সর্বাধিনায়কের লাল রঙয়ের তাঁবুর মধ্যে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে পায়চারি করতে করতে আওরঙ্গজেব, একটার পর একটা বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে ভেবে চললেন। সবজায়গায় বিদ্রোহ চলছে–শিবাজি নিজেকে মারাঠার রাজা ঘোষণা করার মতো ধৃষ্টতা দেখিয়েছে আর পর্বতে তার সুরক্ষিত আশ্রয় থেকে এখনও সমস্ত দাক্ষিণাত্য জুড়ে লুটতরাজ চালিয়ে বেড়াচ্ছে। তবে এছাড়াও তাকে পুরো প্রশাসন ঢেলে সাজাতে হবে এবং দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। এর মানে মারওয়াড়িদের প্রতিরোধ ক্ষমতা দ্রুত শেষ করে দিতে হবে। আকবর কি তার হয়ে এই কাজটি করতে পারবে? তিনি খুব একটা নিশ্চিত হতে পারছেন না। সর্বতোভাবে তাঁর ছেলে একজন দক্ষ সেনাপতি বটে আর আজম যেরকম মাঝে মাঝে হঠকারিতা করে সেরকমও নয়। তবে মনে হয় না যে, তার বাবার হাতে সে একটি বিপর্যয় তুলে দেবে, তবে নিশ্চিত বিজয়ও কি এনে দিতে পারবে? সে কি নিজেকে দুর্বল দেখাচ্ছে? তার উপর যে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, তা পালনে সে কতটুকু অঙ্গীকারবদ্ধ এবং নিবেদিত প্রাণ? সে লিখে জানিয়েছে যে, তার বাবার জন্য সে বিজয় আনতে চাচ্ছে, তবে তাকে নিজের এবং তার ভবিষ্যতের জন্য বিজয় অর্জন করতে হবে। তিনি যে প্রতিবেদন পেয়েছেন, তা থেকে জানা যাচ্ছে যে, কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাঁর ছেলে ব্যাপকভাবে তার সেনা কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনা করতে, তাদের মতামত বিবেচনা করতে এবং তাদের সাথে এ বিষয়ে বিতর্ক করতে পছন্দ করে। ঐকমত্যের এ ধরনের ইচ্ছা তাকে জনপ্রিয় করেছে, তবে একজন অধিনায়কের জন্য দক্ষতা এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্ষমতার সুস্পষ্টতা জনপ্রিয়তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
অনেক ভাবনা-চিন্তার পর আওরঙ্গজেব তার কোরচিকে ডেকে কাগজ-কলম আনতে বললেন। তারপর আকবরকে একটি চিঠি লিখতে শুরু করলেন। চিঠির প্রথম কথাগুলোই ছিল ভর্ৎসনার….
*
তোমার লোকেরা তোমার কথা মানতে বিমুখ, একথা স্বীকার করে তুমি নিজেকে যেমন লজ্জিত করেছ তেমনি আমাকেও লজ্জায় ফেলেছ। একজন মোগল শাহজাদা কখনও তার অধীনস্থ লোকদেরকে তাকে প্রভাবিত করতে অনুমতি দিতে পারে না। আর কিভাবে, কখন যুদ্ধ হবে সে সম্পর্কে কিছু নির্দেশ করাতো দূরের কথা। একজন নেতাকে নেতৃত্ব দিতে হবে, আর তুমি তা করতে অনিচ্ছুক মনে হচ্ছে। মারওয়াড়িদের রণকৌশল নতুন কিছু নয়, যা তোমার বিশ্বাস। বরং এগুলো শিবাজি আর উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের উপজাতি, উভয়ের কৌশলের মতো একই রকম। কাবুলের বণিকদের উপর যে দুবৃত্তরা লুণ্ঠন চালাচ্ছিল, তাদেরকে দমন করার জন্য আমি কি নিজে সফলভাবে আমার সেনাদেরকে নেতৃত্ব দিয়ে পেশোয়ারের বাইরে গিরিপথে নিয়ে যাই নি? দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে আর বিদ্রোহীদের কঠিন শাস্তি দিয়ে কী সেখানে সবকিছু অবসান করি নি?
