মহান আকবর রাজপুত রাজ্যগুলোর একজন বিশেষ বন্ধু ছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, মোগলদের মতো রাজপুতরাও একটি যোদ্ধা জাতি। তিনি আমাদেরকে তাঁর সেনাবাহিনীর নের্তৃত্বের পদে বসিয়েছিলেন। আমাদের রাজকুমারিদের স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। আপনার শরীরেও রাজপুত রক্ত বইছে। আপনার প্রপিতামহ ম্রাট জাহাঙ্গির একজন রাজপুত রাজকুমারির গর্ভজাত সন্তান ছিলেন, যেরকম ছিলেন আপনার পিতামহ সম্রাট শাহজাহান। আমি নিশ্চিত আপনি এগুলো বুঝতে পারছেন আর মনে মনে আপনি মোগল এবং অন্যান্য রাজপুত রাজ্যগুলোর মধ্যে শান্তি চান, ঠিক যেরকম আমিও চাই। তবে নিয়তির কী পরিহাস, অনেক রাজপুত শাসক বলে থাকেন যে, আজ আপনার বাবা আওরঙ্গজেব সিংহাসনে বসে আছেন, অথচ সে জায়গায় আপনি থাকলে সূর্য, চন্দ্র এবং তারার সন্তানদের মাঝে ন্যায়বিচার আর ঐক্য এনে সম্রাট আকবরের মতো গৌরব ও ন্যায়ের সাথে রাজত্ব করতে পারতেন। আমি বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে লিখছি আর আশা করি যে, আপনি আমার সাথে দেখা করতে রাজি হবেন, যাতে আমরা আলাপ-আলোচনা করে আমাদের মধ্যে যে বিভক্তি আছে তা দূর করে সবার ভাগ্য উন্নত করার সর্বোত্তম একটা উপায় খুঁজে বের করতে পারি। আপনার কাছ থেকে একটি উত্তর পাওয়ার জন্য আমি আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছি, যাকে সম্প্রতি আমি শত্রুর বদলে একজন বন্ধু মনে করছি। আমার বিশ্বাস বিপর্যয় থেকে সাম্রাজ্যকে রক্ষা করে যদি তিনি তা প্রমাণ করতে পারেন, তাহলে আমি তাই মনে করবো।
*
আকবর বারবার চিঠিটা পড়লেন। সম্রাট আকবরের সাথে তুলনা করার আনন্দ আর রানার শেষ বাক্যটিতে বিদ্রোহের উত্তেজনা, এ দুইয়ের মিশ্রণ রয়েছে। আচ্ছা রানা কি একথার ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে, ওরা দুজনে আওরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে একত্রিত হয়ে তাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে আকবরকে সিংহাসনে বসাবেন? কথায় তা পরিষ্কার প্রকাশ না করলেও, অর্থটি তাই দাঁড়ায় আর দূত যে চরম গোপনীয়তার প্রতি জোর দিয়েছিল, তারও একটা ব্যাখ্যা এতে পাওয়া যায়। এমনকি প্রস্তাবটি বিবেচনা করার বিষয়ে তার নিজের ইচ্ছা দেখে আকবর অবাক হয়ে গেলেন। রানা মনে করেন, তিনি আওরঙ্গজেবের চেয়ে ভালোভাবে সাম্রাজ্য শাসন করতে পারবেন আর তার বাবা যে বিভক্তি সৃষ্টি করেছেন তা সংশোধন করতে পারবেন…কিন্তু আসলেই কি তা পারবেন? তবে মনে মনে বিশ্বাস করলেও তার নিজের ইচ্ছার বিষয়ে এ ধরনের কার্যক্রম গ্রহণের কথা তিনি কখনও ভাবেন নি। তবে তিনি কিভাবে নিশ্চিত হবেন যে, রানার কথাগুলোর মানে আসলে এই? আরো কথা হল, মোগল সাম্রাজ্যের সেনাবাহিনী আর সভাসদদের সমর্থন পাবেন, একথা ভেবে কি নিজের সাথে প্রতারণা করছেন না তো? কোনোভাবেই তিনি নিশ্চিত হতে পারছেন না…আরেকটি মতামতের প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে দুধভাই তাহাব্বুর খান ছাড়া আর কে ভালো হতে পারে?
