আওরঙ্গজেবের নির্দেশনায় মুয়াজ্জম একজন ধৃত বন্দীর উপর নির্যাতন চালিয়েছিলেন। যা করতে আকবরের বিবেক মেনে নেয় নি। লোহার শলাকা ব্যবহার করে তরুণ মারওয়াড়ি চরের কাছ থেকে তথ্য টেনে বের করা হয়েছিল। তার তথ্য মোতাবেক মোগল সেনার উপর আরেকটি হামলা করার আগে মারওয়াড়িরা প্রার্থনা করতে এই দুর্গে সমবেত হচ্ছে। আবার তার বাবার নির্দেশনায় মুয়াজ্জম সাথে সাথে আক্রমণে না গিয়ে তার চরকে দেখতে পাঠালেন, মারওয়াড়িদের সমবেত প্রার্থনা শেষের দিকে আসতেই সে মুয়াজ্জমকে সতর্ক করলো। তারপর মুয়াজ্জম দ্রুত তার সেনাদলকে এগিয়ে নিয়ে আক্রমণের জন্য অবস্থান নিয়ে প্রস্তুত হলেন।
আওরঙ্গজেব দেখে খুশি হলেন যে, মুয়াজ্জম সুস্পষ্টভাবে কাজ করার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিলেন, তবে সেই সাথে যথেষ্ট দূরদর্শিতা দেখিয়ে কাজে নেমেছেন, আজমের মতো নয়। আজম তাড়াহুড়া করে পশ্চিমে মেওয়াড়ের দিকে এগিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি অধৈর্য হয়ে আর ঝোঁকের বশে যে কৌশল নিয়েছিলেন তাতে বরং উল্টো ফল হয়ে প্রচুর প্রাণহানি ঘটেছিল। আওরঙ্গজেব তার ছেলেকে বাংলায় সুবেদার করে পাঠিয়ে দিয়ে তার জায়গায় একজন বিশ্বস্ত উজবেক সেনাপতিকে নিয়োগ দিয়েছিলেন। এদিকে দক্ষিণ দিক থেকে আকবর ধীর গতিতে মেওয়াড়ের দিকে এগোলেও, তার বাবা বিস্মিত হয়ে লক্ষ করলেন যে, মারওয়াড়ের ব্যর্থতার পর তিনি সফলতার সাথে প্রচুর এলাকা দখল করে ধরে রেখেছেন।
তবে এখন আওরঙ্গজেবের সমস্ত মনোযোগ মুয়াজ্জমের দিকে। তিনি তার হাতির পিঠে হাওদায় বসে সবেমাত্র সবুজ পতাকা উড়িয়ে কামান দাগার জন্য নির্দেশ দিতে শুরু করেছিলেন। এই অভিযানে ব্যবহার করার জন্য তিনি পাহাড়ি এলাকার মধ্য দিয়ে দ্রুত কয়েকটি কামান আনতে পেরেছিলেন। প্রধানত তুর্কি গোলন্দাজ সৈনিকরা বিধ্বস্ত গ্রামাঞ্চলের উপর দিয়ে কামানগুলো টেনে নিয়ে এসেছিল। এই কামানের গোলায় দুর্গের দেয়াল যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তবে তো ভালই হবে। তবে এই কামানগুলো দাগার ফলে যে পরিমাণ ধোয়া বের হবে তা পদাতিক সৈনিকদের সামনে এগোবার সময় তাদের আড়াল দেবে। কয়েকজন পদাতিক সেনা সাথে গাদা বন্দুক নিয়েছিল যাতে, কোনো মারওয়াড়ি দুর্গের ছাদের কার্নিশের উপর দিয়ে মাথা উঁচু করলেই তাকে গুলি করে ফেলে দেবে। আর অন্যরা চারজন চারজন করে দল বেঁধে কাঁধে মই নিয়ে এগোচ্ছল আর অন্যদলটি বারুদের পাত্র ফটকের গায়ে রেখে তাতে আগুন জ্বেলে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবে। আওরঙ্গজেব আর মুয়াজ্জম ভেবেছিলেন ধোঁয়া আক্রমণকারীদের রক্ষা করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে, তাই ওরা আশপাশের এলাকার ঝোঁপঝাড় থেকে ডালপালা এনে কেটে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের জন্য একজায়গায় স্তূপ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কামানের