শিবাজি উঠলেন, অপেক্ষমাণ সেবকদের সহায়তায় পবিত্র গঙ্গাজল দিয়ে মাথা আর সারা দেহ ধুলেন। পুরোহিতরা এই গঙ্গাজলে মন্ত্রোচ্চারণ করে পবিত্র করে দিয়েছিল। তারপর তিনি ধবধবে সাদা আর ঢিলা লম্বা একটি পোশাক পরলেন। সেবকরা তার গলায় ফুলের মালা পরিয়ে দিল, তারপর বাহুতে বাজুবন্ধ, পায়ে নূপুর আর গলায় খাঁটি সোনার হার পরিয়ে দিল। তারপর যখন তিনি একা হলেন, তখন কয়েকটি ধূপকাঠি জ্বেলে ঘরের এককোণে একটি ছোট্ট বেদির সামনে এসে হাঁটুগেড়ে বসে মাথা ঝুঁকলেন। প্রার্থনা শুরু করতেই তার মাথাটা একটু টলে হালকা হয়ে এল, বুঝতে পারলেন এটা ক্ষুধার কারণে নয় …এটা হচ্ছে উত্তেজনা আর প্রত্যাশার একটি মিশ্রণ, তবে একটি অবাস্ত বতার অনুভূতিও রয়েছে। তার বিশ্বাসই হচ্ছিল না যে, অবশেষে এই দিনটি এসেছে।
একমনে তখনও ধ্যান করে যাচ্ছিলেন, এমন সময় কামরায় কারোও ঢোকার শব্দ পেয়ে ঘুরপাক খেয়ে উঠা ধূপের ধোয়ার মধ্য দিয়ে ব্রাহ্মণ পুরোহিত গগা ভট্টোর ছিপছিপে লম্বা দেহ আর তীক্ষ্ণ কালো চোখদুটো দেখতে পেলেন। পুরোহিত বললেন, আসুন প্রভু। লগ্ন উপস্থিত হয়েছে।
রাজা হিসেবে তাকে পবিত্র ঘোষণা করার জন্য পুণ্য নগরী বানারসি থেকে এই বিখ্যাত পণ্ডিত এবং ঋষিকে দাক্ষিণাত্যের পাহাড়ি এলাকার রায়গড়ে আমন্ত্রণ জানিয়ে তিনি ভালো করেছেন। গগা ভট্টের উপস্থিতি তার নিজ মারাঠি জনগণের উপর তার শাসনে একটি পবিত্র কর্তৃত্ব এনে দিয়েছে আর হিন্দুধর্মাবলম্বী অন্যান্য যারা আছেন তারা সবাই নতুনভাবে উজ্জীবিত হয়ে তার কাছে সমবেত হবেন।
পুরোহিতকে অনুসরণ করে শিবাজি উঠান পার হয়ে মন্দিরে ঢুকলেন। ভেতরে গাঁদাফুলে ঢাকা শিবের বাহন নন্দির-ষাঁড়ের একটি পাথরের মূর্তির কাছেই সোনালি রং-এর একটি নিচু বসার চৌকি রাখা ছিল। তার স্ত্রী সয়রা বাঈ আর বড় ছেলে শম্ভাজি অভিষেক আসনের পেছনে দাঁড়িয়েছিল। পুরোহিত আর সভাসদরা সবাই দলবেঁধে মন্দিরের ভেতরে চারদিকে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
শিবাজি বসার পর গগা ভট্ট তার সামনে একটি সোনার বাটি এগিয়ে নিয়ে বললেন, ‘শিবাজি, মা গঙ্গার এই পবিত্র জল ছিটিয়ে আমি আপনাকে মারাঠিদের রাজা হিসেবে পবিত্র করছি। আপনার শাসন সুদীর্ঘ আর ন্যায়পরায়ণ হোক, যাতে আপনি প্রজাদের আশীর্বাদ ধন্য হয়ে উঠুন আর দেবতারা আপনার অনুকূল হোন। তারপর একটি সোনার চামচ দিয়ে বাটি থেকে গঙ্গাজল তুলে শিবাজির মুখে আর মাথায় তিনবার ছিটিয়ে দিলেন। তারপর পবিত্র জলে ভরা সোনার জগ হাতে মুখ্য মন্ত্রীরা এগিয়ে এলেন, তারাও নতুন রাজার গায়ে গঙ্গাজল ছিটালেন। তারপর ষোলজন ব্রাহ্মণ নারী, অশুভ আত্মাকে দূর করার উদ্দেশ্যে প্রত্যেকে হাতে একটি করে সোনার থালায় পাঁচটি তেলের প্রদীপ নিয়ে তাঁকে ঘিরে মন্ত্রোচ্চারণ করতে করতে প্রদক্ষিণ করলো।
