তার চারপাশে তিনি ইস্পাতের সাথে ইস্পাতের ঠোকাঠুকির আওয়াজ শুনতে পেলেন। প্রচণ্ড লড়াই চলছে। চোখের এক কোণ দিয়ে আকবর লক্ষ করলেন একজন মারওয়াড়ি বরকন্দাজ তার গাদা বন্দুকের লম্বা ইস্পাতের নলটি একটি গাড়ির পাশে রেখে একজন মোগল কোরচির দিকে ধীরে সুস্থে তাক করছে। বেচারি মোগল সেনাটি ঘোড়া থেকে পড়ে গিয়ে হতবুদ্ধি হয়ে টলমলভাবে হাঁটছিল। ঘোড়া ছুটিয়ে সামনে এগিয়ে আকবর ছেলেটিকে এক ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দিতেই ছেলেটির জীবন রক্ষা হল। তবে একই সাথে বন্দুকধারী গুলি ছুঁড়তেই গুলিটা আকবরের গাল ঘেঁসে উড়ে গেল। জোরে একবার নিশ্বাস নিয়ে আকবর ঘুরে তাকালেন। মারওয়াড়িরা পিছু হটতে শুরু করেছে। বেশির ভাগই শিবিরের মাঝখানে পাহাড়ের চূড়ায় সাদা দুটো তাঁবুর দিকে যাচ্ছিল। এই তাঁবুগুলো অন্যান্য তাঁবুর তুলনায় বেশ বড়। রানিরা নিশ্চয়ই এই তবুগুলোর মধ্যে রয়েছেন….
আকবর আবার ঘোড়া ছুটিয়ে তার লোকদের সাথে তাঁবু দুটোর দিকে ছুটলেন। প্রায় ছয়ফুট দূরে মাটিতে স্তূপকরা কতগুলো ঘোড়ার পিঠে ঝুলানো থলের পেছন থেকে খাটো, মোটা এবং বলশালী একজন মারওয়াড়ি লাফ দিয়ে বের হয়ে এল। লোকটি তার ডান হাত পেছন দিকে নিতেই আকবর একটি ছুরির ধাতব ফলার ঝলকানি লক্ষ করলেন। তবে মারওয়াড়ি লোকটি ছুরিটি ছুঁড়ে মারার আগেই একজন দেহরক্ষীর তরোয়ালের আঘাতে লোকটির চিবুক কেটে ফাঁক হয়ে দাঁত বের হয়ে গেল। সারা মুখ লাল টকটকে রক্তে ভরে গিয়ে লোকটি পেছন দিকে পড়ে গেল। আকবর স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন। এই হচ্ছে যুদ্ধের সৌভাগ্য–তাঁর পেছন ফেরারও অবকাশ ছিল না।
এবার প্রায় ত্রিশ-চল্লিশজন মারওয়াড়ি সেনা মোগলদের দিকে অস্ত্র তাক করে তবু দুটো ঘিরে গোল হয়ে অবস্থান নিল। সম্ভবত এরাই কেবল বাকি ছিল। অবশ্য ওদের আর কোনো সুযোগ নেই, সকলেই মারা পড়বে…যদি ওরা যুক্তির কথায় কান না দেয়। আকবর আর হতাহতের সংখ্যা বাড়াতে চাইছিলেন না, তিনি নিজেই গত কয়েক মিনিটে অন্তত তিনবার বেঁচে এসেছেন।
তিনি তার লোকদের ডেকে বললেন, “থামো!’ ঘোড়া থেকে নেমে কয়েক পা এগিয়ে গেলেন। তবে যদি কেউ আক্রমণ করে, সাথে সাথে একদিকে লাফ দিয়ে সরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে মারওয়াড়িদের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বললেন, “কেন তোমরা নিজেদের প্রাণ বিসর্জন দেবে? তোমরা যথেষ্ট সম্মান নিয়ে লড়েছ, তবে দেখতে পাচ্ছ তোমরা সংখ্যায় কত কম। আমি কথা দিচ্ছি। রানিদের কোনো সম্মান হানি হবে না। তাদেরকে আমাদের হতে তুলে দাও, আমি নিশ্চয়তা দিচ্ছি তাদেরকে দিল্লির রাজদরবারে নিয়ে যাওয়া হবে আর সেখানে এরা মারওয়াড়ের রাজপরিবারের উপযুক্ত যথাযথ মর্যাদা পাবেন।
