রানার কালো চোখে আগুন জ্বলে উঠলো। একজন রাজপুতের দেয়া কথা কি সব সময় ঠিক হয় নি? তবে আপনারা যদি আমাকে সন্দেহ করেন, সেজন্য বলছি, আমার পাশে যে তরুণকে দেখেছেন সে আমার ছেলে। যদি তিনি চান, তাহলে আমার প্রতিশ্রুতির আন্তরিকতা প্রমাণের জন্য তাকে আমি শাহজাদার জিম্মায় ছেড়ে দেবো।’
অবশেষে আকবর পুরোপুরি মনস্থির করে কথা বললেন, আমি নিজেও মনে করি আমার বাবা তাঁর কর্মকাণ্ড দিয়ে সাম্রাজ্যের ক্ষতি করছেন। আপনার কথা আর আমার উপর যে আস্থা রেখেছেন তা প্রকাশ করায়, তা থেকে আমি শক্তি পেয়েছি। এখন তাহাব্বুর খান আর আমি দুজনে মিলে আপনাদের আর সাম্রাজ্যের অন্যান্য জায়গা থেকে যাদেরকে আমাদের পতাকার তলে টেনে আনতে পারবো, তাদের সকলকে নেতৃত্ব দিতে প্রস্তুত।’
শেষ পর্যন্ত কথাটি তিনি বলেই ফেললেন। তার বাবার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত এবং অপরিবর্তনীয় পদক্ষেপটি নেবার জন্য রাজি হলেন, যদিও জানেন যে, তার বাবা এজন্য কখনও তাকে ক্ষমা করবেন না। যেমন মোহাম্মদ সুলতানকে করেননি। তবে তিনি যেরকম প্রত্যাশা করেছিলেন, সেরকম ভয়ে কেঁপে উঠেন নি, বরং তার মাঝে এক নতুন শক্তির সঞ্চার হল আর সেই সাথে আত্মবিশ্বাসও জেগে উঠলো। তিনি তার বাবাকে দেখিয়ে দেবেন তাকে ছোট করে, তার সহনশীলতা আর সাম্রাজ্যের মঙ্গলের জন্য মানুষের সাথে আপস-মীমংসা আর তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করার ইচ্ছাকে অবজ্ঞা করে তিনি ভুল করেছেন।
আকবর বললেন, আমি আপনার মৈত্রীর প্রস্তাব গ্রহণ করছি। আমরা সবাই মিলে আমার পূর্বপুরুষ আকবরের সময়ে মোগল সাম্রাজ্য যেরূপ গৌরবময় অবস্থায় ছিল, তা আবার ফিরিয়ে আনবো। আমি জানি রাজপুতরা কথা দিয়ে কথা রাখে। কাজেই রাজপুতদের আন্তরিকতা প্রমাণের জন্য আপনার ছেলেকে জিম্মি হিসেবে রাখার প্রয়োজন নেই।’ কথা বলা শেষ করে আকবর হেঁটে সামনে এগিয়ে রানাকে আলিঙ্গন করলেন। কয়েক মুহূর্ত পর তাকে ছেড়ে দিয়েই আবার বললেন, এখন আমাদের অভিযানের পরিকল্পনা শুরু করতে হবে, তাই না? প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে আমি যতবেশি সম্ভব আমার নিজের সেনাবাহিনীর সদস্যদের আমার পতাকাতলে আনার চেষ্টা করবো। আর তাহাব্বুর খান আর আমি আশা করি ওদের সবাই আমার দলে আসবে, কি বল তাহাব্বর?’ তার দুধ-ভাই মাথা নেড়ে সায় দিল।
