্তব্য করা হয়েছে। তার মতোই একই নামের সম্রাট আকবরের প্রতি তার গভীর শ্রদ্ধা আর পানির মতো পাতলা সুফিবাদের প্রতি তার বিশ্বাসের কারণে সে রাজপুতদের কথায় সহজেই প্রভাবিত হয়ে পড়েছে। তারা তাকে আগেকার সময়ের তথাকথিত সমতা এবং ধর্মসহিষ্ণুতার দিকে ফিরে যেতে অনুরোধ করেছে।
তবে তার ছেলে তার চেয়েও বেশি মনের আসল ভাবনা গোপন রেখে চলেছিল? এটা তিনি কখনও সম্ভব হতে পারে ভাবেন নি। এটা হয়তো নীতি বিবর্জিত রাজপুতদের চতুরতা দিয়ে প্ররোচিত আবেগ তাড়িত একটি বিদ্রোহ শুধু নয়। হয়তো আকবর বেশ আগে থেকে এটা পরিকল্পনা করে রেখেছিল। সে তার ভাইদেরও তার সাথে জড়িত করেনি তো? এখন মনে পড়ে গেল তার নিজের পরিকল্পনার কথা, কিভাবে তিনি সাম্রাজ্যের একটি অংশ দেবার লোভ দেখিয়ে, তার ভাই মুরাদ আর শাহ সুজাকে রাজি করিয়েছিলেন, দারা শিকো আর তাঁদের বাবার বিরুদ্ধে তাঁর সাথে হাত মেলাতে। তার মিথ্যা প্রতিশ্রুতিতে কত সহজে তারা তার প্রস্তাবটি লুফে নিয়েছিলেন।
তবে মুয়াজ্জম বেশ সতর্ক আর আত্মবিশ্বাসহীন। মারওয়াড়িদের বিরুদ্ধে অভিযানের সময় বেশ সতর্কতার সাথে বাবার দিক নির্দেশনা মেনে চলেছিল আর রাজদরবারে সহজে মুখ খুলতে না–তাকে মনে হয় এতো সহজে সন্তানোচিত দায়িত্ব পালনের পথ থেকে প্রলুব্ধ করে কুকর্মে প্ররোচিত করা যাবে না। আর এর পরিণতিতে কী হতে পারে সে ভয়তো আছেই।
তবে আজমের ব্যাপারে কী হতে পারে? আজম আর আকবর একই মায়ের পেটের আপন ভাই আর বয়সেও কাছাকাছি, মুয়াজ্জম তা নয়। সে বেশ বদমেজাজি আর আকস্মিক আবেগে চলে। যদিও জানির সাথে বিয়ের পর মনে হয় সে একটু শান্ত হয়েছে। তবে তাঁর সেনাপতিদের সূত্র থেকে তিনি জানতে পেরেছেন যে, আজম ইতোমধ্যেই এলাহাবাদ ছাড়িয়ে তার সৈন্যদল নিয়ে গঙ্গার বুকে নৌকা বেয়ে বাংলার সুবেদারের নতুন পদে যোগ দেওয়ার জন্য চলে গেছে। এতে বুঝা যাচ্ছে আকবরের ভাইয়েরা হয়তো এতে জড়িত নয় আর এই বিদ্রোহ আসলে কেবল রাজপুত আর তার ছেলের মধ্যেই সীমিত। এই হঠকারিতার জন্য তাদেরকে অবশ্যই ভুগতে হবে।
এই পরিস্থিতিতে কী কী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে, সে সম্পর্কে ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করতে গিয়ে তিনি মনে একটি ধাক্কা খেয়ে বুঝতে পারলেন, আকবরের সেনাবাহিনী রাজপুত লুটেরা জোটের সাথে মিলে তাকে বাইরের সাহায্য থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে পারে। তার চেয়ে ভাল হবে বরং আজমির দুর্গে অবস্থান করে তাঁর সেনাদলকে দুর্গ রক্ষায় মোতায়েন করবেন, তারপর সুযোগ বুঝে লোকজনসহ এখান থেকে বের হওয়ার একটা পথ খুঁজবেন। দুর্গটি বেশ সুরক্ষিত এবং তাঁর আটশো সেনাও এখান থেকে বড় ধরনের সেনাবাহিনীর আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধ চালাতে পারবে। আজমির কোষাগার থেকে সোনা বিলিয়ে সৈন্যদের মনোবল চাঙ্গা রখার ব্যবস্থা করবেন। আর এখুনি মুয়াজ্জমকে খবর দিতে হবে, যেন সে তার সৈন্য নিয়ে অবিলম্বে তার কাছে চলে আসে, তবে তাকে এর কারণটি বলা যাবে না। তার ছেলের প্রতিক্রিয়া থেকে শীঘ্রই বুঝা যাবে এই বিদ্রোহে সে জড়িত কি-না।
এছাড়া তাকে ভেবে বের করতে হবে তার স্বপক্ষে আরো সমর্থক যোগাড় করা যায় কি-না আর সেই সাথে আকবর আর তার মিত্রদের পরিকল্পনা কিভাবে বানচাল করা যায় তাও ভেবে বের করতে হবে। লড়াইয়ের ময়দানে যেমন যুদ্ধ হয় তেমনি তা মানুষের মনেও হয়। সুতীক্ষ্ণ বুদ্ধি আর আল্লাহর সহায়তা নিয়ে তিনি যেকোনো বিদ্রোহীর চেয়ে শ্রেয়তর প্রমাণিত হবেন। এমন সময় দরজায় কেউ করাঘাত করতেই তাঁর চিন্তার সূত্র কেটে গেল। একজন কোরচি হাজির হয়ে বললো, ‘জাঁহাপনা, ইকবাল বেগ এসেছেন। তিনি এখুনি আপনার সাথে দেখা করতে চাচ্ছেন। তিনি বলেছেন তার কাছে আপনার জন্য অত্যন্ত জরুরি খবর রয়েছে।
‘তাকে বল সে অনেক দেরি করে ফেলেছে। আমি আমার ছেলের বিশ্বাসঘাতকতার সমস্ত খবর পেয়েছি আর সে ব্যাপারে ব্যবস্থাও নিচ্ছি।’
