এক মুহূর্ত পর তাহাব্বুর খান মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বললো, এতে কাজ হতে পারে। আর যে পুরস্কার পাওয়া যাবে তার কারণে বাকি ঝুঁকি নেওয়া যেতে পারে।
আধঘণ্টা পর আকবর তার কামরায় ফিরে রানাকে উদ্দেশ্য করে লেখা ছোট চিঠিটা সিলমোহর করলেন। এতে শুধু দেখা করার জন্য তিনি রাজি একথা বলা হয়েছে, কি উদ্দেশ্য সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা হয় নি। এই চিঠিটা তার বাবার হাতে পড়লেও আর এর বিষয়স্তু পড়লে কোনো ক্ষতি হবে না, কেননা এর আগেই আওরঙ্গজেব তাকে উদ্দেশ্য করে লেখা অন্য চিঠিটাও পেয়ে যাবেন, যাতে আকবর লিখেছেন যে, আত্মসমর্পণের শর্ত আলোচনা করার জন্য একটি সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। দুটো চিঠিই জায়গামতো পাঠাবার জন্য কোরচির হাতে দিয়ে আকবর কামরাটির এককোণে একটি আয়না লাগানো কুলুঙ্গির কাছে গেলেন যেখানে একটি মোমবাতি জ্বলছিল। সেখানে তাকে উদ্দেশ্য করে লেখা রানার চিঠিটা জ্বলন্ত মোমবাতির শিখায় পোড়ালেন। তারপর পুরোপুরি এটা নষ্ট নিশ্চিত করার জন্য পোড়া ছাইগুলো মাটিতে রেখে জুতার তলি দিয়ে পিষলেন। তারপর তিনি বুঝতে পারলেন যে, তিনি তার বাবার শাসনের বিরুদ্ধে গুরুতর কিছু করা পরিকল্পনা করছেন!
১১. তখতইয়া তক্তা!–সিংহাসন না-কি কফিন!
কালো একটি ঘোড়ার উপর দীর্ঘদেহী একজন মানুষকে দেখিয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে আকবর তাহাব্বুর খানকে বলেলেন, ‘দ্যাখো! মেবারের রানা কেবল একজন উপদেষ্টা সাথে নিয়ে এসেছেন। এ বিষয়ে আমরা দুজনেই একমত হয়েছিলাম। পামগাছে ছাওয়া ছোট মরুদ্যানটির দিকে রানা এগোতেই তার ঘোড়ার রত্নখচিত লাগামে সকালের রোদ পড়ে ঝিকমিক করে উঠলো। দুই সেনাবাহিনীর মধ্যখানে এই জায়গাতেই ওরা তাদের সাক্ষাতের স্থান হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। রানার সাথের একমাত্র অশ্বারোহী সঙ্গীটিকে দেখে বেশ কমবয়সি মনে হল। অবশ্য সেটা রানার বিষয়। পামগাছের ছায়ার নিচে এসে রানা ধীরে ধীরে ঘোড়া থেকে নামলেন। তারপর পেছন পেছন তার সঙ্গীকে নিয়ে হেঁটে সামনে যেখানে আকবর আর তাহাব্বুর খান দাঁড়িয়েছিলেন সেদিকে এগোতে শুরু করলেন। ওরা একটি শামিয়ানার নিচে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলেন। এর আগের সন্ধ্যায় আকবরের লোকেরা শামিয়ানাটি এখানে খাটিয়েছিল।
আকবর এক পা সামনে এগোতেই অবাক হয়ে দেখলেন রানা মাথা নুইয়ে তাকে সম্মান দেখাতে শুরু করছেন। আকবর বললেন, এখন লৌকিকতা বাদ দিন। আপনি কি বলতে চান তা জানতে আমি আগ্রহী। কৌতূহলি মানুষের চোখ-কানের নজর থেকে আমরা এখন অনেক দূরে। কাজেই মন খুলে কথা বলুন যাতে, আমরা পরস্পরের উদ্দেশ্য পরিষ্কার বুঝতে পারি।’
