ছায়াঘেরা পাথর বসানো পায়ে চলা পথসহ উঠান আর মাথার উপরের কারুকাজ করা বেলকনিতে কাউকে দেখা যাচ্ছে না। আকবর হাতির পিঠে চড়ে বেলেপাথরের দুর্গের মধ্যখানে এসে উপস্থিত হলেন। ভারী কংক্রিটের দেয়াল, শত্রুর আক্রমণ ঠেকাতে তীক্ষ্ণ খাঁজকাটা। আর হাতি যাতে ফটক ভেঙ্গে ঢুকতে না পারে, তাই ফটকের উপর তীক্ষ্ণ খুঁটা বসানো হয়েছে। আরেকটি ফটকের মধ্য দিয়ে যাওয়ার পর তিনি একটি খোলা জায়গায় এসে পৌঁছলেন, যার চারদিকে সুন্দর কয়েকটি চৌকোণা ঘর রয়েছে। এগুলো নিশ্চয়ই রাজার থাকার ঘর।
যে ঘরে যশবন্ত সিং থাকতেন, সে ঘরে এসে স্থিত হওয়ার পর আকবর শরীর মন শিথিল করার চেষ্টা করলেন। মেহরানগড় তার অধীনে এসেছে, তাসত্ত্বেও তিনি মন থেকে এই চিন্তাটা ঝেরে ফেলতে পারছিলেন না যে, কোনো না কোনোভাবে হোক মারওয়াড়িরা আবার হয়তো নতুন কোনো ফন্দি এঁটে তাকে বোকা বানাবার চেষ্টা করছে। আর আগের মতোই তিনি অন্ধ হয়ে রয়েছেন, তা দেখতে পাচ্ছেন না। দীর্ঘদিন ধরে মেহরানগড় অবরোধ করতে হবে ভেবে তিনি উদ্বিগ্ন ছিলেন। আর এখন হয়তো তাকে অবরোধ করে ফেলবে এ চিন্তায় তাকে উদ্বিগ্ন হতে হবে। কিন্তু তা হতে পারে না। কেবল পাঁচহাজার সৈন্য দুর্গে এসে ঘাঁটি গেড়েছে। বাকি সেনারা পাহাড়ের গোড়ার চারপাশে শিবির স্থাপন করেছে। জানালা দিয়ে দেখলেন বাইরে অসংখ্য চুলার আগুন অন্ধকার ভেদ করে জ্বলছে। তিনি পাহাড় ঘিরে তিনগুণ পাহারা আর খুঁটির বেড়া বসাতে নির্দেশ দিলেন। না, এবার মারওয়াড়িরা এখানে তাকে আর চমকে দিতে পারবে না।
তাহলে ওরা কি করতে চাচ্ছে? আগামীকাল আরো কয়েকজন চর পাঠাবেন; পাহাড়ের নিচে চারদিকে এলোমেলোভাবে যে মাটির ঘরগুলো রয়েছে, সেখানে হয়তো কেউ এখনও আছে, যে হয়তো কোনো খবর দিতে পারে। তারপর তার কয়েকজন বুড়ো কর্মচারীর কথা মনে পড়লো, যারা তাদের দুর্বল শরীরের কারণে দুর্গেই থেকে গিয়েছে। এদের মধ্যে কেউ হয়তো মারওয়াড়ি সেনাবাহিনী কোথায় আছে সে সম্পর্কে কোনো ধারণা দিতে পারে। দরজার কাছে গিয়ে তিনি একজন কোরচিকে ডেকে বললেন, আমি শুনেছি কয়েকজন মারওয়াড়ি চাকর এখানে আছে। ওদেরকে এখানে ডেকে আন।
তিনজন বুড়ো লোককে সাথে নিয়ে কোরচি ফিরে এল। কুঁচকানো মুখের লোকগুলোকে ভীত মনে হচ্ছিল। আকবর বললেন, ‘ভয় পেয়ো না। তোমরা কারা বল?
