‘আমাদের তাই ধরে নিতে হবে। তবে সে তার বাবার মতো তেমন নেতা নয়। কর্তৃত্ব দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করতে তার সময় লাগবে আর সে হয়তো মারাঠিদের একত্রিত করে রাখতে পারবে না। ঐ নারকী কাফের শিবাজির মৃত্যুতে নিশ্চিতভাবে রাজপুত আর মারাঠিদের আমাদের বিরুদ্ধে কোনো আন্দোলনে একত্রিত হওয়ার ঝুঁকি দূর হয়ে গেল। আওরঙ্গজেবের মুখে চওড়া হাসি দেখা দিল। সবকিছু তার অনুকূলে ঘটে চলেছে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তার সহায় হয়েছেন।
*
আকবর দুহাতে চোখ আড়াল করে সূর্যের বিপরীতে তাকালেন। ঝিকিমিকি তাপের কুয়াশার মধ্য দিয়ে ছোট্ট মেবারি শহর দেসুরির বাড়িঘরের ছাদ আর দালান-কোঠা দেখা যাচ্ছে। চরেরা খবর দিয়েছে শত্রুসেনারা শহর ছেড়ে চলে গেছে। তার ইচ্ছে এখানে ঘাঁটি করে তার সৈন্যদেরকে বিশ্রাম দেবেন, তারপর মেবারের রানার শক্ত ঘাঁটি কুম্ভগড়ের দিকে এগোবেন। মেবারে তার সমরাভিযান সফল হয়েছে, মেওয়াড়িদেরকে তাদের কেন্দ্রের দিকে ঠেলে দিয়েছেন। তিনি সবসময় চেষ্টা করেছেন, চলার পথে যেসব জায়গা তিনি দখল করেছিলেন, সেখানে জমি আর সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি যেন কম হয়। তার আশা যে বিদ্রোহ চলছে, তা শীঘ্রই শেষ হয়ে যাবে। আর বিদ্রোহ দমন করতে গিয়ে তিনি যেরকম নরম থাকার চেষ্টা করেছেন, তাতে আশা করা যায় যে, মেওয়াড়িদের সাথে বিরোধও হয়তো সহজে মিটিয়ে ফেলা যাবে। তার বাবা যাই ভাবুন, মোগলদের উত্থানে রাজপুতদের সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আর তার ধারণা উভয়ের স্বার্থেই তারা আবার মৈত্রিবন্ধনে আবদ্ধ হবেন। তার ফুফু জাহানারারও তাই বিশ্বাস। তিনি মমতাভরে তাকে যেসব চিঠি লিখতেন তাতে প্রায়ই সুফি শিক্ষকদের লেখার উদ্ধৃতি দিতেন যাতে তাদের উভয়ের বিশ্বাস আরো দৃঢ় হয় যে, কিছু সময় পার হলেই রাজপুত আর মোগল–হিন্দু আর মুসলিম সবাই একদিন আবার ঐক্যবদ্ধ হয়ে বসবাস করবে। কেবল তাদের মনমেজাজ ঠাণ্ডা হতে আর দুঃসময়ের স্মৃতি ম্লান হওয়ার জন্য কিছু সময় প্রয়োজন।
তার কেবল ইচ্ছা হত তার বাবার ঘন ঘন পাঠান বার্তাগুলো যেন তার ফুফুর চিঠিগুলোর মতো একই রকম মনোমতো হোক। আজ সকালেই আওরঙ্গজেবের কাছ থেকে দীর্ঘ, গুরুগম্ভীর শেষ চিঠিটি এসেছে। চিঠিতে তার বাবা মারওয়াড়ে মুয়াজ্জমের গৌরবময় অভিযানের কথা তুলে ধরেছেন। ছেলের দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিয়ে শত্রুকে ধ্বংস করা আর তার যে কোনো ধরনের ভিন্নমত প্রকাশ কঠোর হাতে থামিয়ে দেওয়ার সক্ষমতারও উচ্চপ্রশংসা করেছেন। আবার সেই সাথে মনে হল যেন, আওরঙ্গজেব ধরেই