আকবর তার দেহরক্ষী দলের প্রধানকে জিজ্ঞেস করলেন, আমরা কী সবচেয়ে বড় দলটির পিছু নেব।’
সে বললো, আমার মনে হয় তা ঠিক হবে না, জাঁহাপনা। তারা হয়তো আমাদেরকে প্রলোভন দেখিয়ে পাহাড়ি এলাকার আরো গভীরে নিয়ে যেতে চাইছে। যেখানে ওরা আবার একত্রিত হয়ে অতর্কিতে আমাদের উপর হামলা করতে পারে। তাছাড়া একটু পরই সূর্য ডুবে যাবে। অন্ধকার হতে আর বেশি সময় নেই।
আকবর মাথা নেড়ে সায় দিলেন। লোকটি ঠিক বলেছে। তার চেয়ে ভালো হয় মূল বাহিনীর কাছে ফিরে গিয়ে পরদিন ভোরে চর পাঠিয়ে মারওয়াড়ি দলটির অবস্থান খুঁজে দেখা। এই ক্ষতিটির কথা বলার পর তার বাবা কিরকম প্রতিক্রিয়া দেখাবেন, তিনি তা আন্দাজ করতে পারলেন। তবে আরো ক্ষয়ক্ষতি কিংবা রাতের বেলা আকস্মিক আক্রমণে নিজের জীবন হারানোর চেয়ে সেটা ভালো।
*
আওরঙ্গজেবের তরুণ কোরচি কুর্নিশ করে তাকে জানালো, ‘জাহাপনা, এখুনি একজন কাসিদ-বার্তাবাহক আপনার পুত্র শাহজাদা আকবরের কাছ থেকে জরুরি বার্তা নিয়ে এসেছে। একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে সম্রাট সাম্রাজ্যের পূর্বাঞ্চলের সুবাহগুলো থেকে যে খাজনার হিসাব এসেছে তা একপাশে সরিয়ে রাখলেন। এগুলো পড়ে তিনি খুব একটা খুশি হননি। অন্য রাজ্যগুলোতেও যে পরিমাণ যেমন হওয়ার কথা ছিল তার চেয়ে কম খাজনা আদায় হচ্ছে। তাঁর আশংকা অবাধ দুর্নীতি এর জন্য দায়ী। তার সুবেদাররা আর তাদের কর্মকর্তারা মনে করেছে যে তাঁর সমস্ত মনোযোগ বিদ্রোহ দমনে আর বিদেশি আক্রমণের দিকে আচ্ছন্ন থাকায় ওরা তার নজর থেকে অনেক দূরে রয়েছে। কাজেই ওরা এই সুযোগে ঘুষ নিতে পারবে কিংবা যে অর্থ খাজনা হিসেবে আদায় হচ্ছে তার কিছু অংশ সবার অজান্তে নিজেদের পকেটে ঢুকাতে পারবে। যখনই তিনি দিল্লির কোষাগারের দপ্তর থেকে অনুসন্ধান করার জন্য কোনো গোমস্তা বা কর পরিদর্শক পাঠাতেন, তারা সাধারণত তাকে আশ্বস্ত করতে যে সব ঠিক আছে। তবে অধিকাংশ মানুষই অর্থের জন্য অসৎ কাজ করতে তৈরি আর সত্যিকার বিশ্বস্ততা আজকাল একেবারে বিরল আর তাদেরকেও হয়তো ঘুষ দিয়ে কেনা যায়। একমাত্র সমাধান হচ্ছে তার নিজেকে একটি রাজকীয় তদন্ত ও অনুসন্ধান কর্ম চালাতে হবে আর কিছু নিম্নপদস্থ কর্মকর্তাকে পুরস্কার কিংবা শাস্তি কমিয়ে দেওয়ার লোভ দেখিয়ে তাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রকাশ করার জন্য রাজি করাতে হবে।
কিন্তু তিনি নিজে সব জায়গায় যেতে পারেন না। তিনি এখানে আজমিরে এসেছেন রাজস্থান আর মারওয়াড়ের বিরুদ্ধে আকবরের অভিযানের কাছাকাছি থাকতে। বড় ধরনের কোনো বিপর্যয় না হলেও তিনি যা আশা করছিলেন অভিযানটি সেরকম হচ্ছে না। তবে বেশ কিছুদিন হল তার ছেলের কাছ থেকে কোনো খবর আসছে না, কাজেই এই কাসিদের কাছে নিশ্চয়ই কোনো খবর থাকতে পারে। তিনি কোরচিকে বললেন, আমি এখুনি খবরটা দেখবো।
