মোগল পদাতিক সেনারা এখন খোয়র উপর দিয়ে হুড়াহুড়ি করে দুর্গে ঢোকার চেষ্টা করতে লাগলো। মারওয়াড়িরা তখনও আপ্রাণ লড়ে চলেছে। দুর্গের উপর থেকে ছোঁড়া মারওয়াড়িদের গাদা বন্দুকের গুলির আঘাতে কয়েকজন মোগল সেনা মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। আবার বর্শা হাতে কয়েকজন মারওয়াড়ি ফটকের পাশে ভাঙ্গা দেয়ালের কাছে ছুটে এসে মোগল সেনাদের লম্বা বর্শা ছুঁড়ে বিদ্ধ করলো। ভাঙ্গা দেয়ালের ফাঁক দিয়ে দুর্গে ঢোকার জন্য মুয়াজ্জম হাতের ইশারায় কয়েকজন মোগল অশ্বারোহী সেনাকে সামনে এগিয়ে যেতে বলছিলেন। মুহূর্তের মধ্যে ওরা দ্রুত ঘোড়া ছুটিয়ে সামনে এগোল। দ্রুত ছুটে যাওয়ার সময় ওরা মাটিতে পড়ে থাকা কিছু মোগল সেনার মৃতদেহ মাড়িয়ে গেল আর আহত যেসব সৈন্য তাদের যখমি-দেহ কোনোমতে টেনে গড়িয়ে গড়িয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল, তাদেরকেও ঘোড়ার খুরের আঘাতে ধাক্কা মেরে মাটিতে ফেলে দিল। দ্রুত দুবার দুর্গের ছাদের দিক থেকে গাদা বন্দুকের গুলিবর্ষণ হল। গুলির আঘাতে সাথে সাথে কয়েকজন অশ্বারোহী সেনা ঘোড়াসহ মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। যারা বেঁচেছিল তারা আবার ঘুরে নতুনভাবে আক্রমণ করার জন্য দলবেঁধে প্রস্তুত হল।
আক্রমণকারী মোগল অশারোহী সেনারা দুর্গে ঢোকার চেষ্টা করার সময় মারওয়াড়ি বন্দুকধারীরা ছাদের আড়াল থেকে বের হয়ে তাদেরকে গুলি করার চেষ্টা করতেই নিচে থেকে মোগল বরকন্দাজরাও দুর্গের ছাদের বেশ কয়েকজন মারওয়াড়ি বন্দুকধারীকে গুলি ছুঁড়ে মারতে সক্ষম হয়েছিল। কাজেই আবার যখন মোগল অশ্বারোহীরা আক্রমণ করলো তখন উপর থেকে গাদা বন্দুক ছোঁড়ার শব্দ বেশ কমে এসেছিল। তারপরও অশ্বারোহী সেনারা ভাঙ্গা ইট সুরকির স্তূপ, মানুষ, পশু আর আহতদের ডিঙ্গিয়ে ভেতরে ঢুকতে না পেরে আবার ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে পিছিয়ে গিয়ে পুনরায় হানা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হল।
তবে ওরা সামনে এগোবার আগেই ভাঙ্গা দেয়ালের কাছে কমলা রঙয়ের রণবেশ পরা একদল মারওয়াড়ি এসে উপস্থিত হল। কিছু লোক ঘোড়ার পিঠে আর বাকিরা হেঁটে। উপরে ছাদের দিকে তাকিয়ে আওরঙ্গজেব দেখলেন সেখানে এখন কেউ নেই আর মোগল পদাতিক সেনারা মই থেকে বিনাবাধায় ছাদে নামছিল। তারপর ফটকের ভাঙ্গা পাল্লাটি সরিয়ে আরো কিছু মারওয়াড়ি সেখানে হাজির হয়ে প্রায় সাথে সাথে ভাঙ্গা দেয়ালের পাশে জমায়েত অন্যান্য মারওয়াড়ীদের সাথে মিলে ওরা একযোগে মোগলদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। উদ্যত অস্ত্র