তার কথায় সবাই চুপ হল। মনে হচ্ছে রাজপুতরা অস্ত্রগুলো আরো শক্ত করে ধরলো।
আকবর আবার চেষ্টা করলেন, “আমার কথা শোন। শত শত বছর ধরে মোগল আর রাজপুতরা কি পাশাপাশি লড়াই করে নি? আমরা কি ভাই ভাই নই? তোমাদের রক্ত কি আমার নিজের পরিবারে বইছে না? তবে যদি আর প্রতিরোধ করার চেষ্টা কর, তাহলে তোমাদেরকে ধ্বংস করা ছাড়া আমার হাতে আর কোনো পথ খোলা থাকবে না।’
ঠিক সেই মুহূর্তে একটি তাঁবুর ঝাঁপ খুলে গেল আর একজন মহিলা কমলা রং এর কাপড়ে জড়ানো ছোট একটি শিশুকে কোলে নিয়ে বের হয়ে এলেন। এমব্রয়ডারি করা তার জাফরানি রঙয়ের শাড়ির আঁচলের ঘোমটা তার মুখ ঢেকে এত নিচে নামানো ছিল যে, আকবর তার চেহারা দেখতে পেলেন না, তবে তিনি তার সরু হাতে ভারী সোনার চুড়ি আর বালা দেখতে পেলেন।
দয়া করে…এই লড়াই এখানেই শেষ হোক। অনেক মৃত্যু হয়েছে, আমি চাই না আর কোনো স্ত্রী আর তাদের প্রিয়জনকে হারিয়ে শোক করুক, যেরকম আমি আমার স্বামী যশবন্ত সিংকে হারিয়ে শোক করছি। রানিদের বাঁচাতে এই বীর সৈনিকরা তাদের জীবন বিসর্জন দিতে চাইছে, কিন্তু আমি তা হতে দিতে চাই না। আমি আপনার কাছে আত্মসমর্পণ করছি। আপনি যে কথা দিয়েছেন তাতে আমি বিশ্বাস রাখবো। আমি আর আমার পুত্র অজিত সিং আপনার কাছে আত্মসমপর্ণ করছি আর আমার সৈন্যদেরকে বলছি হাতিয়ার নামিয়ে রাখতে। রাজপুত সৈন্যরা একে অন্যের দিকে দৃষ্টি বিনিময় করলো আর একজন বলে উঠলো, কেমন করে আমরা আমাদের ধর্মবিশ্বাস আর ঐতিহ্যের শত্রুর কাছে আত্মসমর্পণ করবো?
মহিলাটি আবার বলে উঠলেন, ‘আমি হাদি, আমার প্রয়াত স্বামীর জ্যেষ্ঠ রানি। আমি যা আদেশ করছি তা তোমরা পালন করবে। কমবয়সী হলেও তার কণ্ঠস্বর দৃঢ় এবং কর্তৃত্বব্যঞ্জক ছিল। আকবর ভাবলেন, এরা সত্যি একটি যোদ্ধা জাতি, কি নারী কি পুরুষ। তাকিয়ে দেখলেন বাচ্চাটি জেগে উঠে কেঁদে উঠতেই সোজা হয়ে দাঁড়ান হালকা-পাতলা গড়নের মহিলাটি বাচ্চাটিকে শান্ত করার চেষ্টা করছেন।
ভদ্রে, আমি যে কথা দিয়েছি তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি।’
অন্য সাদা তবুটির ঝাঁপ উঠিয়ে বেগুনি রঙের শাড়ি পরা দ্বিতীয় আরেকজন মহিলা ঘোমটায় মুখ ঢেকে বের হয়ে এলেন। তিনিও হাদির মতো ভারী ভারী গহনা পরে রয়েছেন। আমি আমার বোনের কথা আর আপনার উত্তরও শুনেছি। আর আমিও তার মতো আপনার কাছে আত্মসমর্পণ করতে এসেছি। আমি রানি শিল্পা, আমার বাচ্চা তাঁবুর ভেতরে সেবিকার কাছে রয়েছে। তার কণ্ঠস্বর শুনে রানি হাদির চেয়ে একটু বয়স্ক মনে হল। একটু বেঁটে হলেও তার আচরণ একজন রানির মতোই।
