‘চমৎকার অভিনয় করেছেন। তবে আর ভান করে লাভ নেই। আমি যতদূর জানি যশবন্ত সিং-এর একমাত্র যখম হয়েছিল তার উরুতে। আপনারা আসলে কে? মারওয়াড়ের বাজার থেকে মোটা ঘুষ নিয়ে আনা অভিনেত্রী নিশ্চয়ই?
হাদির দুই চোখ জ্বলে উঠলো। তিনি বললেন, “এটি সত্যি আমরা রানি নই। তবে আমরা মারওয়াড়ের উচ্চ অভিজাত ঘরের মহিলা। আমরা যথোপযুক্ত সম্মান পাওয়ার যোগ্য।
‘যদি সেরকম ব্যবহার আমার কাছ থেকে আশা করেন, তবে সবকিছু বলুন। আর যদি আমার কথা অমান্য করেন তবে পরিণতি খুবই খারাপ হবে।
‘আমরা দুই রানির সহচরী এবং তাদেরকে আমরা ভালোবাসি। যখন আমাদের চরেরা খবর আনলো যে, আপনার ছেলে সৈন্য নিয়ে দ্রুত আমাদের অনুসরণ করছেন আর কয়েকদিনের মধ্যেই পৌঁছে যাবেন, তখন আমরা আসল রানিদের বদলে নিজেরা রানি সাজতে রাজি হলাম। যখন আমরা তাঁবু খাটিয়ে অপেক্ষা করছিলাম কখন আপনার সৈন্যরা এসে আমাদের ধরে ফেলবে, তখন বাচ্চাসহ আসল রানিরা আমাদের বেশিরভাগ সৈন্য নিয়ে মারওয়াড়ি পার্বত্য এলাকার গভীরে ঘোড়া ছুটিয়ে আপনাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গিয়েছিলেন। আমরা সম্মান নিয়ে আমাদের দায়িত্ব পালন করেছি। এখন ইচ্ছা করলে আমাদেরকে মেরে ফেলতে পারেন, তবে বাচ্চাগুলোকে দয়া করে রেহাই দিন। ওরা আমাদের সন্তান আর এত ছোট যে, এই প্রতরাণার ঘটনায় তাদের ভূমিকা নিয়ে আপনি তাদেরকে দোষী করতে পারেন না।
হাদির কথা বলা শেষ হলে আকবর তার বাবার দিকে তাকালেন। বেশিরভাগ যেরকম হয়, তিনি তার বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে আন্দাজ করতে পারলেন না তার মনে কি ভাবনা চলছে। শেষপর্যন্ত আওরঙ্গজেব বললেন, ঠিক আছে। আমি আপনার কথা বিশ্বাস করলাম। জেবুন্নিসা, এই মহিলাদেরকে তাদের কামরায় আটকে রাখ, আর যে পর্যন্ত আমি এদের ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত না নেই ততদিন এদেরকে কড়া পাহারা দিয়ে রাখবে। আকবর তুমি এসো আমার সাথে।
বাবাকে অনুসরণ করে তাঁর মহলের দিকে চলতে চলতে আকবরের আবার মন খারাপ হয়ে গেল। এই মহিলারা তাকে কিরকম বোকা বানিয়েছেন। যদি তিনি সেখানে তাদেরকে প্রশ্ন করতেন, তাহলে হয়তো সত্যিটা আবিষ্কার হত আর তিনি আসল রানি আর তাদের বাচ্চাদের ধরতে পারতেন। বাবার সাথে একা হওয়ার পর তিনি অপেক্ষা করছিলেন, কখন তার সমালোচনা করবেন, তবে অবাক হলেন যখন দেখলেন চিন্তামগ্ন হলেও তাকে দেখে মনে হল না যে রেগেছেন। দুটি পেয়ালায় আনারের রস ঢেলে একটি আকবরের হাতে দিয়ে তাকে বসতে ইশারা করলেন।