সবচেয়ে বুড়ো লোকটি উত্তর দিল। লোকটির পিঠ এতো কুঁজো যে, কেবল চার ফুট হবে সে লম্বায়। কচ্ছপের মতো সামনে গলা বাড়িয়ে সে হাতির দাঁতে বাঁধানো একটা লাঠির উপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়েছিল। সে বললো, আমরা যশবন্ত সিংয়ের কর্মচারী। বেশি বয়সের কারণে অক্ষম হয়ে পড়ার পর আর কাজ করতে পারি নি। তিনি আমাদেরকে দুর্গে থাকার অনুমতি দিয়েছিলেন। আমরা এখানে খাবার আর ভাতা পেয়ে থাকি।
যদি আমার প্রশ্নের সঠিক উত্তর দাও, তবে দেখবে যে আমিও একজন দয়াশীল মানুষ।
আকবরের কথা শুনে কচ্ছপের মতো গলা যে লোকটির, সে তার সঙ্গীদের দিকে তাকাল। লম্বা, হাড় জিরজিরে একটি লোক, ঢিলা করে পরা বিশাল একটি লাল পাগড়িতে তার মাথা প্রায় ঢাকা পড়েছিল। ছানি পড়া চোখে সে ঠিকমতো দেখতে পাচ্ছিল না। সে বললো, আমি এককালে আমার প্রয়াত প্রভুর পেয়াদা ছিলাম। আমি আপনার প্রশ্নের উত্তর দিতে চেষ্টা করতে পারি।’
‘আমি শুধু জানতে চাই মারওয়াড়ি সেনারা কোথায় আছে?’ প্রশ্নটি করলেও আকবর ভাবলেন তিনি খামাখা প্রশ্নটি করলেন। কিছু জানলেও বুড়ো লোকটি কেনই বা এমন কথা বলবে, যাতে তার স্বজাতির ক্ষতি হতে পারে।
তবে আকবর অবাক হলেন, যখন লোকটি দাঁতহীন মাড়ি বের করে হেসে বললো, তাহলে আপনি জানতে চান আমাদের সৈন্যরা কোথায় আছে? একটু পরই তো আপনি তাদেরকে খুঁজে পাবেন, কাজেই এখনই তা বললে ক্ষতি কী? ওরা সবাই আরাবল্লি পাহাড়ে চলে গেছে–সমস্ত সৈন্য আর তাদের পরিবার। সাথে রাজকোষের সমস্ত ধনদৌলত নিয়ে গেছে।…আপনি একটি খালি দুর্গ দখল করেছেন, তবে মারওয়াড় পান নি।’ বুড়ো লোকটি জিহ্বা দিয়ে চুকচুক আওয়াজ করলো।
আবার যখন একা হলেন, তখন গভীর চিন্তায় ডুবে গেলেন। তার বাবাও আগে থেকে একথা ভাবেন নি। রাজপুতদের গোয়ার্তুমি আর বৃথা সাহসিকতা সম্পর্কে আওরঙ্গজেব যা দাবি করতেন, তার বিপরীতে মারওয়াড়িরা একান্ত বাধ্য না হলে যুদ্ধে প্রাণ বিসর্জন দিতে মোটেই ইচ্ছুক মনে হচ্ছে না। অদৃশ্য একটি শত্রুকে তিনি কিভাবে পরাস্ত করবেন? তার বাবার সমালোচনামুখর চেহারাটা মনে পড়ে গেল…শুনতে পেলেন তার ব্যর্থতায় তাকে অপমানজনক কথা বলছেন। না, তাকে পাহাড়ে গিয়ে মারওয়াড়িদের সাথে যুদ্ধ করতে হবে।
*
মেঘ শূন্য আকাশের সূর্য ওদের উপর প্রচণ্ড তাপ ছড়াচ্ছিল আর আকবরের চোখ বেয়ে টপ টপ করে ঘাম ঝরছিল। দুই মাইল লম্বা কাফেলার একেবারে শেষ মাথায় মালবাহী উটগুলোর ফোঁস ফোঁস করে দুর্গন্ধযুক্ত নিঃশ্বাস ফেলার শব্দ ধীরে ধীরে তার কানে কমে এল। তিনি পেছনে এসে দেখছিলেন মালপত্র নিয়ে পশুগুলো ঠিকমতো তাদের পিছু পিছু আসছে কি-না। খুশি হলেন দেখে যে, কেবল গুটিকয়েক লোক পিছিয়ে পড়েছে আর কয়েকটি মাত্র উট অসুস্থ হয়ে মরুভূমিতে পড়ে রয়েছে। ওদের মাথার উপর আকাশে চক্কর দেওয়া শকুনগুলো শীঘ্রই পশুগুলোকে নিয়ে ভেজে বসবে আর হয়তো কয়েকটি মানুষও এর মধ্যে থাকবে।
