‘তাই যদি হয়, তবে আপনি কেন আমাকে রানিদের গ্রেফতার করে আনতে পাঠালেন?’ ‘দুটি কারণে। প্রথমত, যদি আমি কোনো ব্যবস্থা না নিতাম তাহলে ওরা আমাকে দুর্বল ভাবতো। দ্বিতীয়ত, মোগলদের রক্তপাত করার জন্য আমি মারওয়াড়িদেরকে উস্কে দিতে চেয়েছিলাম। আমি মনে মনে খুশি হয়েছিলাম, যখন রানিরা আমাকে অমান্য করে মারওয়াড়ে ফিরে যেতে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এমনকি তাদের পালিয়ে যেতেও প্ররোচিত করেছিলাম তাদের শিবিরে আমার গুপ্তচর পাঠিয়ে গুজব ছড়িয়ে দিয়েছিলাম যে, দিল্লির আসার পর আমি রানিদেরকে কারাগারে বন্দী করে রাখবো আর বাচ্চাগুলোকে হত্যা করবো। আর যতটা আশা করেছিলাম এই ফন্দিটা তার চেয়ে আরো ভালো কাজে লেগে গেল। তোমার কয়েকজন সৈন্য হত্যা করে আর তোমার সাথে প্রতারণা করে মারওয়াড়িরা তাদের দেশে আমার অভিযান চালাবার যথেষ্ট কারণ তৈরি করলো। এই গর্বিত রাজপুতদের দীর্ঘদিন প্রশ্রয় দিয়েছি, পদবী আর সম্মান দিয়েছি যা ওদের প্রাপ্য নয়। এবার তাদেরকে অবনত আর বাধ্য হতে শেখাব আর তাদের রাজ্যকে আমার সাম্রাজ্যের একটি অংশ করে নেবো। আর তুমি, আমার ছেলে হবে এই বিজয়ের ঘটক। তুমি আবার মারওয়াড় ফিরে যাবে, এবার শক্তিশালী একটি মোগল সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব নিয়ে বিজয়ী হয়ে ফিরবে। আকবর কিছু বললেন না। এই প্রথম বড় একটি অভিযানে সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব পাওয়ার উল্লাসে মারওয়াড়িদের বিরুদ্ধে তার বাবার চক্রান্ত সম্পর্কে তার মনে যে সংশয় ছিল তা এখনকার মতো মুছে গেল।
০৯. ভূতের রাজ্য
গরম এত তীব্র ছিল যে, চামড়ার হাওদার ছাউনির ছায়ার নিচে থেকেও আকবরের মাথা টন টন করছিল। সেই একঘেয়ে কমলা রংয়ের মরুভূমি, সবুজ পাতা কিংবা ফুলের এতটুকু চিহ্ন নেই। তার কাছে মোটেই আকষর্ণীয় মনে হচ্ছে না। ২০,০০০ সেনার শক্তিশালী একটি বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে মারওয়াড়ে এসেছে–দুই সপ্তাহ হল। এই দুই সপ্তাহের মাঝে মোগলরা একটিও গুলি ছুঁড়েনি কিংবা একবারও তরোয়াল খাপ থেকে বের করতে হয়নি। বরং মনে হচ্ছে যেন ওরা একটি ভূতুড়ে রাজ্যে এসে পড়েছে প্রতিটি গ্রাম, প্রতিটি মাটির কেল্লা পরিত্যক্ত, প্রত্যেকটা কূপ পাথর দিয়ে ভর্তি। একমাত্র জীবিত প্রাণী বলতে কয়েকটা নেড়ি কুকুর আর কিছু ময়ূর নিচু ধূলিময় গাছের ডালে বসে পেখম ঝাঁপটে আতঙ্কিত হয়ে কর্কশ কণ্ঠে চিৎকার করছে। তবে শীঘ্রই তিনি তার সেনাবাহিনী নিয়ে মারওয়াড়ের শাসকদের শত শত বছর ধরে গর্ব বিশাল মেহরানগড় দুর্গে পৌঁছে যাবেন। মূল মারওয়াড়ি সেনাবাহিনী নিশ্চয়ই সেখানে অবস্থান নিয়ে রয়েছে। আত্মসমর্পণ করার আহ্বান জানিয়ে চারদিন আগে তিনি দূত পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু ওরা দূতকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিয়েছিল। মারওয়াড়িরা কি পরিকল্পনা করছে? দুর্গের দেয়ালের নিচে তার সাথে লড়াই করবে নাকি তাকে বাধ্য করবে দুর্গ অবরোধ করার? সম্ভবত শেষেরটাই হবে–তবে ওদেরকে উৎখাত করতে অনেক মাস ধরে অবরোধ চলবে…
