হ্যাঁ, তারা আসলেই ভালো যোদ্ধা। তবে অনেক সময় ব্যর্থ গৌরবের কাজকে ভালো কৌশল হিসেবে মনে করে ভুল করে। তবে তা নিয়ে আমার কোনো মাথা ব্যথা নেই।’
আকবর সম্রাটের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো, তবে কোন বিষয়টি নিয়ে আপনি উদ্বিগ্ন বাবা? তার পেটে একটু অস্বস্তিকর অনুভূতি হল। তবে তার প্রশ্নটি এড়িয়ে আওরঙ্গজেব তাকে একটি প্রশ্ন করতেই তার অস্বস্তি আরো বেড়ে গেল।
তুমি বলেছ সীমান্তের প্রায় কাছাকাছি পৌঁছার পর মারওয়াড়িরা সেখানেই থেমে পড়ে। এ খবরটি তুমি কি ভাবে জানতে পেরেছিল?
‘আমার অগ্রবর্তী দলের সদস্যদের কাছ থেকে খবরটি জেনেছি। ওদের একজন আমার কাছে এসে খবর দিল যে ওরা মারওয়াড়িদের খুঁজে পেয়েছে আর বাদবাকিরা আড়ালে লুকিয়ে ওদের প্রতি নজর রাখছে। মূল সেনাদল নিয়ে আমি যখন ওখানে পৌঁছলাম, তার আগে ওরা তিনদিন ধরে মারওয়াড়িদের উপর নজর রাখছিল।’
তারপরও ব্যাপারটি তোমার কাছে একটু অস্বাভাবিক মনে হয় নি? কেন মারওয়াড়িরা অতি দ্রুত ওদের দুর্গে চলে গেল না? ওরা তো জানতোই যে আমি ওদের পেছনে সেনা পাঠাব। তাহলে কেন এমন জায়গায় রয়ে গেল, যেখানে ওরা অরক্ষিত হয়েছিল?
হয়তো কোনো একজন রানি কিংবা বাচ্চাগুলোর মধ্যে কোনো একজন অসুস্থ হয়ে পড়েছিল আর তাদের বিশ্রাম নেবার প্রয়োজন ছিল। মরুভূমিতে প্রচণ্ড গরম ছিল আর …’।
আওরঙ্গজেব তাকে বাধা দিয়ে বললেন, মহিলারা এখন কোথায় রয়েছে?
‘হেরেমে জেবুন্নিসার তত্ত্বাবধানে রয়েছে।
“ঠিক আছে, আমি একবার ওদের সাথে দেখা করতে যাব। এমনি সৌজন্যমূলক সাক্ষাৎ। তুমিও সাথে আসতে পার। আওরঙ্গজেব উঠে দ্রুত কামরা থেকে বের হয়ে গেলেন। আকবর প্রথমে একটু ইতস্তত করলেন, তারপর তিনিও তাঁর বাবাকে অনুসরণ করলেন। তিনি জেবুন্নিসার মহলে পৌঁছে শুনলেন আওরঙ্গজেব তার বোনকে বলছেন, ‘ঐ মহিলাদের এখানে আসতে বল। আমি এখুনি তাদের সাথে দেখা করতে চাই।’
‘তারা মনে হয় বেশ ক্লান্ত…এখনও নিজেদেরকে ঠিকমতো ঘরে গুছিয়ে উঠতে পারে নি…’
আওরঙ্গজেব একটু কড়া কণ্ঠে বললেন, যাই হোক। আমি যা বলছি তা কর জেবুন্নিসা।
‘ঠিক আছে আপনি যা বলেন। আমি নিজে গিয়ে ওদেরকে নিয়ে আসছি।
কিছুক্ষণের মধ্যে জেবুন্নিসা দুই রানিকে নিয়ে ফিরে এলেন। এখন দুজনেই মারওয়াড়ের জাতীয় রং উজ্জ্বল হলুদ শাড়ি পরে রয়েছেন–আর দুজনেরই মাথা সোনালি রেশমি কাপড়ের ঘোমটায় কয়েক ভাঁজে ঢাকা রয়েছে।
কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই আওরঙ্গজেব বললেন, আপনারা দুজনের ঘোমটা খুলে মুখ দেখান।
আকবর হতাশার অনুভূতি নিয়ে কথা শুনছিলেন। এরা রাজ পরিবারের মহিলা। তিনি কথা দিয়েছিলেন এদের যথাযথ মর্যাদা রক্ষা করা হবে। এখন কোথায় গেল সেই প্রতিশ্রুতি?