হাতে রণহুঙ্কার দিতে দিতে ওরা ছুটে এল। মারওয়াড়িরা পাগলের মতো প্রাণ দিচ্ছিল, আওরঙ্গজেব ভাবলেন, ঠিক একই রকমভাবে অনেক বছর আগে আমু দরিয়ার ওপারে অশোক সিং তার লোকজনসহ প্রাণ দিয়েছিল। মোগল বরকন্দাজ আর গোলন্দাজ সেনারা ছুটে আসা বেশ কয়েকজন মারওয়াড়ি সেনাকে গোলার আঘাতে মাটিতে ফেলে দিল। তবে ওদের কয়েকজন কামানগুলোর মাঝে এসে কয়েকজন তুর্কি গোলন্দাজ সেনাকে বর্শা দিয়ে বিদ্ধ করলো। তবে এরপর ওরাও মারা পড়লো। ক্রমান্বয়ে মারওয়াড়ি সৈন্যের সংখ্যা কমে এল।
হঠাৎ দশ-বারো জন মারওয়াড়ি অশ্বারোহী সৈন্য সম্রাটের হাতিটি দেখতে পেয়ে আক্রমণ করার জন্য সেদিকে ছুটে গেল। সাথে সাথে মোগল বরকন্দাজরা গুলি ছুঁড়ে কয়েকজনকে ঘোড়া থেকে ফেলে দিল। যারা জীবিত ছিল, তারা আওরঙ্গজেবের কাছে আসার আগেই তার দেহরক্ষী বাহিনীর সদস্যরা ঘোড়া ছুটিয়ে, তাদেরকে ঘিরে ধরে সকলকে তরোয়ালের আঘাতে হত্যা করে মাটিতে ফেলে দিল। আওরঙ্গজেব ভাবলেন, এই রাজপুতরা অপরিণত শিশুর মতো কিরকম বিচারবুদ্ধিহীন বোকা।
সেদিন সন্ধ্যায় সর্বাধিনায়কের টকটকে লাল তাবুতে তিনি আর মুয়াজ্জম চুপচাপ বসে ছিলেন। বাইরে ওদের লোকজন আনন্দ উৎসবে মেতেছিল। এই বিজয়টি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এতে মারওয়াড়ের দরজা তার সেনাবাহিনীর সামনে খুলে যাবে। এই একবারের জন্য আওরঙ্গজেব তার সৈন্যদের মদ খাওয়ার দিকে চোখ বন্ধ করে রইলেন, অথচ অন্য সময় এর জন্য তিনি চাবুক মারার শাস্তি দিতেন। তিনি ঢুলতে শুরু করলেন, যতই বয়স হচ্ছে খাওয়া-দাওয়ার পর এই প্রবণতাও বেড়ে যাচ্ছে। হঠাৎ একজন কোরচি ভেতরে ঢুকতেই তিনি চমকে জেগে উঠলেন। সে বললো, “দিল্লি থেকে একজন কাসিদ একটি বার্তা নিয়ে এসেছে আর তাকে বলা হয়েছে পৌঁছার সাথে সাথে সে যেন বার্তাটি শুধু আপনার হাতে তুলে দেয়।’
আওরঙ্গজেব দাঁড়িয়ে বললেন, ‘নিয়ে এস তাকে।
কয়েক মুহূর্ত পর কোরচি বার্তাবাহককে ভেতরে নিয়ে এল। দীর্ঘ পথ চলার পরিশ্রমে ঘর্মাক্ত লোকটি আওরঙ্গজেবকে কুর্নিশ করে বার্তাটি তাঁর হাতে তুলে দিল।
দ্রুত ছুটে আসার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ। যাও, বাইরে গিয়ে সবার সাথে আনন্দ কর। এটা তেমার পাওনা হয়েছে।
কাসিদ আর কোরচি বের হয়ে যাওয়ার পর আওরঙ্গজেব সিলমোহর ভেঙ্গে চিঠিটা পড়তে শুরু করলেন। সাধারণত কঠোর চেহারার আওরঙ্গজেবের মুখে মৃদু হাসি দেখা দিল, তিনি বললেন, ‘আনন্দ কর মুয়াজ্জম। শিবাজি জ্বরে ভুগে মরেছে।
‘খুশির কথা। এটা আমাদের সাম্রাজ্যের জন্য বিরাট একটি খবর। তবে সম্ভাজি কি আমাদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাবে না তো?
