‘খুব ভাল। তাহলে চল আমরা এগোই।’
এক ঘণ্টার একটু আগে ওরা ঘোড়ার পিঠে চড়ে ভোলা ফটক দিয়ে দেসুরি শহরের মধ্যখানে ধূলিধূসর একটি খোলা ময়দানে পৌঁছলো। জায়গাটি জনমানব শূন্য, কেবল দুটো পথের কুকুর ছায়ায় বসে জিহ্বা বের করে নিজেদের শরীর চাটছে। ওদের অগ্রগতির সফলতায় ওরা দুজন একে অপরের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলো। হঠাৎ আকবরের মনে হল তার বাবা কিংবা তার পরিবারের অন্যান্য পুরুষ সদস্যের তুলনায়, তাহাব্বুর খানের সাথে তিনি অনেক সচ্ছন্দবোধ করেন।
তিনদিন পর আকবর দেসুরির খালি পড়ে থাকা সবচেয়ে বড় বাড়িটির উঁচু ছাদের একটি কামরায় একটি নিচু পালঙ্কে শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। এখানেই তিনি তার সদর দফতর স্থাপন করেছেন। কামরাটির দেয়ালগুলোতে উজ্জ্বল লাল, হলুদ আর কমলা রঙয়ের পর্দা টাঙানো ছিল। এই রঙগুলো রাজপুতদের খুব প্রিয়। কামরার তিন কোণায় কুলুঙ্গিতে আয়না ঘেরা কাঁচের বাতিদানে মোমবাতি জ্বলছিল। আর চতুর্থ কোণে একটি হিন্দু দেবতার মূর্তি ছিল। আকবর তার পরিচারকদের এটা নষ্ট করতে কিংবা এর সামনে উৎসর্গ করা ধূপ। আর সামনে ছড়িয়ে থাকা শুকিয়ে যাওয়া গাঁদা ফুলগুলো সরাতে নিষেধ করেছিলেন। কোরচি ঢুকতেই তিনি উঠে বসলেন।
জাহাপনা, মেবারের রানার কাছ থেকে যুদ্ধবিরতির পতাকা নিয়ে একজন দূত এসেছে।
আকবরের মন নেচে উঠলো। একজন রাজদূত কেবল শান্তি চুক্তির শর্ত আলোচনা করার জন্য আসতে পারে–যে শান্তির জন্য তিনি নিজে অতি উৎসাহী ছিলেন। অন্যায্যভাবে কঠোর হবেন না।
তিনি বললেন, “তাহাব্বুর খান আর অন্যান্য জ্যেষ্ঠ সেনা নায়কদের এখানে আসতে বল, তারপর আমি দূতের সাথে কথা বলবো।
কোরচি বললো, “জাহাপনা, সে বলেছে; রানা তাকে পরিষ্কার নির্দেশ দিয়েছেন, সে যেন একা আপনার সাথে দেখা করে।’
‘কেন তা কি বলেছে?
না। তবে সে আমাকে বিশেষভাবে বলেছে রানা ব্যক্তিগতভাবে তাকে এই নির্দেশ দিয়েছেন।’
আকবর প্রথমে ভেবেছিলেন প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বিশেষ করে তাহাব্বুর খানের কাছে কোনোকিছু গোপন করতে চান না। তবে এমনও হতে পারে, রানার আত্মসম্মান এত বেশি যে, আনুষ্ঠানিক আলোচনা করার আগে সম্ভাব্য শর্তের বিষয়ে তিনি ব্যক্তিগতভাবে তাকে বাজিয়ে দেখতে চান।
“ঠিক আছে। তাকে বল আমি একান্তে তার সাথে দেখা করবো। তারপর একটা কথা মনে পড়তেই তিনি বললেন, তবে তাকে বলবে, তার সাথে কোনো অস্ত্র আছে কি-না তা দেখার জন্য আমার কাছে আসার আগে তার দেহতল্লাসী করা হবে।’
