শিবাজি সিংহাসনে বসতেই গগা ভট্ট তার মাথার উপর একটি লাল ছাতা মেলে ধরে চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘জয় হোক মহারাজার!’ এবার শিবাজিকে একজন রাজা হিসেবে প্রথম কথা বলতে হবে।
তিনি হাত তুলে সবাইকে চুপ হতে ইশারা করলেন। তারপর বললেন, ‘ভাইসব, আমি এখানে রায়গড়ে আপনাদের সামনে আপনাদের রাজা হিসেবে এসেছি। এটি একটি পবিত্র ভূমিকা। আমার নিজ মারাঠি ভাইয়েরা ছাড়াও সমস্ত হিন্দু
১০৭
ভাইদের রক্ষা করার পবিত্র দায়িত্ব এটি আমার উপর তুলে দিয়েছে। তবে কেমন করে আমি দায়িত্ব পালন করবো, যখন একটি ভিনদেশি হানাদার আমাদের দেশ, আমদের জীবন আর আমাদের আত্মার উপর তাদের ছায়া ফেলেছে? মোগল স্বৈরশাসক আমাদের ইচ্ছামত নিজ ধর্ম পালনে আমাদেরকে নিষেধ করেছে। তার কাছে আমরা মারাঠিরা হলাম পরজীবী কীট। তিনি আমাদেরকে ইঁদুর বলেন–তবে আমরা তাকে দেখিয়ে দেবো যে, আমরা হলাম সিংহ। আমি উপস্থিত সবার সামনে–আর অন্যান্য যারা এই অত্যাচারী শাসকের নিপীড়নে ভুক্তভোগী তাদের সবার সামনে প্রতিজ্ঞা করছি যে, এই মোগলদেরকে বিতাড়িত করবো। ইতোমধ্যে আমি কি প্রমাণ করিনি যে, বুদ্ধিতে আমি তাদেরকে হারাতে পারি? তিনি আমাকে তার ক্ষমতার আওতার মধ্যে নিয়েছিলেন, কিন্তু আমি এই দেশের মাটির মিহি বালুর মতো তার আঙুলের ফাঁক গলে বের হয়ে এসেছি, যে দেশে তার কোনো অধিকার নেই। আপনাদের সহায়তায় আমি বিজয়ী হবো আর হিন্দুস্তানে শান্তি আর ন্যায়বিচার ফিরিয়ে আনবো!’ তারপর শিবাজি উঠে দাঁড়ালেন, তার অস্ত্রগুলো হাতে নিয়ে দাঁড়ানো অপেক্ষমাণ সেবককে ইশারা করলেন কাছে আসতে। তারপর তার তরবারি হাতে নিয়ে মাথার উপর দিয়ে ঘুরিয়ে চিৎকার করে উঠলেন, ধ্বংস হোক মোগল সাম্রাজ্য!’ সাথে সাথে চারপাশে সবাই তার প্রতিধ্বনি করে উঠলো, ধ্বংস হোক মোগল সাম্রাজ্য!’
হঠাৎ শিবাজি পটকা ফাটার মতো কড় কড় আর কামানের ভারী গোলার মতো গুম গুম শব্দ শুনতে পেলেন–কি ব্যাপার কামানের গোলার শব্দ নয়তো? প্রজাদের মাথার উপর দিয়ে দরবারের খোলা দরজা দিয়ে বাইরে উঠানের বাইরে দেখতে পেলেন বৃষ্টি পড়া শুরু হয়েছে। শব্দটি ছিল বজ্রপাতের। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত বর্ষা, আশীর্বাদস্বরূপ সেই বৃষ্টি এসেছে, যা হিন্দুস্তানের মাটি আর মানুষকে পরিপুষ্ট করে–এতদিন পর আজ এল। এটা দেবতাদের কাছ থেকে আসা একটি সংকেত, যে তিনি, শিবাজি, মোগলদেরকে ধুয়ে-মুছে সাফ করে দেবেন–যেন এর কোনো অস্তিত্বই কোনোকালে ছিল না।
০৮. রানিগণ
মারওয়াড়িদের গাদা বন্দুকের গুলি এড়াতে আকবর ঘোড়ার ঘাড়ের দিকে সামনে ঝুঁকলেন। তিনি দেখতে পাচ্ছিলেন লাল পাগড়িপরা মারওয়াড়ি সৈন্যরা তাঁবু থেকে ছুটে পালাচ্ছে। ওরা ধূলিময় প্রান্তরের মাঝে একটি নিচু পাথুরে পাহাড়ের চারপাশে তাঁবু খাটিয়েছিল। তাঁর চতুর্দিকে তার সৈন্যরাও তা দেখতে পাচ্ছে। তিনি পূর্বদিক থেকে আক্রমণ করেছিলেন, যাতে মোগলরা যখন ওদের উপর হামলা করবে তখন উদীয়মান সূর্য ওদের চোখের সামনে থাকবে। এত তাড়াহুড়া করে কাজ করে ওরা বোকামির পরিচয় দিয়েছে। তাদের ভালোভাবে জানা উচিত ছিল যে, তার বাবা কখনও প্রকাশ্য অবাধ্যতাকে শাস্তি না দিয়ে ছাড়েন না…উচিত শাস্তি সময়ের ব্যাপার মাত্র।
