আকবর নরম স্বরে বললেন, ‘অনুগ্রহ করে আপনারা তাঁবুতে গিয়ে আরাম করুন। ততক্ষণে আমি আপনাদের সন্তান আর অন্যান্য মহিলাসহ আপনাদের দিল্লি নিয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট সংখ্যায় উটের ব্যবস্থা করছি। রানিরা তাঁবুতে ফিরে যাওয়ার সাথে সাথেই আকবর মারওয়াড়িদেরকে নিরস্ত্র করার জন্য তার লোকদের নির্দেশ দিলেন। আর তাঁবুগুলোর ভেতরে আর কেউ লুকিয়ে রয়েছে কি-না তা দেখার জন্য সেখানেও তল্লাশি চালাতে বললেন। তার সৈন্যরা আহত মোগল সেনাদের যত্ন নিতে শুরু করতেই তিনি মারওয়াড়িদেরকেও তাদের আহত সহযোদ্ধাদের সেবা আর মৃতদের দাহ করার সুযোগ দিলেন।
চিতার আগুন নিভু নিভু হয়ে এসেছে আর সূর্যও পশ্চিমে ডুবতে শুরু করেছে। আকবরও যাত্রা শুরু করার জন্য তৈরি হয়েছেন। নারী আর শিশুদেরকে উটের পিঠের দুইপাশে ঝুলানো বড় বড় ঝুড়িতে বসান হল। আকবরের লোকেরা কাছের গ্রাম থেকে এগুলো কিনে এনেছিল। বাদবাকি নিরস্ত্র মারওয়াড়ি সৈন্যরা নিজেদের ঘোড়ার পিঠে চললো। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের জখমে বড় ধরনের পট্টি লাগান ছিল। মোগল অশ্বারোহী সেনারা পুরো দলটিকে ঘিরে চললো। কোনো মারওয়াড়ি সৈন্য রানিদের উদ্ধার করার জন্য কোনো ধরনের চেষ্টা করলে তা প্রতিহত করার জন্য ওরা সতর্ক রইল। আকবর বেশ সন্তুষ্ট হয়েছেন। একজন সম্মানীয় মানুষ যে ধরনের কাজ করা উচিত তিনি শুধু তাই করেন নি, তার বাবাও খুশি হবেন দেখে যে, তিনি পলাতকদের পাকড়াও করে দিল্লিতে নিয়ে এসেছেন।
*
তিন সপ্তাহ পর অস্পষ্ট দিগন্তে দিল্লির দেয়াল আর মিনারের চূড়ার আকৃতি দেখা গেল। সফরটি ক্লান্তিকরভাবে ধীর হলেও, উটগুলোর ধীর গতির জন্য ধন্যবাদ দিতে হয়, কেননা এতে মেয়েদের কষ্ট হয়নি। বিষয়টির নিষ্পত্তি করার শুরু থেকেই আকবরের মন প্রফুল্ল ছিল, এখনও তাই রয়েছে। মারওয়াড়ি কোনো যোদ্ধাদল তাদের পিছু নেয়নি। শুধু একবার একটি বিপজ্জনক মুহূর্ত এসেছিল, এক সন্ধ্যায় যখন টহলদাররা টহল দিচ্ছিল, তখন একটি বাঘ চমকে গিয়ে একটি জঙ্গল থেকে বের হয়ে শিবিরে ঢুকে পড়েছিল। আকবর তাবুর চাদোয়ার নিচে বসে মশালের আলোয় কিছু একটা পড়ছিলেন, বাঘটি তার কাছ দিয়ে আবার অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার সময় তিনি বাঘের ডোরাকাটা তামাটে দেহটি আর লণ্ঠনের মতো জ্বলজ্বলে চোখ দুটো কেবল এক ঝলক দেখতে পেলেন।