নিয়েছেন যে, মেবারে আকবরের নিজের সমরাভিযানও সফল হবে। নিশ্চিতভাবেই তিনি অবশ্য তার সাফল্যে তেমন প্রশংসা করেন নি, বরং আরো ভালভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে উদ্বুদ্ধ করেছেন আর তার অভিযান পরিচালনার ব্যাপারে অহেতুক উপদেশ আর মেওয়াড়িদের প্রতি আরো কঠোর আচরণের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন। মারওয়াড়ের সেনাবাহিনীর অধিনায়কের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি এখনও তার মনে পীড়া দিচ্ছে। অন্যান্যের উপদেশ শুনতে আর তাদের সাথে পরামর্শ করতে পছন্দ করেন, এটা নিয়ে তার বাবার তাকে তিরস্কার করাটা সঠিক হয় নি। ধর্মীয় বিষয় ছাড়াও অন্য সব বিষয়ে আওরঙ্গজেব কেবল তাঁর নিজের মত খাটানোটাই একমাত্র উপায় মনে করতেন। অনেক সময় উপকারী মন্তব্য করলেও তার বাবা সেটাকে রাজবৈরীর কাছাকাছি সমালোচনা মনে করতেন। তিনি চাইতেন তাঁকে সবসময় এমন লোকজন ঘিরে থাকুক, যারা সামরিক কৌশল আর ধর্মীয় গ্রন্থের বিষয়ে তার ব্যাখ্যার সাথে সমভাবে অংশীদার হোক। কোনো বিষয়ে দ্বিতীয়বার ভাবার জন্য কেউ তাকে অনুরোধ করুক, তা তিনি চাইতেন না। এতে তিনি সাম্রাজ্যের অনেক অংশের সাথে যোগাযোগ আর মূল্যবান উপদেশের অনেক উৎসও হারিয়ে ফেলেন।
তারপরও তার আশা, একবার কুম্ভগড় দখল করলেই তার বাবা নিশ্চয়ই তার সদগুণাবলির শ্রেষ্ঠতা স্বীকার করবেন। তবে প্রথমে তাকে দেসুরি দখল করতে হবে। তাহাব্বুর খান যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল তিনি সেখানে এগিয়ে গেলেন। এই সেনা কর্মকর্তাকেই প্রথমে সেনাবাহিনীর মেবার আক্রমণের এই শাখার ভারপ্রাপ্ত সেনানায়ক করে পাঠানো হয়েছিল। আকবরকে তার উপরে দেওয়ায় তাকে অসন্তুষ্ট মনে হয় নি। তবে সেরকম হওয়ারও কোনো কারণ ছিল না। ওরা একে অপরকে সারাজীবন ধরে জেনে এসেছে। তাহাব্বুর খানের মা, শিশুকালে আকবরের স্তন্যদান করার কাজে নিযুক্ত ধাত্রী ছিলেন আর তাই দুজনে দুধ ভাই ছিলেন। অনেক সময় রক্তের বন্ধনের চেয়েও এই সম্পর্ক শক্তিশালী মনে করা হয়। নিশ্চিতভাবে ওরা একে অপরের সঙ্গ পছন্দ করতেন আর ওদের পরস্পরের মাঝে বিশ্বাসের বন্ধনও অটুট ছিল। সর্বোপরি ওদের অভিযানের সফলতায় তাহাব্বুর খানের সামরিক কুশলতার যথেষ্ট অবদান ছিল। আকবর তার বাবাকে নিয়মিত যে খবর পাঠাতেন তাতে মুক্তকণ্ঠে একথা জানাতেন।
আকবর জিজ্ঞেস করলেন, “আমরা কী দেসুরিতে ঢুকতে পারবো?
‘হ্যাঁ পারবো। অতর্কিতে আক্রমণ করার জন্য কেউ কোথাও ঘাপটি মেরে আছে। কি-না কিংবা এ ধরনের আর কিছু দেখার জন্য আমি চর পাঠিয়েছিলাম। ওরা কিছুই খুঁজে পায়নি–মেওয়ারি সেনাদের কোনো চিহ্নই কোথাও নেই।