ঘণ্টাখানেক পর আকবরের যুদ্ধহস্তিটির পা নরম বালুর গভীরে ডেবে যেতেই হাতিটি এমনভাবে দুলে উঠলো যে, তাকে হাওদার দুপাশের কারুকাজ করা কিনারা আঁকড়ে ধরে তাল সামলাতে হল। কয়েকটি বালিয়াড়ির চূড়ার পর দূরে মেহরানগড় দেখা গেল। ঝিকমিক করা কুয়াশার মধ্য দিয়ে ঠিক বুঝা যাচ্ছিল এর চূড়াটি কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছে আর কোথা থেকে দুর্গের খাড়া ধূসর দেয়াল শুরু হয়েছে। এমন সময় ঘোড়া ছুটিয়ে একজন মোগল চর এসে তার সামনে হাজির হল। তার ঘোড়াটি জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছিল।
লোকটি বললো, “জাঁহাপনা, ছয়জনের একটি দল ঘোড়া ছুটিয়ে মেহরানগড়ের দিক থেকে সমতল ভূমি পার হয়ে আমাদের দিকে আসছে। প্রায় বালিয়াড়ির গোড়ার কাছে পৌঁছে গেছে, তবে এখান থেকে আপনি ওদেরকে দেখতে পাবেন না। আমরা কি ওদের বাধা দেবো?”
‘আমি নিজে একবার ওদেরকে দেখতে চাই। একটা ঘোড়া নিয়ে এসো।’ কয়েকমিনিট পর তামাটে রঙয়ের একটি ঘোড়ায় চড়ে দুজন দেহরক্ষীসহ আকবর চরের পেছন পেছন বালিয়াড়ির মধ্য দিয়ে এগিয়ে চললেন। তারপর ওরা একটি পাহাড়ের আড়ালে এসে পৌঁছে দেখলেন আরো তিনজন মোগল চর সামনে উঁকি দিচ্ছে। ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে দ্রুত আকবর তাদের সাথে যোগ দিলেন। ওদের একজন বললো, “ঐ যে দেখুন জাহাপনা।
আকবর তার আঙুলের নির্দেশ বরাবর তাকালেন। হ্যাঁ, তাদের প্রায় ঠিক নিচে অশ্বারোহী দলটি বালিয়াড়িতে উঠতে শুরু করেছে। ওরা নিশ্চয়ই জানে তার সেনাবাহিনী অন্য পাশে রয়েছে…ধুলার মেঘ অবশ্য অনেক দূর থেকে দেখা যায়। ওরা কি চাচ্ছে? তিনি সতর্কদৃষ্টিতে ওদেরকে লক্ষ করলেন। লোকগুলোর গায়ের জামা বিবর্ণ কমলা রঙের, প্রায় বালুর মতো একই রং। এত কম লোকের সাথে লড়াই করা যায় না আর যেহেতু ওরা মোটেই নিজেদেরকে লুকাতে চেষ্টা করছে না, তার মানে গুপ্তচর হওয়ার সম্ভাবনাও কম। ওরা হয়তো আলাপ আলোচনা করতে এসেছে। আকবর বললেন, ‘ওরা মারওয়াড়ি, আমি নিশ্চিত। তারপর একজন চরের দিকে ঘুরে বললেন, “আমার মনে হয় ওরা কথা বলতে এসেছে। তবে নজর রাখবে আর যদি সন্দেহজনক কিছু দেখো তাহলে সাথে সাথে খবর পাঠাবে। এমনও হতে পারে আমাদের মনোযোগ অন্যদিকে সরাবার জন্য ওদেরকে পাঠান হয়েছে, যাতে মূল সেনাদল আমাদের উপর আক্রমণ করতে পারে। তবে সেরকম আমার মনে হচ্ছে না–কেননা যদি ওদের সেনাবাহিনী আমাদের কাছাকাছি হবার চেষ্টা করে, এই অবস্থান থেকে আমরা সহজেই ওদের দেখতে পাবো।
