তারপর হঠাৎ তিনবার শিঙ্গা বেজে উঠার শব্দ শুনতে পেলেন। সেনাপতিদের বলা ছিল, কোনো বিপদ এলে এভাবে সতর্ক সঙ্কেত দিতে। শব্দটি অগ্রবর্তী দল থেকে এসেছিল, ওরা সামনে আরাবল্লি পাহাড়ের পেছনে তার দৃষ্টির আড়ালে ছিল। ঘোড়ার পেটে পা দিয়ে তো মেরে আকবর কাফেলার পাশ দিয়ে সামনে ছুটতে ছুটতে দেহরক্ষী দলকে চিৎকার করে কাছাকাছি থাকতে বললেন। পাথুরে জমিনের উপর দিয়ে ঘোড়ার খুরের ঠকাঠক শব্দ করে এগিয়ে একটি পাহাড় ঘুরতেই সামনে দেখা গেল জাফরানি রংয়ের পোশাকপরা একদল ঘোড়সওয়ার গরম কুয়াশার মধ্য থেকে বের হয়ে আসছে। মোগল অগ্রবর্তী দলের প্রথম সারির উপর আক্রমণ করতে উদ্যত শত্রুদের খোলা তরোয়ালের উপর রোদ পড়ে ঝলকাচ্ছে।
মোগল অগ্রবর্তী দলটি বেশ ধীরগতিতে এগোচ্ছিল, তবে কয়েকমুহূর্ত পর মারওয়াড়িদের আকস্মিক হামলার ধাক্কায় অগ্রবর্তী দলটি টলমল করে সামান্য পিছু হটে এল। আতঙ্কিত হয়ে কয়েকটি ঘোড়া পেছনের পায়ে ভর দিয়ে খাড়া হল। অন্য কয়েকটি পাঁজরে আঘাত পেয়ে পড়ে গেল, আরোহীদেরকে মাটিতে ছুঁড়ে ফেললো। তিনজন মারওয়াড়ি একজন মোগল পতাকা বাহককে ঘিরে ধরলো। তরবারির এক কোপে সে একজন মারওয়াড়িকে ঘোড়ার পিঠ থেকে ফেলে দিল, তবে এতে তার নিজের ঘোড়ার লাগাম তার হাত থেকে ছুটে যাওয়ায় সে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললো। ঘোড়াটা একপাশে হেলতেই আরেকজন মারওয়াড়ি তার তরোয়ালের ডগা মোগল পতাকাবাহকের গলায় বিঁধিয়ে দিল। লোকটি ঘোড়ার পিঠ থেকে ছিটকে পড়লো, তবে তার বাম পা পাদানিতে আটকে গেল। আতঙ্কিত ঘোড়াটি আরোহীর দেহটি পেছন পেছন টেনে নিয়ে ছুটে চললো, লোকটির মাথা মাটিতে ঠুকতে ঠুকতে চললো। আরেকজন মারওয়াড়ি মাটিতে পড়ে থাকা মোগল পতাকাটি তুলে নিয়ে বিজয়োল্লাসে চেঁচিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে চললো। মোগল অশ্বারোহীদের প্রথম সারির পেছনে গাদা বন্দুকধারী একটি মোগল পল্টনও আসছিল। তবে বিপদ সঙ্কেত পাওয়ার পর ওরা বন্দুকে গোলা ভরারও সময় পায়নি আর বন্দুক রাখার জন্য যে তেপায়া কাঠামো ওরা পিঠে বেঁধে বহন করছিল, সেগুলো নামিয়ে প্রস্তুত হওয়াতো দূরের কথা। কয়েকজন মোগল বন্দুকধারী অবশ্য দ্রুত হাতে বন্দুক ছুঁড়ে দুইতিনজন মারওয়াড়িকে ঘোড়ার পিঠ থেকে ফেলে দিল। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই অন্যান্য মারওয়াড়িরা ওদেরকে ঘিরে ফেলে কাস্তে দিয়ে ধান কাটার মতো ওদেরকে কোপাতে লাগলো।
সম্ভবত পাঁচমিনিটও পার হয় নি, এদিকে আকবর তখনও মাথা নিচু করে ঘর্মাক্ত ঘোড়াটি ছুটিয়ে যেদিকে লড়াই হচ্ছিল সেদিকে ছুটে চলছিলেন। তারপর তার সবুজ পোশাকপরা দেহরক্ষী দল নিয়ে চারদিকে চিৎকার-চেঁচামেচি আর যুদ্ধের কোলাহলের মধ্যে লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। ভারী গোঁফওয়ালা একজন রাজপুত অশ্বারোহীর উপর তরোয়াল চালিয়ে আকবর লোকটির উরু যখম করলেন তবে সেই সাথে একটি রাজপুত বল্লম তার বুকের বর্মে আঘাত করতেই তিনি পেছনের দিকে