দুর্গসহ এতে আর যেসব অপ্রয়োজনীয় সামগ্রী আর অস্ত্রশস্ত্র তার প্রয়োজন ছিল না, সেগুলো পোড়ানো প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। এরপর লুটের মাল তার সৈন্যদের মধ্যে বিলি-বণ্টনের ব্যবস্থা করা হবে। তারপর পাশে পুত্র সম্ভাজিকে নিয়ে বিজয়-ভোজে পৌরাহিত্য করার কথা। সাধারণত এসব আয়োজনের দিকে তিনি সব সময় উন্মুখ হয়ে তাকিয়ে থাকেন, তবে আজ তিনি খুব একটা সুস্থবোধ করছেন না। মাথায় যন্ত্রণা আর জলাভূমির অসংখ্য মশার কামড়ে সারা গায়ে চুলকাচ্ছিল আর পেকে উঠে পুঁজ হচ্ছিল। সন্ধ্যায় ঠাণ্ডা পড়তেই তিনি দেখলেন তার সৈন্যরা অনেকেই গায়ে কম্বল জড়িয়েছে অথচ তিনি গরমে ঘামছিলেন। কপালে হাত দিয়ে দেখলেন সেখানে ঘাম জমেছে। এছাড়া দুর্গ আত্মসমর্পণের ঘটনার উত্তেজনার পর তার হৃৎস্পন্দন এখনও স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে আসে নি। এখনও বুক ধুকপুক করছে। তার মনে হচ্ছিল তিনি বুকের ধুকপুকানির শব্দটি শুনতে পাচ্ছিলেন।
যাইহোক। একটু পরই তিনি সুস্থ হয়ে উঠবেন। পেছনে ঘুরে তাঁবুর ভেতরে ঢুকে বিজয়োৎসবে যোগ দেওয়ার জন্য তৈরি হতে লাগলেন। তাঁবুর ভেতরে একটু ঠাণ্ডা মনে হল। বেশ ভাল। তার পরিচারক একটি তেপায়া তাকের উপর একটি মাটির বাটিতে পানি রেখে গিয়েছিল। পাশেই রাখা একটুকরা সুতির কাপড় তুলে নিয়ে ঝুঁকে পানিতে ভেজালেন। তারপর ভেজা কাপড়টা দিয়ে কপালের ঘাম মুছার জন্য কাপড়ের টুকরাটি তুলতে গিয়েই হঠাৎ তার মনে হল পানির বাটিটা যেন ঘুরে ঘুরে তার দিকে উঠে আসছে। তার মাথায় রক্ত চড়ে গেল, তিনি জ্ঞান হারিয়ে পানির বাটিটির উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে যেতেই বাটিটা তেপায়ার উপর থেকে মাটিতে পড়ে ভেঙ্গে খানখান হয়ে গেল। আর তিনিও মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন।
আবার চোখ খুলতেই শিবাজি দেখলেন, সম্ভাজি, তার হেকিম আর তার কয়েকজন পরিচারক তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি হয়েছে?
হেকিম উত্তর দিল, “আপনি জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়েছিলেন প্রায় তিনঘণ্টা যাবত। আপনার পরিচারক আপনাকে এ অবস্থায় দেখতে পেয়ে বিছানায় শুইয়ে তারপর আমাকে ডেকে এনেছে।
শিবাজি উঠে বসার চেষ্টা করলেন, তবে আবার ক্লান্ত হয়ে বিছানায় পড়ে গেলেন। তার গায়ের পাতলা সুতির চাদর আর পরনের সমস্ত জামা-কাপড় মনে হচ্ছে ভেজা। ওরা কি তার জ্ঞান ফেরাবার জন্য গায়ে পানি ছিটিয়েছিল? মুখে হাত বুলিয়ে দেখলেন ঘামে ভেজা। সারা গা কাঁপছে, নিশ্চয়ই খুব জ্বর হয়েছে। খুব কষ্ট করে চোখ মেলে ওদের দিকে তাকালেন। স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে সবাই খুব উদ্বিগ্ন হয়ে আছে। হাঁপাতে হাঁপাতে তিনি বললেন, আমি কি খুব অসুস্থ? সত্যি কথা বল…আমাকে জানতে হবে…আমি কি মারা যাচ্ছি?