ধোঁয়ার সাথে আরো ধোঁয়া বাড়াবার জন্য এই জ্বালানিতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তোপ দাগা শুরু হতেই শুকনো ডালপালার স্থূপে কমলা রংয়ের অগ্নিশিখা দেখা গেল। ধোয়ার চাদরের নিচে ঢেকে সৈন্যরা লুকিয়ে এগোবার আগেই আওরঙ্গজেব দেখলেন গোলার আঘাতে ফটকের পাশের দেয়াল থেকে কয়েকটি পাথরের টুকরা ভেঙ্গে পড়েছে। ঘন ধোয়ার পর্দায় ঢাকা আড়ালের মধ্য দিয়ে বরকন্দাজ বাহিনী এগিয়ে চললো, তাদেরকে অনুসরণ করলো মই বাহক আর পদাতিক সেনা, যারা মই বেয়ে আক্রমণে যাবে। দুই পাশে বারুদের ছোট ছোট পাত্র ঝুলিয়ে জোয়াল কাঁধে একদল সৈন্য তখনও সামনে এগোবার নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করছিল।
একটু পরই আওরঙ্গজেব গাদা বন্দুকের ফট ফট আওয়াজ শুনতে পেলেন। কমলা রঙেয়ের পাগড়িপরা মারওয়াড়ি সৈন্যরা বুরুজের ছাদের ছিদ্র দিয়ে গাদা বন্দুকের নল বের করে গুলি করছে আর মোগল বরকন্দাজরাও সমানে তার প্রত্যুত্তর দিচ্ছে। একজন মারওয়াড়ির প্রথমে মাথা তারপর হাত-পা শূন্যে ছুঁড়ে মাটিতে পড়লো। ধোয়ার উপরে দুর্গের দেয়ালের গায়ে একটি মইয়ের মাথা দেখা গেল। তারপর পরই একজন মোগল পদাতিক সেনাকে দেখা গেল দুর্গের কিনারা বেয়ে বুরুজে উঠার চেষ্টা করছে। দুজন মারওয়াড়ি তার দিকে ছুটে এসে ধাক্কা দিয়ে মইসহ মোগল সৈন্যটিকে নিচে মাটিতে ধোঁয়া মাঝে লড়াইয়ের ময়দানে ফেলে দিল। একই প্রক্রিয়ায় দু-তিনবার চেষ্টা করার পর অবশেষে একজন মোগল সেনা দুর্গের ছাদে উঠে পড়লো। সে আরেক জনকে মই থেকে উপরে উঠার জন্য সাহায্য করছিল, এমন সময় একজন মারওয়াড়ি সেনা তরোয়ালের আঘাতে তাকে দেয়াল থেকে ফেলে দিল আর অপর মোগল সেনাটিকেও ফেলে দেওয়ার পর সে নিজেও মোগল গাদা বন্দুকের গুলির আঘাতে নিচে পড়ে গেল।
বাতাসে ভেসে ধোঁয়া ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছিল। আগুন জ্বালাবার জন্য মোগলরা খুব বেশি পরিমণে খড়কুটা জমা করতে পারে নি। আর নিজেদের লোকদেরকে আহত করার ভয়ে কামান থেকেও ঘন ঘন গোলা ছোঁড়া সম্ভব ছিল না, কাজেই সেখান থেকেও ধোঁয়া কমে এসেছিল। ধোঁয়া কমে আসতেই আওরঙ্গজেব দেখলেন দুর্গের দেয়ালের নিচে মাটিতে অনেক মৃতদেহ পড়ে রয়েছে। কিছু মোগল সেনা লাশের স্তূপের আড়ালে লুকিয়ে দুর্গের ছাদের দিকে গুলি ছুঁড়ছিল। তারপর দ্রুত কয়েকবার আগুন জ্বলে উঠার সাথে সাথে দুর্গের মূল ফটকের কাছ থেকে একের পর এক কানফাটা গুড়ুম গুড়ম শব্দ পাওয়া গেল। কামানের গোলার আঘাতে দেয়ালের যে জায়গায় পাথর ভেঙ্গে গিয়েছিল সেখানে বারুদের পাত্র বহন করে যে মোগল সৈন্যরা ফটক উড়াতে গিয়েছিল ওরা তাদের কাজে সফল হয়েছে। প্রচণ্ড বিস্ফোরণে মানুষের দেহ,পাথর আর ভাঙ্গা কাঠের টুকরা শূন্যে উড়ে গেল। ধোঁয়া কমে আসার পর দেখা গেল মূল ফটকের একটি পাল্লা আংশিক ভেঙ্গে চুরমার হয়ে একটি মাত্র কজা থেকে কোনোমতে ঝুলছে। আর এরপাশের দেয়ালও ভেঙ্গে গেছে।