অবশেষে অশ্বারোহী দল আর ভারী ওজন বয়ে নিয়ে আসা উটগুলো ধুঁকতে ধুঁকতে লাহোর ফটকের নিচ দিয়ে দুর্গে ঢুকতেই আকবরের মন খুশিতে ভরে উঠলো। যদিও তিনি আগেই তার সফলতার খবর দিয়ে সংবাদবাহক পাঠিয়েছিলেন, তারপরও নিজে বাবাকে পুরো বিষয়টি বলার জন্য তার মনে বেশ আগ্রহ ছিল। তাকে ছাড়াও সম্রাট তাঁর সকল ছেলেকে প্রায়ই তাদের কাজের সমালোচনা করতেন। এবার আওরঙ্গজেবও তাকে প্রশংসা না করে । পারবেন না। ভেতরের একটি উঠানে পৌঁছার পর আকবর পুরো দলটিকে থামতে বলে ঘোড়ার পিঠ থেকে লাফিয়ে নেমে লাগাম একজন সহিসের দিকে ছুঁড়ে মারলেন। তারপর একজন কোরচিকে ডেকে বললেন, ‘হেরেম থেকে প্রহরীদের ডেকে এনে এই উটগুলোকে মেয়েমহলে নিয়ে যেতে বল, যাতে মহিলারা লোকের নজরের আড়ালে উট থেকে নামতে পারেন। তারপর তাদেরকে সোজা হেরেমে আমার বোন জেবুন্নিসার কাছে নিয়ে যেতে বল। আমি আগেই তাকে চিঠিতে লিখে জানিয়েছি এদের থাকার জন্য উপযুক্ত কামরার ব্যবস্থা করতে। আর তাদেরকে খুবই সম্মানসহকারে দেখাশুনা করবে। এই মহিলারা মারওয়াড়ের রানি।
রানিদের আরাম-আয়েসের সব ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পর সন্তুষ্ট হয়ে আকবর হাত-মুখ ধুয়ে আর এক গ্লাস পানি খেয়ে বাবার মহলের দিকে রওয়ানা দিলেন। সম্রাট তখন নিচু একটি ডেক্সের সামনে বসে কিছু পড়ছিলেন, কোরচি আকবরের উপস্থিতির খবর দিতেই তিনি মুখ তুলে বললেন, ‘তাহলে তোমার অভিযান সফল হয়েছে?
‘হ্যাঁ, বাবা। যদিও মারওয়াড়িদের কাবু করতে আমি যা আশা করেছিলাম তার চেয়ে বেশি সময় লেগেছিল। তবে আমার ভাগ্য ভালো বলতে হবে যে, তাদের সীমন্তের প্রায় কাছে পৌঁছে ওরা সেখানেই থেমে তাঁবু খাটিয়ে কয়েকদিন অবস্থান করেছিল।
‘হ্যাঁ, চিঠিতে সেকথা তুমি জানিয়েছ। তবে বিষয়টি একটু অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে। এখন আমাকে সবকিছু খুলে বল, বিশেষত ঐ শিবিরটি সম্পর্কে সেখানে কতজন মারওয়াড়ি সৈন্য ছিল, অস্ত্র কি ছিল, ওদেরকে কাবু করতে কত সময় লেগেছিল। কোনোকিছু বাদ দিও না। তুমি তো জান খুঁটিনাটি বিষয়কে আমি খুবই মূল্য দেই।
যতদূর মনে পড়লো, আকবর সবকিছু খুলে বললো, তারপর তার বাবার অভিনন্দনের জন্য অপেক্ষা করে রইল। কিন্তু আওরঙ্গজেব গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে রইলেন, তার ভ কুঁচকে রয়েছে। অবশেষে বললেন, কতজন রাজপুত সেনা তুমি বললে শিবিরের প্রতিরক্ষায় ছিল?
‘প্রায় সত্তর জন। এর বেশি নয়।’
‘এই বিষয়টি তোমার কাছে অদ্ভুত মনে হয় নি যে, মারওয়াড়িরা তাদের রানি আর সিংহাসনের ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকারের প্রতিরক্ষার জন্য এত কম সেনা কেন রেখেছিল?
না। সংখ্যায় কম হলেও মারওয়াড়িরা দৈত্যের মতো লড়াই করেছিল…আমার ত্রিশজন লোক নিহত হয়েছিল। আমি সব সময় ভাবতাম একজন রাজপুত অন্য যেকোনো পাঁচজন সৈন্যের সমান।