আধঘণ্টা পর তাহার খান শান্তভাবে বললো, আমিও একমত যে, এই চিঠিতে মনে হচ্ছে আপনার বাবার বিরুদ্ধে একটি মৈত্রী করার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। ওরা দুজনে একা শহরের দেয়ালের চারদিকে ঘোড়ায় চড়ে বেড়াতে বেড়াতে আলাপ করছিল। ভেবেচিন্তে ওরা ঠিক করেছিল এ ধরনের স্পর্শকাতর বিষয়ে খোলা জায়গায় ঘোড়ায় পিঠে বসে কথা বলাই সবচেয়ে ভালো হবে।
‘তোমার কী মনে হয়, এ-বিষয়ে আমার কী করা উচিত?
‘আমার মনে হয় সবার আগে আপনাকে বিবেচনা করতে তবে, রানা আপনার জন্য একটা ফাঁদ পেতেছে কি-না। একটা ষড়যন্ত্রের মধ্যে আপনাকে টেনে নিয়ে, সে ব্যাপারটা আপনার বাবার কাছে ফাঁস করে দিয়ে আপনাকে আর অভিযানকে ধ্বংস করে দিতে পারে।
আকবর বললেন, তিনি একজন সম্মানীয় লোক। আমার বিশ্বাস হয় না এরকম একটা কাজ তিনি করতে পারেন। এখন তার মনে যে সন্দেহের সুতা দানা বেঁধে উঠছে তার সাথে মনে যে তীব্র আকাঙ্ক্ষা একসময় জেগে উঠেছিল এই দুইয়ের মাঝে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চেপে রাখা কষ্টকর হয়ে উঠেছে। তারপর আবার বললেন, তোমার কী মনে হয় আমি যদি বাবার বিরুদ্ধে যাই তাহলে কী কোনো ধরনের সমর্থন পাবো?
তাহাব্বুর খান কিছুক্ষণ চুপ থেকে অবশেষে বললো, আমার বিশ্বাস আপনি পাবেন। আমি জানি আপনি আমার সমর্থন পাবেন। তবে তাড়াহুড়া করাটা ঠিক হবে না।
‘আমি তোমার প্রতি কৃতজ্ঞ, তাহাব্বুর খান। সামরিক বিষয়ে তুমি অনেক সময় আমাকে সঠিকভাবে সতর্ক করেছ। তবে এখন যদি কোনো ব্যবস্থা না নেই। তাহলে আর হয়তো কোনো সুযোগ পাওয়া যাবে না। অন্তত রানার সাথে দেখা করতে রাজি হয়ে দেখি না, তিনি কী বলতে চান?
আর আপনার অতি-সন্দিগ্ধ বাবা যদি সাক্ষাতের কথাটা জেনে যান? সব জায়গায় তাঁর গুপ্তচর ছড়িয়ে আছে। আমরা জানি তিনি আপনার সদর দফতরে কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়েছেন–ইকবাল বেগ আর হানিফ খান, এদুটো নাম করা যায়। এদের কাজ হচ্ছে কেবল সব খবর তাঁকে জানানো। আপনি কি আপনার সবচেয়ে বড় ভাই মোহাম্মদ সুলতানের দুর্ভাগ্যের অংশীদার হতে চান? বাকি। জীবন কারাগারে কাটিয়ে সেখানেই মৃত্যু বরণ করতে চান?
আকবর একটু ভাবলেন। চতুর্দিকে ছড়ানো তার বাবার গুপ্তচরের জালের কথা তাহাব্বুর খান ঠিকই বলেছে। তারপর একটা ধারণা তার মাথায় এল–যা ভেবে তিনি নিজেকে সাবাস দিলেন, এমনকি তার বাবার মতো চতুর এবং সূক্ষ্মবুদ্ধির মানুষও এই পরিকল্পনাটার কথা ভেবে গর্ব বোধ করতেন। আমরা দুজন ছাড়া আর কেউ রানার এই চিঠির বিষয়বস্তু সম্পর্কে জানে না। তবে অনেকে জানবে যে, একজন মেওয়ারি দূত এসেছে আর তার আসার কারণের বিষয়টি নিয়ে জল্পনা-কল্পনা করবে। আমি চিঠিটা পুড়িয়ে ফেলবো আর সকলে জানবে যে, আত্মসমর্পণের শর্ত নিয়ে আলোচনা করার জন্য রানা আমার সাথে সাক্ষাৎ করার প্রস্তাব দিয়েছে। তারপর আমি বাবাকে লিখে জানাব যে, আমি তার সাথে সাক্ষাৎ করতে রাজি হয়েছি। এতে তার কাছে কোনো সন্দেহের অবকাশ থাকবে না আর এদিকে রানার সাথেও গোপনে সাক্ষাৎ করার প্রয়োজন হবে না।’