মহিলা দুজন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। আওরঙ্গজেব শীতল কণ্ঠে বললেন, ‘আমি সম্রাট। আমি আপনাদেরকে আদেশ করছি মুখ দেখাতে আর নয়তো অন্য কাউকে দিয়ে করাবো।’
রানি শিল্পা প্রথমে সম্রাটের আদেশ পালন করলেন। মেহেদি লাগান হাত দিয়ে ঘোমটা ঠেলে মুখ থেকে সরিয়ে দিলেন, তবে মেঝের দিকে তাকিয়ে রইলেন। আওরঙ্গজেব আদেশ করলেন, “আমার দিকে তাকান। ধীরে ধীরে তিনি মুখ তুললেন। আকবরের মনে হল, তার বয়স প্রায় ত্রিশ, দেখতে বেশ সুন্দরী। গোলাকার মুখ আর ভারী ঠোঁট।
এরপর আওরঙ্গজেব রানি হাদির দিকে ফিরে বললেন, এবার আপনি। মাথা থেকে ঘোমটা সরিয়ে আওরঙ্গজেবের আদেশের জন্য অপেক্ষা না করে তিনি সরাসরি তাঁর দিকে তাকালেন। আকবর কল্পনা করেছিলেন–ডিম্বাকৃতি মুখ আর বড় বড় উজ্জ্বল চোখ নিয়ে তিনি খুবই সুন্দরী। ঠাণ্ডা চোখে আওরঙ্গজেব যেভাবে তাদেরকে নিরীক্ষণ করছিলেন, তাতে মনে হল শিল্পার মতো তিনি তেমন ঘাবড়াননি।
‘আপনাদের মধ্যে বড় রানি কে?
হাদি সাথে সাথে উত্তর দিলেন, ‘আমি।’
‘আপনাকে দেখে বেশ কমবয়সী মনে হচ্ছে। যশবন্ত সিং-এর সাথে বিয়ের কত বছর হল?
‘চার বছর।
কিছুকাল আগে আমার সাম্রাজ্যের হয়ে যুদ্ধ করার সময় তার শরীরে বড় ধরনের একটি যখম হয়েছিল। সেটা শরীরের কোন জায়গায় হয়েছিল বলতে পারেন?
এই প্রথম হাদিকে দেখে একটু অনিশ্চিত মনে হল।
যশবন্ত সিং-এর সন্তান গর্ভে ধারণ করেছেন, কাজেই যথেষ্ট অন্তরঙ্গ নিশ্চয়ই ছিলেন। সেক্ষেত্রে আপনার এটা জানার কথা, তাই না? আমি আবার বলছি, যখমটা কোথায় হয়েছিল?
এক মুহূর্ত পর হাদি বললেন, এটা…এটা বুকে হয়েছিল।’
আওরঙ্গজেব এবার শিল্পার দিকে ফিরে বললেন, আপনার কি মনে হয়? ইনি কি ঠিক বলেছেন?
ঢোক গিলতে গিলতে শিল্পা হাদির দিকে তাকিয়ে তারপর বললেন, ‘হা…হ্যাঁ …বুকে হয়েছিল। হাদি তখনও এক দৃষ্টিতে সামনের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। তার চেহারা শান্ত হলেও আকবর দেখলেন তিনি দ্রুত নিশ্বাস-প্রশ্বাস নিচ্ছেন। আওরঙ্গজেব সামনে হাদির দিকে এগিয়ে সরাসরি তার দিকে তাকালেন। হাদি পিছু হটলেন না, বরং গর্বিতভাবে আওরঙ্গজেবের চোখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। এরপর আওরঙ্গজেব শিল্পার কাছে গিয়ে তাকেও একইভাবে নিরীক্ষণ করলেন।
পরিশেষে সম্রাট বললেন, আপনারা আমার ছেলেকে বোকা বানাতে পারলেও এক মুহূর্তের জন্যও আমাকে বিশ্বাস করাতে পারেন নি।
‘এ আপনি কি বলছেন? আমরা মারওয়াড়ের রানি। আপনার ছেলে আমাদের কথা দিয়েছিলেন যে, আমাদের সাথে ভালো ব্যবহার করা হবে। অথচ আপনি আমাদের মুখ ঢেকে রাখার অধিকার লঙ্ঘন করেছেন। আর এখন আরো অপমান করছেন।