তারপর এমন কোমল কণ্ঠে কথা বললেন যে, আকবর বেশ অবাক হলেন, ‘আশা করি এটা তোমার জন্য একটা শিক্ষা হয়ে থাকবে। যদিও তুমি ভেবেছিলে যে, তুমি তোমার দায়িত্ব পালন করেছ, কিন্তু আসলে তা করো নি। কেন? কারণ তুমি তোমার শত্রুর মনের ভেতরে ঢুকতে পারোনি, এটাই হল যুদ্ধের প্রথম নিয়ম। বরং তুমি বোকার মতো বিশ্বাস করছে, যা বিশ্বাস করতে চেয়েছে, যা দেখতে চেয়েছো তাই দেখেছে। আর তাই মারওয়াড়িরা বেশ সহজে তোমার সাথে চালাকি করেছে, যেরকম একজন সেবিকা একজন শিশুর সাথে করে। এক হাতে একটি মিঠাই লুকিয়ে রাখার ভান করে, অথচ ওটা আসলে সব সময় অন্য হাতেই ছিল। তুমি একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষ। এখন তোমার গভীরভাবে চিন্তা করা শেখার সময় হয়েছে…।
আকবর মনোযোগ দিয়ে তার বাবার উপদেশবাণী শুনে চললেন–একই বয়সে তিনি নিজে কিরকম তার ছেলের বিপরীত আচরণ করতেন, তাঁর নিজের বিচক্ষণতা আর দূরদর্শিতার একের পর এক উদাহরণ দিয়ে তাকে একটি বার্তা দিলেন। ধীরে ধীরে আকবরের মন থেকে তিক্ততা দূর হয়ে স্বস্তি ফিরে এল। তার বাবা ঠিকই বলেছেন–তার আরো সাধারণ জ্ঞান খাটান উচিত ছিল। কিন্তু আওরঙ্গজেবের এভাবে তার সাথে কথা বলার প্রয়োজন ছিল না, যেন তিনি একজন তরুণ কোরচি যে কখনও যুদ্ধ করেনি। সেই সাথে তিনি বুঝতে শুরু করলেন, নারী আর শিশুদের পিছু নেওয়ার অভিযানটি কিরকম তিক্ত মনে হল, যখন নকল রানি হাদি আরো রক্তপাত এড়াতে তার কাছে আত্মসমর্পণ করলেন তখন তিনি কি খুশি হয়েছিলেন। সম্ভবত তিনি আশ্বস্ত হওয়ার কারণে চালাকির সম্ভাবনাটি তার চোখে পড়েনি।
..আমার জায়গায় হলে এখন তুমি কি করতে আকবর?
‘সেনাবাহিনী পাঠিয়ে আসল রানিদেরকে ধরে দিল্লি নিয়ে আসতাম।
‘এটা একটা সহজ উত্তর। তুমি একবারও বিষয়টা নিয়ে ভাবার চেষ্টা করোনি কিংবা আমি এতক্ষণ কি বলেছি তাও ঠিকমতো শোননি। আমি তোমাকে বলেছি সব সময় জানার চেষ্টা করবে অন্যেরা কি ভাবছে আর এটা নিজের পরিবারে যেমন ঘটে তেমনি শত্রুর বেলায়ও একইভাবে খাটে। আমাকে যতটুকু তুমি জেনেছ, তারপর তোমার নিজেকে প্রশ্ন করা উচিত আমি কি আদৌ এ ধরনের সোজা কাজ করতে পারি কি-না। আর তোমার ভেবে দেখা উচিত ছিল আর কোনো উপায় আছে কি-না আর এও দেখতে হবে কোনটা তোমার কাছে সবচেয়ে ভালো মনে হতে পারে।
কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে আকবর বললেন, কিন্তু কেন রানিদের পিছু নেবেন না?
‘বিষয়টা নিয়ে একবার ভেবে দ্যাখো! আর বেশি দিন নয়, দুই রানির মধ্যে ঝগড়া লেগে যাবে আর তারা যার যার নিজ সন্তানকে সিংহাসনে বসাবার চেষ্টা করতে গিয়ে দুই পক্ষ লড়াই করে মারওয়াড়কে দুই ভাগে বিভক্ত করে ফেলবে। এসব করে ওরা মারওয়াড়কে আরো দুর্বল করে ফেলবে আর আমাদেরকে প্রতিহত করার ক্ষমতা ধ্বংস করে ফেলবে।