‘আমি অবশ্যই সবকিছু পরিষ্কার করে বলবো। আমি এসেছি মারওয়াড়ের রাজপ্রতিভূ আর আমার নিজের তরফ থেকে। আমরা উভয়েই মনে করি আপনার নামে যার নাম, সেই মহান সম্রাট আকবরের মতোই সাম্রাজ্যের সকল মানুষের প্রতি আপনার সহনশীলতা এবং বিবেচনাবোধ রয়েছে।’
আরেকবার রানা তাকে প্রশংসা করায় আকবর মৃদু হেসে বললেন, আমার সেই মহান পূর্বপুরুষের প্রতি আমারও গভীর শ্রদ্ধাবোধ আছে। আমার শুধু কামনা যদি আমি তাঁর মহত্ত্বের সামান্য পরিমাণও অর্জন করতে পারতাম, তাহলে নিজেকে ধন্য মনে করতাম। তবে তার তুলনায় আমি কিছুই না।’
‘আপনার এই বিনয় আপনাকেই মানায়, জাহাপনা। তবে এর বিচারের ভার অনুগ্রহ করে আমার হাতে ছেড়ে দিন। আপনি আমাকে মন খুলে কথা বলতে বলেছেন। আমি আমার এখানে আসার উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করছি। হিন্দু প্রজাদের বিরুদ্ধে আপনার বাবার গোঁড়ামি সাম্রাজ্যকে ধ্বংস করে দেবে। রাজপুত রাজ্যগুলোর মতো দীর্ঘদিনের মিত্রকে শত্রুতে পরিণত করবে আর তুচ্ছ অভ্যন্তরীণ বিরোধের কারণে ধন-সম্পদের অপচয় হবে। এটি করতে গিয়ে তিনি বিদেশি হামলাকারীদের জন্য হিন্দুস্তানকে একটি অরক্ষিত, সহজ লক্ষ্যবস্তু করে তুলবেন। নীতিগতভাবে তিনি যা সঠিক মনে করেন এবং এর পেছনে যে কঠিন বিশ্বাস রয়েছে তার চরম প্রকৃতির বিষয়ে তিনি অত্যন্ত বিশ্বস্ত। আর তিনি এমন একগুঁয়ে যে তার মত বদলানো যায় না। এছাড়া আমাদের বিরুদ্ধে আর আমাদের অন্য হিন্দুভাইদের বিরুদ্ধে তাঁর সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডের অর্থ এই দাঁড়ায় যে, অনেকেই আর স্বেচ্ছায় তাঁকে তাদের শাসক হিসেবে মেনে নেবে না। যদিও আমরা বিশ্বাস করি আগে আমরা পরস্পরের মধ্যে লড়াই করলেও তখনকার সময়ের তুলনায় হিন্দুস্তানের রাজ্যগুলো মোগল অধিরাজত্বে অনেক শক্তিশালী হয়েছে, তবুও তাকে সরাতে হবে আর আকবর, আপনিই হচ্ছেন সবার স্বাভাবিক পছন্দ।
রানা তার অভিপ্রায় এবার সুনিশ্চিত করে বলার পর আকবর এমন অভিভূত হলেন যে, তার মুখে সাথে সাথে কোনো উত্তর যোগাল না। রানার চিঠি তার মাঝে যে আকাক্ষা জাগিয়ে তুলেছিল তা নিয়ে তিনি খুব একটা ভাবেন নি। তাহাব্বুর খানের সাথে আলোচনা আর নিজের মনের সাথে দীর্ঘ তর্ক-বিতর্কের পর তার আকাঙ্ক্ষা পূরণের ইচ্ছা আরো গম্ভীর হয়। তবে যখন এসেছে তা মুখে প্রকাশ করার তিনি ইস্ততত করতে লাগলেন। বিষয়টি নিয়ে তার মনে যখন ঝড় চলছিল, তখন তাহার খান বলে উঠলো, আমাকে মার্জনা করবেন, তবে আমরা কী করে জানবো যে আপনি আমাদের প্রতিশ্রুতিকে সম্মান জানাবেন?