তরুণ কোরচিটি বহুব্যবহৃত একটি চামড়ার থলে থেকে একটি সিলমোহর করা কাগজ বের করে তার সামনে ধরে বললো, আমি এটা নিয়ে এসেছি জাঁহাপনা।
আওরঙ্গজেব কাগজটা নিয়ে দ্রুতহাতে সিলমোহরটি ভাঙ্গলেন। চিঠির উপরের আনুষ্ঠানিক সালাম ইত্যাদি বাদ দিয়ে তিনি সরাসরি বার্তাটির মূল বিষয়বস্তু জানার জন্য পড়া শুরু করলেন। যতই পড়তে লাগলেন ততই তার ভ্রু কুঁচকাতে শুরু করলো।
আকবরের অভিযানে কিছুই ফল হয় নি। চিঠির শুরুতে তিনি মারওয়াড়িদের লড়াই করার কায়দা বর্ণনা করেছেন। ওরা অতর্কিতে আক্রমণ করছে, আজ এখানে, কাল ওখানে আর সবসময় ছোট ছোট দলে হামলা করে তার সেনাবাহিনীর অনেক লোককে হতাহত করে আবার অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। অনেক সময় হামলাগুলো সন্ধ্যার পর হচ্ছে, যাতে ওরা সহজে পালিয়ে যেতে পারে। মোগল সৈন্যরা একটি নিয়মিত সেনাবাহিনীর বদলে এ ধরনের শত্রুর সাথে লড়াই করতে অভ্যস্ত নয়, যারা দস্যুর মতো আচরণ করছে। তিনি মারওয়াড়িদেরকে প্রলুব্ধ করে পাহাড়ি অঞ্চলের ভেতর থেকে সমতল ভূমিতে আনতে পারছেন না, যাতে ওদের সাথে পরিকল্পিত ও সুসজ্জিত সৈন্যবাহিনী সমন্বয়ে মুখোমুখি লড়াই করা যায়। সেখানে তার অধিক সৈন্যসংখ্যা আর উন্নত অস্ত্রশস্ত্র ছাড়াও, বিশেষত কামানগুলোর ব্যবহার প্রভাব ফেলতে পারতো। তার সৈন্যরা মারওয়াড়িদের পিছু নিয়ে পাহাড়ি এলাকায় ঢুকতে অনিহা প্রকাশ করছে। অতর্কিত হামলার ভয়ে ওরা এ ধরনের ভূখণ্ডে লড়াই করতে সতর্ক, অভিজ্ঞতা থেকে এই ভীতিটি অংশত যুক্তিযোগ্য। দিন দিন ওরা আরো সতর্ক হয়ে কাছাকাছি দলবদ্ধ হয়ে থাকছে। বিপদের প্রথম কোনো ইঙ্গিত পাওয়ার সাথে সাথে তার চর আর পাহারাদারেরা পিছু হটে মূল সেনাবাহিনীর কাছাকাছি চলে আসছে। কাজেই শত্রুর কাছাকাছি হওয়ার জন্য তিনি যথেষ্ট তথ্যও পাচ্ছেন না। যখনই কোনো কেল্লা দখল করছেন তখনই দেখছেন সেটা খালি। আর রাজপুতদের আক্রমণের ভয়ে তার লোকেরা এ ধরনের স্থানে ঘাঁটি গাড়তেও অনিচ্ছুক হয়ে পড়ছে। আকবর পুরো বিপাকের একটি সারাংশ এভাবে তুলে ধরলেন :
রাজপুত রণকৌশল আর নিজদেশের অলিগলি-সবজায়গা সম্পর্কে তাদের সম্যক জ্ঞানের সামনে আমাদের সেনাবাহিনীর সংখ্যাধিক্য আর উন্নত অস্ত্রশস্ত্র অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। আমি অবশ্যই স্বীকার করছি–আর সেই সাথে ক্ষমা চাচ্ছি যে আপনার জন্য যে বিজয় আমি অর্জন করতে চেয়েছিলাম তা থেকে এখনও অনেক দূরে রয়েছি।