যখন আওরঙ্গজেব যশবন্ত সিং-এর দুই বিধবাকে নবজাত পুত্র সন্তানদেরকে নিয়ে দিল্লি আসতে বললেন, তখন মনে হয়েছিল ওরা তাঁর কথায় রাজি হয়েছেন। রানিরা যাত্রা শুরু করে পানিপথ পর্যন্ত পৌঁছেছিলেন। এরপর একজন মারওয়াড়ি সংবাদবাহক আওরঙ্গজেবের কাছে এসে জানাল যে, একজন রানি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন এবং তাকে আবার যাত্রা শুরু করার আগে কিছুদিন বিশ্রাম নিতে হবে। এর এক সপ্তাহ পর মোগল চর খবর আনলো যে, রাতের অন্ধকারে মারওয়াড়িরা শিবির গুটিয়ে তাদের দেশের দিকে দ্রুত ফিরে যাচ্ছে।
আওরঙ্গজেব সাথে সাথে আকবরকে নির্দেশ দিলেন পাঁচশো অশ্বারোহী সেনার একটি বাহিনী নিয়ে পলাতকদের ধরে আনতে। যথারীতি সৈন্য জড়ো করে যাত্রা শুরু করতে করতে আকবর একটু বেশি সময় নিলেন। মোগল চরেরা খবর পাঠাল পলাতকরা ইতোমধ্যেই মারওয়াড়ের সীমানায় পৌঁছে গেছে। মোগল সেনার অগ্রবর্তী দলটি মারওয়াড়িদের অবস্থানের আট মাইল পূর্বদিকে একটি পাহাড়ের পেছনে লুকিয়ে আকবরের জন্য অপেক্ষা করছিল। এদিকে রানিরা তাদের দলবলসহ একই জায়গায় তিনদিন ধরে তাঁবু খাটিয়ে বসে। রয়েছেন আর কোনো কারণবশত ওদের আর সামনে এগোবার কোনো লক্ষণ : দেখা যাচ্ছে না। যেহেতু ওরা মারওয়াড়ের কাছেই পৌঁছে গেছেন, তাই হয়তো ভেবেছেন যে আওরঙ্গজেবের হাত থেকে নিরাপদ হয়েছেন। কিংবা একজন রানি হয়তো আসলেই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। আকবর একবার ভেবেছিলেন ওদেরকে একটা সুযোগ দেবেন, যাতে ওরা রানি আর বাচ্চাদেরকে তার হাতে তুলে দেয়–কেননা তার চরেরা তাঁকে খবর দিয়েছিল যে, শিবির রক্ষায় কেবল ষাট থেকে সত্তর জন সৈন্য রয়েছে। তবে তিনি রাজপুত যোদ্ধাদের নীতি ভালোভাবে জানতেন যে, ওরা কখনও তা করবে না। কাজেই অতর্কিতে আক্রমণ করলে তার নিজের ক্ষয়ক্ষতি কম হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে…।
তার চারপাশে লাল বালু উড়ছিল আর মারওয়াড়িদের প্রথম তাঁবুটা মাত্র পঞ্চাশ গজ সামনে দেখা যাচ্ছে, কাজেই বিষয়টা নিয়ে চিন্তা করার মতো আর সময় আকবরের হাতে নেই। গাদা বন্দুকের গুলি ছোঁড়ার আওয়াজে বাতাস ভারী হয়ে এসেছে। তার বাম পাশে একজন সেনা কর্মকর্তা ঘোড়ার জিন থেকে উল্টে পড়ে পেছন পেছন আসা সৈন্যদের ঘোড়াগুলোর নিচে অদৃশ্য হয়ে গেল। আরেকজন অশ্বারোহী সৈন্য ঊরুতে গুলির আঘাতে ঘুরে পড়ে গেল। তিনি যে রকম আশা করেছিলেন, মারওয়াড়িরা সংখ্যায় মুষ্টিমেয় হলেও রানিদের জীবন রক্ষায় নিজেদের প্রাণ বিসর্জন দিতে প্রস্তুত আছে। রসদবাহী দুটো গাড়ির মাঝে কয়েকটা পিপা রাখা ছিল, আকবরের ঘোড়া সহজেই পিপাগুলো টপকে গেল। আকবর তরোয়াল বের করে বাগিয়ে ধরলেন, যাতে সামনে কোনো আক্রমণকারী এলে আঘাত করতে পারেন। পেছনে ঘোড়ার খুরের শব্দে বুঝা গেল, দেহরক্ষী দল তার সাথেই রয়েছে। একজন দেহরক্ষী চিৎকার করে উঠলো, জাহাপনা, আপনার বামে তাকান!’ লাগাম টেনে নিয়ে আকবর তার ঘোড়াটি ঘুরাতেই কয়েকটি পাথরের আড়ালে গুটিসুটি মেরে বসে থাকা একজন মারওয়াড়ি একটা বল্লম ছুঁড়ে মারলো। ঠিক সময়মতো আকবর সামনের দিকে লাফ দিতেই বল্লমটা তার উপর দিয়ে উড়ে গিয়ে একটা গাড়ির গায়ে বিধলো। দেহরক্ষী তার ঘোড়ার পিঠ থেকে একটু নিচু হয়ে তরোয়ালের এক কোপ মারতেই আক্রমণকারী হাত-পা ছুঁড়ে পাথরের উপর পড়ে গেল। তার গলা থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরতে লাগলো।