রানা বললেন, আমি যখন জানবো আপনি এটা করতে সফল হয়েছেন, তখন আমিও আমার সেনাবাহিনী নিয়ে আপনার সাথে যোগ দেব। এছাড়া মারওয়াড় আর অন্য যেকোনো রাজপুত রাজ্যকে রাজি করাতে পারলে তাদেরকেও এতে সামিল করবো। তবে আমাদেরকে দ্রুত কাজ করতে হবে। আমার চরেরা আমাকে নিশ্চিত করে জানিয়েছে–এটা আপনারও জানা উচিত যে, আপনার বাবা মুয়াজ্জমের সেনাবাহিনীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আজমিরে ফিরে গেছেন। আপনার ভাই আযম বাংলার সুবেদার পদে যোগ দেবার জন্য চলে যাওয়ার পর আওরঙ্গজেবের সাথে এখন বড়জোর আটশোর মতো সৈন্য রয়েছে। আপনার নিজের বিপুল সংখ্যক সেনা অন্যদের তুলনায় আজমির আর আপনার বাবার অনেক কাছে রয়েছে। এটা আপনার জন্য একটা বড় সুযোগ, তিনি কিছু বুঝার আগেই আপনি এখুনি তাকে বন্দী করে সিংহাসন দখল করতে পারেন। আর এতে নিশ্চিত অনেক কম প্রাণহানি হবে।
*
আকবর দেসুরিতে তার শীতল কামরায় ফিরে গেলেন। মাত্র দুই ঘণ্টা আগে তার সেনা কর্মকর্তারা তার বাবাকে সিংহাসনচ্যুত করার পরিকল্পনায় রাজপুতদের সাথে মৈত্রী করার বিষয়ে তাকে প্রায় সর্বসম্মত সমর্থন দিয়েছে। তিনি তার সৈন্যদের সামনে গিয়েছিলেন। রণহস্তির হাওদার উপর দাঁড়িয়ে তিনি অঙ্গীকার করলেন যখন তিনি সম্রাট হবেন তখন সকলকে পুরস্কৃত করা হবে আর এর নিদর্শনস্বরূপ পরদিন সকালে দেসুরি ছেড়ে যাওয়ার আগে আজ সন্ধ্যায় একটি ভোজের ঘোষণা দিলেন। তার কথা শুনে সবাই প্রবল উল্লাসে চিৎকার করে উঠলো।
তবে এরপরই জানা গেল ইকবাল বেগ তার কয়েকজন সৈন্যসহ ঘোড়া ছুটিয়ে বের হয়ে গেছে–সম্ভবত বিদ্রোহের খবর তার বাবাকে দেওয়ার জন্যই সে চলে গেছে। তাদের চলে যাওয়ার খবরটি হানিফ খান দিয়েছিল। সেই সাথে সে ইকবাল বেগের চলে যাওয়াকে নিন্দা জানিয়ে আকবরের প্রতি তার নিজের আনুগত্যের কথা বললো, আবার সেই সাথে আওরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে তার অবস্থানও তুলে ধরলো। অবশ্য আকবর তাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারেন নি। হানিফ খানকে সতর্ক নজরদারিতে রাখতে হবে। আর এটা তাকে নিশ্চিত করতে হবে।
এটা জানাকথা যে বিদ্রোহের খবরটি শীঘ্রই তার বাবার কানে গিয়ে পৌঁছাবে। সত্যি বলতে কি এই বিদ্রোহটি শাহজাহানের বিরুদ্ধে আওরঙ্গজেব যে বিদ্রোহ করেছিলেন ঠিক সেরকমই। এখানে ইকবাল বেগ না হলে অন্য কেউ হত। আর তাতে কী আসে যায়? রাজপুতদের সাথে নিয়ে তিনি আজমির পৌঁছার আগে তার বাবা অতিরিক্ত সেনা ডেকে আনার সময় পাবেন না। তবে বাবাকে সম্মান দেখিয়ে অবশ্যই একটা চিঠি লিখে সমস্ত বিষয় ব্যাখ্যা করে জানাতে হবে, তিনি কী করতে যাচ্ছেন আর কেনইবা করতে চাচ্ছেন। নিচু টেবিলের সামনে বসে আকবর একটা টুকরা কাগজ নিলেন। দ্রুত চিঠি লিখে ঘোড়া বদল করে করে রাজকীয় সংবাদবাহক পাঠালে তার চিঠিটা ইকবাল বেগের আগেই তার বাবার হাতে পৌঁছে যেতে পারে।