‘জানি না…মহারাজ। তবে আমার মনে হয় আপনি গুরুতর অসুস্থ।
শিবাজি আবার চোখ বুজলেন, শরীরে শক্তি সঞ্চয় করার চেষ্টা করলেন। তার এখনও অনেক কিছু করা বাকি রয়ে গেছে। তবে তিনি অনুভব করছিলেন যে, তার হাত-পায়ের আঙুল আসাড় হয়ে যাচ্ছে। একজন মানুষের যখন মৃত্যু হয়। তখন কি এরকম অনুভূত হয়? তিনি সবসময় ভাবতেন তার জীবনের শেষদিনটি একটি যুদ্ধের ময়দানে কাটবে–একজন যোদ্ধার সম্মানজনক মৃত্যু, এরকম কাঁপতে কাঁপতে জলাভূমির জ্বরে ভুগে জীবন শেষ হওয়া নয়।
আবার চোখ খুলে ছেলেকে ইশারা করলেন কাছে আসতে। তারপর বললেন, ‘আমার হয়তো আর বেশি সময় নেই সম্ভাজি। মনোযোগ দিয়ে শোন। মোগল নিপীড়ন থেকে আমার দেশবাসী আর আমার ধর্মকে মুক্ত করার পথে আমি অনেক দূর এগিয়েছি…তবে আরো অনেক অনেক দূর পথ পাড়ি দিতে হবে। তবে আমার আশংকা একা পাড়ি দিয়ে এই অভিযান সম্পূর্ণ করার জন্য তোমাকে ছেড়ে দিয়ে আমার চলে যেতে হবে। এটি সহজ পথ নয়, তবে পুত্র, আমাকে কথা দাও, তুমি সমস্ত মানসিক বিভ্রান্তি আর বিহ্বলতা এড়িয়ে হিন্দুস্তানের মানুষদের তোমার পেছনে নিয়ে যত দ্রুত সম্ভব এপথে এগিয়ে যাবে।’ কথাগুলো বলতে গিয়ে তার নিঃশ্বাস নিতে আরো কষ্ট হচ্ছিল। তারপর বলে চললেন, তোমরা সবাই মিলে একটি অপ্রতিরোধ্য জোয়ার সৃষ্টি করে মোগল হুমকি ধুয়ে-মুছে সাফ করে দিও। তোমাকে যা যা শিখিয়েছি সব মনে রেখো…আঘাত করবে জোরে এবং দ্রুত, একবার এখানে আরেকবার ওখানে। একটি ছায়ার মতো ছলনাময় হবে আর তখন হেঁচড়িয়ে চলা তাদের সেই বিশাল সেনাবাহিনী কখনও তোমাকে ধরতে পারবে না।’ শিবাজির চোখের আলো নিভে এল। তার আত্মা দেহ ছেড়ে চলে যেতেই শরীরে একবার খিচুনি উঠতেই শরীর ঝাঁকি দিয়ে উঠলো। তারপর তিনি চিরদিনের জন্য স্থির হলেন। সম্ভাজি নিচু হয়ে তার বাবার কপালে চুমু খেল। তারপর সে বললো, আমি মনে রাখবো বাবা।’
*
সব সময় যুদ্ধ শুরু হতেই আওরঙ্গজেব তার বিশ্বস্ত হাতির পিঠে কারুকাজ করা হাওদায় শান্ত হয়ে বসে থাকতেন। দুজন মাহুত হাতিটির কাঁধের দুইপাশে বসতো আর হাওদায় আওরঙ্গজেবের পেছনে তার গাদা বন্দুকগুলো নিয়ে একজন চাপরাশি আর একজন দেহরক্ষী বসে থাকতো। হাতিটির চতুর্দিকে অশ্বারোহী দেহরক্ষীবাহিনী তাঁকে পাহারা দিয়ে চলতো। এরা সবাই অভিজ্ঞ যোদ্ধা এবং ধর্মপ্রাণ মুসলিম। তাঁর মতো ওদের সবার মনোযোগ সামনের দিকে, মুয়াজ্জমের সেনাবাহিনী আরাবল্লী পাহাড়ে একটি মারওয়াড়ি দুর্গে। আক্রমণ করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