টলে পড়লেন। ভাগ্যিস ভারী ইস্পাতের বর্মটি কেবল সামান্য বেঁকে গিয়েছিল। আরেকজন রাজপুত সোজা-লম্বা তরোয়াল নিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে তার দিকে এগোতেই তিনি তাকে আঘাত করলেন। তবে তাড়াহুড়ার কারণে আকবরের তরোয়াল লোকটির গায়ে না লাগলেও আঘাত এড়াতে সে একদিকে সরে যাওয়ায় সে নিজেও তার তরোয়াল চালাতে পারলো না। তারপর সে আবার তার ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে লম্বা তরোয়ালটিকে বল্লমের মতো সামনে তাক করে আকবরকে আক্রমণ করতে ছুটে এল। তবে আকবরের কাছে পৌঁছার আগেই একজন দেহরক্ষী তার ধারালো তরোয়াল দিয়ে এমন জোরে লোকটির গলায় আঘাত করলো যে, তার মুণ্ডটি ধর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মাটিতে পড়ে গেল আর তার জাফরান রংয়ের পোশাকপরা মুণ্ডুহীন ধড়টি কয়েক মুহূর্ত ঘোড়ার পিঠে খাড়া হয়ে থেকে তারপর মাটিতে পড়ে গেল। আকবর লক্ষ করলেন আরেকজন মারওয়াড়ি তার ঘোড়ার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে। লোকটি তার সামনে দিয়ে ছুটে যাওয়ার সময় তিনি হাওয়ায় উড়তে থাকা লোকটির আলখাল্লার একপ্রান্ত খামচে ধরে টান দিলেন। মারওয়াড়িটি ঘোড়ার পিঠ থেকে পেছনে মাটিতে আকবরের ঘোড়ার খুরের নিচে পড়ে গেল। এ ঘটনায় আকবরের ঘোড়াটিও আতঙ্কিত হয়ে পেছনের পায়ে ভর দিয়ে খাড়া হল। আকবর তার তামাটে রংয়ের ঘোড়াটির গলা আঁকড়ে ধরে নিজেকে সামলালেন তবে আতঙ্কিত পশুটিকে শান্ত করতে তার কিছু সময় লাগলো।
ঘোড়াটি শান্ত হওয়ার পর তিনি আর কোনো লক্ষ্যবস্তু আছে কি-না দেখার জন্য চারপাশে তাকিয়ে দেখলেন মারওয়াড়িরা রণেভঙ্গ দিয়ে ঘোড়ায় চড়ে ছুটে পালাচ্ছে। ওদের হামলা করার এখনও এক ঘণ্টাও পার হয় নি। দুয়েকজন অশ্বারোহী থেমে নিচু হয়ে আহত আর ঘোড়া থেকে পড়ে যাওয়া সঙ্গীদের তুলতে চেষ্টা করছিল। একজন মারওয়াড়ি বামহাতে ঘোড়ার লাগাম ধরে ডান হাত দিয়ে মাটিতে পড়ে থাকা তার এক সঙ্গীকে তুলতে যাচ্ছিল, এমন সময় একজন মোগল বরকন্দাজ তার পিঠে গুলি করলো। লোকটি দুই হাত শূন্যে ছুঁড়ে ঘোড়ার পিঠ থেকে মাটিতে তার সঙ্গীর উপর পড়ে গেল। তারপর মৃত্যু যন্ত্রণায় বালুতে পা ছুঁড়তে লাগলো।
চারপাশে তাকাতে তাকাতে আকবর ভাবলেন, এই নিঃস্বার্থ রাজপুত যোদ্ধাদের ব্যক্তিগত সাহসিকতা নিয়ে কেউ সন্দেহ প্রকাশ করতে পারবে না। তিনি চাচ্ছিলেন তার লোকজনদের জড়ো করে দ্রুত অদৃশ্য হয়ে যাওয়া শত্রুর পিছু নিতে। তবে অনেক মানুষ আর ঘোড়া আহত হওয়ায় আর চারদিকে বিশৃঙ্খলা আর বিভ্রান্তির কারণে প্রায় এক ঘণ্টার বেশি সময় লেগে গেল যথেষ্ট অশ্বারোহী নিয়ে আবার তৈরি হতে। আরেক ঘণ্টা পর তিনি ঢেউয়ের মতো উঁচুনিচু বালুময় পাহাড়ি এলাকার ভেতরে ঢুকে কেবল মারওয়াড়িদের ঘোড়ার খুরের ছাপ পেলেন। তবে ছাপগুলো বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত ছিল। মনে হল মারওয়াড়িরা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে।