আমার বিশ্বাস মারওয়াড়িদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের এই আক্রমণে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো শক্তিশালী নেতা হিসেবে তুমি নিজেকে তুলে ধরতে পারো নি। বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে তোমার বদলে মুয়াজ্জম গুজরাটের সুবেদারি ছেড়ে তোমার সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব গ্রহণ করতে যাবে। যাইহোক আমি তোমাকে এখুনি আরেকটা সুযোগ দিচ্ছি, যাতে তুমি নিজেকে দায়মুক্ত করতে পার আর প্রমাণ করতে পার যে, তোমার সম্পর্কে আমি যে আপত্তি তুলেছি, তা ভিত্তিহীন।
আমার কাছে খবর এসেছে যে, মেওয়ারিরা তাদের জ্ঞাতিভাই আর মারওয়াড়ের একই ধর্মাবলম্বী ভাইদের সাথে মিলে সশস্ত্র বিদ্রোহ করতে যাচ্ছে। আমি দুটি সেনাবাহিনীর সমাবেশ করতে যাচ্ছি, এরা মেবারে ঢুকে তাদেরকে দমন করবে। একটি অগ্রসর হবে পূর্বদিক থেকে আর অন্যটি যাবে দক্ষিণ দিক থেকে। তুমি এখানে ফিরে এসে দক্ষিণের বাহিনীর নেতৃত্ব নেবে। আর তোমার ভাই আজম পূর্বদিক থেকে অগ্রসর হওয়া বাহিনীর নেতৃত্ব দেবে। আমি নিজে পুরো সমরাভিযানের তত্ত্বাবধান করবো। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি যেন, এবার তুমি তোমার নতুন নেতৃত্ব নিয়ে আমাকে আর হতাশ করবে না। সিদ্ধান্তটি নিয়ে তাকে জানাতে পেরে খুশি হয়ে আওরঙ্গজেব দ্রুত চিঠিটা শেষ করলেন। কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক কিংবা ব্যক্তিগত বিদায় সম্ভাষণ না দিয়ে কেবল সই করলেন। তারপর লিখলেন–আল্লাহর মেহেরবাণীতে হিন্দুস্তানের সম্রাট।
১০. আওরঙ্গজেব সাবধান
ছোট্ট মোগল দুর্গটি থেকে তখনও কমলা রংয়ের অগ্নিশিখা তারা-ভরা সন্ধ্যার আকাশের দিকে উঠছিল। শিবাজি সেদিকে তাকিয়ে রইলেন। তপতি নদীর একটি উপশাখা যেখানে মূল নদীর সাথে মিশেছে, তার উপকূলরেখা থেকে অগ্রবর্তী উচ্চভূমির উপর দুর্গটির অবস্থান। দুর্গ থেকে সামনেই একটি জলাভূমি দেখা যায়। দুইদিন আগে তিনি তার লোকজনসহ পাহাড়ের আশ্রয় থেকে বের হয়ে এখানে উপস্থিত হয়েছিলেন। অগ্রবর্তী দল নিয়ে তার ছেলে সম্ভাজী দুর্গ আক্রমণ করার আগেই দুর্গরক্ষাকারী মোগল সেনাদল দুর্গের ইটের দুই দেয়ালের ভারী ফটক বন্ধ করে দিয়েছিল। যাইহোক তারপর অবশ্য মোগলরা খুব একটা প্রতিরোধ করেনি। পরবর্তী আটচল্লিশ ঘণ্টা ওরা তার নিজের সেনাদলকে উদ্দেশ্য করে অত্যন্ত বিক্ষিপ্তভাবে গোলাবর্ষণ করেছিল। মুখোমুখি আক্রমণ করে প্রাণহানি করার তার খুব একটা ইচ্ছা ছিল না। তাই তিনি দুর্গরক্ষাকারী মোগল সেনাদের মনোবল পরীক্ষা করার উদ্দেশ্যে তার সেনাদলকে দুর্গ অবরোধ করে রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন। আজ সাময়িক অস্ত্রবিরতির পতাকা বৈঠকের তিনি প্রস্তাব দিলেন, মোগলরা অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ করলে তাদেরকে নিরাপদে দুর্গ ছেড়ে যেতে দেওয়া হবে। মোগলরা সাগ্রহে প্রস্তাবটি গ্রহণ করলো। তিনি তার প্রতিশ্রুতি রক্ষায় যত্নবান ছিলেন এবং আত্মসমর্পণকারী সেনাদেরকে কোন ধরনের দৈহিক নির্যাতন কিংবা এমনকি টিটকারী দেওয়া থেকেও তার লোকদের বিরত রেখেছিলেন। এতে বরং ভালোই হবে, কারণ যদি এরা আবার মোগল সেনাবাহিনীর চাকরিতে ফিরে যায়, তবে তার উদারতার কথা তাদের অধিনায়কদের জানাবে। তবে তার সন্দেহ সবাই হয়তো মোগলদের অধীনে চাকরিতে নাও ফিরে যেতে পারে। এদের কাহিনীতে উজ্জীবিত হয়ে অন্যান্য মোগল সেনারা তার আক্রমণ বলিষ্ঠভাবে প্রতিহত করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে।