আধঘণ্টা পর রাজপুত দূত এল। দীর্ঘদেহী সাদা গোঁফওয়ালা একজন লোক। পঞ্চাশের উপর বয়স, সুন্দরভাবে মাথায় কমলা রঙয়ের পাগড়িপরা, গায়ে জ্যাকেট আর সাদা পাতলুন পরা লোকটিকে পথ দেখিয়ে আকবরের কোরচি ভেতরে নিয়ে এল। ভেতরে এসে সে মাথা নুইয়ে শাহজাদাকে সম্মান দেখাল। কোরচি কামরা থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর প্রথমে আকবর কথা বললেন, ‘রানার একজন দূত হিসেবে আমি আপনাকে স্বাগত জানাচ্ছি। আমাদের মধ্যে। এখন বিরোধ চললেও আমি তার এবং তার লোকজনের প্রতি আমার শ্রদ্ধাবোধ হারিয়ে ফেলি নি।
‘একথা শুনলে তিনি অবশ্যই খুশি হবেন, জাহাপনা।
‘এখন বলুন, কেন তিনি আপনাকে আমার কাছে পাঠিয়েছেন।
তিনি আমাকে কিছুই বলতে বলেন নি, শুধু এই চিঠিটা আপনার হাতে দিতে বলেছেন। এটা পড়ার পর আপনি যদি কোনো উত্তর দিতে চান, তা ফেরত নিয়ে আসতে বলেছেন। এই কথা বলে সে তার পোশাকের ভেতর থেকে একটি সিলমাহর করা কাগজ বের করলো।
‘কেন তিনি চাননা যে আমি আর আপনি আমাদের দুই সম্প্রদায়ের সম্পর্কের বিষয়ে আলোচনা করি?
সত্যি বলতে কী, তিনি মনে করেন আপনার বাবার সাম্রাজ্যে দেয়ালেরও কান আছে। এর বেশি আমি কিছু বলতে পারি না।’
আকবর ভ্রু কুঁচকালেন। এই চিঠির বিষয়বস্তু কি হতে পারে? এটা জানতে চাইলে তাকে দূতের প্রস্তাবে রাজি হতে হবে। এটা না করার কোনো কারণ তিনি পেলেন না। ঠিক আছে। চিঠিটা দিন। আমার লোক শহরের আরামদায়ক কোনো জায়গায় আপনার থাকার ব্যবস্থা করবে। তবে আশা করি আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন যে, সেখান থেকে আমি আপনাকে বের হবার অনুমতি দেবো না। কারণ সে চেষ্টা করলে আপনি আমার সেনাবাহিনী আর অস্ত্রসম্ভার দেখে ফেলবেন।
‘আমি বুঝেছি, জাহাপনা। আমি অপেক্ষা করবো, যতক্ষণ না আপনি কোনো ধরনের উত্তর দিতে ইচ্ছা করেন।
দূতের চলে যাওয়ার পর আকবর সিলমোহর ভেঙ্গে চিঠিটা পড়তে শুরু করলেন। চিঠিটা পড়তে পড়তে তার চোখ বড় বড় হয়ে গেল আর হৃৎ স্পন্দন দ্রুত হতে লাগলো।
*
আমি এই চিঠিটি লিখছি গভীর দুঃখ নিয়ে, কেননা আমরা যে যুদ্ধ করছি সে যুদ্ধ মেবারের সৃষ্টি নয়। কেন আমরা আমাদের নিজেদের মানুষের রক্ত ঝরাচ্ছি, যারা দীর্ঘকাল যাবত শত্রু নয় মিত্র ছিল? আমার মনে হয় আপনি আমার অনুভূতির অংশীদার হবেন আর আশা করবো আমাকে অতিবিশ্বাসী ভাববেন না, যদি বলি যে, আপনার নামটি সঠিক হয়েছে। আপনার মতো একই নামের এবং আপনার মহান পূর্বপুরুষ সম্রাট আকবর, যার স্মৃতি চিরদিন হিন্দুস্তানে অম্লান থাকবে, তাঁর মতোই আপনার পরাক্রম আর ন্যায়বোধ সুবিদিত। মহান আকবর জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকল মানি লোকের বন্ধু ছিলেন। হিন্দু প্রজাদের বিরুদ্ধে আরোপিত ঘৃণ্য আইন বিলোপ করে তিনি তাঁদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছিলেন। আমি শুনেছি আপনার বাবা ঐ আইনের অনেক আবার চালু করায় আপনি অখুশি হয়েছেন।
