মাথা ব্যথার কথা ভুলে গিয়ে আকবর মূল সেনাদলের কাছে ফিরে গিয়ে ছোট একটি দল পাঠালেন শত্রুর অশ্বারোহী দলটিকে নিরস্ত্র করে তার কাছে নিয়ে আসতে। তারপর আবার হাতির পিঠে চড়ে প্রচণ্ড গরমে ঘামতে ঘামতে অধৈর্য হয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন। আধ ঘণ্টা পর তার লোকেরা মারওয়াড়িদেরকে নিয়ে ফিরে এল। বালিয়াড়ির উপর চড়ার পরিশ্রমে ওদের চমৎকার কালো ঘোড়াগুলোর নাক দিয়ে ফেনা বের হচ্ছিল। ওদের হাতে ছুরি, তরোয়াল, বল্লম কিছুই নেই, সব তার লোকেরা ওদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে। তারপরও বুঝা যাচ্ছে এরা যোদ্ধা। এখন ওরা বালুর উপর ছড়িয়ে দাঁড়াতেই ওদের হাঁটা, চলা, দাঁড়াবার ধরন দেখেই তা বুঝা যাচ্ছে। আকবর বললেন, “আমি আকবর, সম্রাট আওরঙ্গজেবের পুত্র। তোমরা কে আর কি উদ্দেশ্যে এখানে এসেছ?
অশ্বারোহীরা একে অন্যের দিকে তাকাল। অন্যদের চেয়ে একজনের পরনে ছিল দামি পোশাক, গলায় ভারী সোনার হার ঝুলছিল এবং কানে সোনার দুল। সে বললো, আমরা মারওয়াড়ের বিশেষ দূত। আপনি যে দাবি করেছেন তার জবাব নিয়ে আমরা এসেছি, আমরা আমাদের দুর্গসহ আত্মসমর্পণ করছি। জিনের সাথে ঝুলানো একটি রেশমি কাপড়ের থলে থেকে সে একটি ভাঁজ করা কাগজ বের করলো। তারপর আকবরের ইশারা করতেই একজন কোরচির হাতে তুলে দিল।
আকবর চিঠিটা নিয়ে মোমলাগানো সিলমোহরটি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন : একজন রাজপুত যোদ্ধাকে পিঠে নিয়ে একটি ঘোড়া পেছনের পায়ে ভর দিয়ে খাড়া হয়ে রয়েছে। তারপর সিলমাহরটি ভাঙ্গলেন। তিনি আশা করেছিলেন চিঠির ভাষা হবে, অবাধ্যতা, এমনকি অপমানজনক। তবে বার্তাটি ছিল চমৎকার ফার্সিতে লেখা সহজসরল, আপনি দুর্গ চেয়েছেন। ইচ্ছা করলে তা দখল করে নিন। এটা এখন আপনার। নিচে সই করেছে, দুর্গাদাস রাথোর, মারওয়াড়ের রাজপ্রতিভূ। মারওয়াড়িরা অভিজাতরা আসল রানি হাদির ছেলেকে রাজা করে, সে প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া পর্যন্ত দুর্গাদাসকে তার রাজপ্রতিভূ নিযুক্ত করেছে। মারওয়াড়ের হয়ে কেউ তার চেয়ে বেশি অধিকার নিয়ে কথা বলতে পারে না।
“তোমরা চিঠিতে কী লেখা আছে, তা জান?’ লোকগুলো মাথা নেড়ে সায় দিল।
‘শুধু এই বার্তা নিয়ে এসেছ? আর কোনো বার্তা নেই?
কানের সোনার দুলপরা লোকটি বললো, আর কিছুই নেই।
“ঠিক আছে। দুর্গাদাসকে বল আমি দুর্গসহ তার আত্মসমর্পণের প্রস্তাব গ্রহণ করলাম। আর আশা করি অতি শীঘ্রই মারওয়াড়ের সেনাবাহিনীও আত্মসমর্পণ করবে, যাতে সবার ভালো হবে আর আমরা এই রাজ্যে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পারি। আমার লোকেরা তোমাদেরকে সমতল ভূমি পর্যন্ত এগিয়ে নিয়ে যাবে। সেখানে গিয়ে তোমরা তোমাদের অস্ত্র ফিরে পাবে আর কোনো বাধা ছাড়াই চলে যেতে পারবে।
মারওয়াড়িরা ঘোড়ায় চড়ে চলে যেতেই তার বাবার কথাগুলো আকবরের মনে পড়লো: শত্রুর মনে নিজেকে ঢোকাও। নিঃশর্তভাবে মারওয়াড়িরা কেন তাদের প্রধান দুর্গটি ছেড়ে দিল? এর মানে কি শুরু হওয়ার আগেই যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে? এভাবে মুখের কথায় মেহরানগড় ছেড়ে দিয়ে তাকে এত সহজে বোকা বানানো যাবে না। তিনি নিজে তার অধিকাংশ লোক নিয়ে এখানে থেকে প্রচুর বরকন্দাজসহ একটি শক্তিশালী অগ্রবর্তী দল সামনে পাঠাবেন। সমতল ভূমি পার হতে গিয়ে কোনো প্রতিরোধের সামনে না পড়লে আরো সামনে এগিয়ে দুর্গে ঢুকে পুরোপুরি তল্লাসি চালাবে।
বালিয়াড়ির একটি সুবিধামত জায়গায় দাঁড়িয়ে তিনি লক্ষ করলেন ঘণ্টাখানেক পর অগ্রবর্তী দলটি পাহড়ের গোড়ায় পৌঁছেছে। তারপর আঁকাবাঁকা খাড়া পথ বেয়ে চারশো ফুট উচ্চতায় দুর্গের দিকে উঠতে শুরু করেছে। দুর্গের বুরুজ থেকে কামানের গোলার অগ্নিস্ফুলিঙ্গ কিংবা গাদা বন্দুকের শব্দ শোনার জন্য তিনি অপেক্ষা করে রইলেন, তবে একটু পরই দুর্গ-প্রাচীর হতে আগে থেকে নির্ধারিত করা দশটি জ্বলন্ত মশালের সঙ্কেত দিয়ে তার লোকেরা জানাল যে, দুর্গ দখল করা হয়েছে।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতেই স্নিগ্ধ বাতাস বইতে শুরু করলো, আকবর তখনও হাতির পিঠে বসা অবস্থায় দুর্গের দুতলা সিংহ দুয়ারের দিকে এগিয়ে চললেন। দুর্গাদাসের সিলমোহরের মতো এখানেও দরজার উপরের পাথরের চৌকাঠের উপর অশ্বারোহীসহ একটি তেজস্বী ঘোড়ার মূর্তি খোদাই করা রয়েছে। পাথরের কাজগুলো দেখে মনে হল বেশ প্রাচীন। কয়শো বছর ধরে মারওয়াড়িরা এই রাজ্য শাসন করে এসেছে? মোগলরা হিন্দুস্তানের শাসক হওয়ার অনেক আগে থেকে হবে নিশ্চয়ই…।
দ্বিতীয় আরেকটি ফটকের নিচ দিয়ে যাওয়ার পর আকবর তার বাম পাশে সাদা চুনকাম করা একটি দেয়াল দেখতে পেলেন। দেয়ালটির উপর এক সারি ছোট ছোট লাল হাতের ছাপ দেখা যাচ্ছে। এগুলো কি তিনি জানেন–এগুলো হচ্ছে বিধবা রাজমহিষীদের হাতের ছাপ। স্বামীর চিতায় সহমরণে যাওয়ার পথে ওরা এই ছাপ রেখে যান। একে বলা হয় সতি। যশবন্ত সিংয়ের মৃত্যুর পর সন্তান সম্ভব না হলে হাদি আর শিল্পারও কী একই নিয়তি হত? ছোটবেলায় তিনি একটি কাহিনী শুনেছিলেন, কিভাবে তার মতো একই নামের সম্রাট আকবর যখন শুনতে পেলেন, ফতেহপুরে একজন বিধবাকে স্বামীর চিতায় পোড়ানো হবে, তখন তিনি সাথে সাথে ঘোড়ায় ছুটিয়ে সেখানে গিয়ে মহিলাটিকে উদ্ধার করেন।