তারপর এল ওজন নেওয়ার অনুষ্ঠান–এটি রাজ্যাভিষেকের একটি প্রাচীন হিন্দু প্রথা, যা তিনি আবার এখানে চালু করছেন। ওজনের ভারে হিমশিম খেতে খেতে চারজন পুরোহিত ওজন মাপার বিশাল একটি দাঁড়িপাল্লা নিয়ে মন্দিরের ভেতরে ঢুকলো।
‘আসুন মহারাজ।
গগা ভট্ট স্মরণ করিয়ে দিতেই শিবাজি উঠে দাঁড়ালেন–ভেজা পোশাকটি গায়ের সাথে লেপ্টে রয়েছে, তারপর হেঁটে দাঁড়িপাল্লার কাছে গিয়ে একটি পাল্লায় উঠে আসন গেড়ে বসলেন। মনে মনে ভাবলেন, কি দুঃখ আমি কত হালকা, এরকম একটি ভাবগম্ভীর অনুষ্ঠানের মধ্যেও তার ঠোঁটে মৃদু হাসির উপক্রম হচ্ছিল। আমি যদি আরো মোটা আর ভারী হতাম তাহলে যে গরিবরা এই দান পাবে তারা হয়তো আরো উপকৃত হত। অনুষ্ঠান শুরু হতেই কয়েকজন পুরোহিত কয়েকটি সোনার বাট অপর পাল্লার উপর রাখলো। তিনি জেনেছেন এককালে এ ধরনের অনুষ্ঠানে সাতটি মূল্যবান ধাতুর মধ্যে এটিই প্রথমে দেওয়ার প্রথা ছিল। তিনি উপরের দিকে উঠতেই একটু কেঁপে উঠলেন। তারপর এল রূপার মুদ্রা, এরপর তামা, দস্তা, টিন, সিসা এবং সবশেষে লোহা। এরপর দেওয়া হল জায়ফল আর লবঙ্গ, তারপর লবণ, কর্পূর এবং মিহি সুতিবস্ত্র এবং সবার শেষে খাদ্যসামগ্রী। পাকা হলুদ কলা থেকে শুরু করে পাকা আম, রসাল মিষ্টি, ঘি এবং উজ্জ্বল সবুজ পান পাতা।
মন্দিরের সমস্ত অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর শিবাজি তার স্ত্রী-পুত্রসহ নিজের মহলে ফিরে গেলেন। সাদা পোশাকটি খুলে ভারী এমব্রয়ডারি করা একটি লাল টকটকে রেশমের পোশাক পরলেন। সয়রা বাঈ নিজেও দামি রেশমি পোশাক এবং প্রচুর অলঙ্কার পরেছিলেন। তিনি শিবাজির শরীর থেকে সাদামাটা অলঙ্কারগুলো খুলে উজ্জ্বল রত্নখচিত গাদা গাদা বালা, আংটি পরিয়ে দিলেন। তার হাতের চামড়া দেখা যাচ্ছিল না। সবকিছু পরিয়ে দেবার পর তিনি বললেন, এবার আপনাকে একজন সত্যিকার রাজার মতো দেখাচ্ছে, যা আপনি আসলেই তাই। এরপর গলায় দামিপাথর বসানো একটি হার পরিয়ে দিলেন আর মাথায় পরালেন ঝিকমিক করা মুক্তাখচিত একটি লাল পাগড়ি। সয়রা বাঈ শিবাজির মতোই দীর্ঘাঙ্গী ছিলেন, তাই পাগড়িটি পরাবার সময় তাকে পায়ের আঙুলের ডগায় ভর দিয়ে দাঁড়াতে হয়নি। তারপর স্ত্রী ও পুত্রকে পিছনে নিয়ে শিবাজি সিংহাসন দরবারের দিকে এগিয়ে গেলেন। সবার পেছনে একজন বাহক তার তরবারি, তীর এবং ধনুক বয়ে নিয়ে আসছিল। তার চলার সাথে সাথে শিঙ্গা আর ঢোলক বেজে উঠলো। তারপর জ্যোতিষীদের গণনা মোতাবেক কাঁটায় কাঁটায় সঠিক মুহূর্তে দরবারে ঢুকলেন। তারপর তিনি সিঁড়ি বেয়ে অষ্টভুজ সিংহাসনে উঠতেই, সেবকরা অপেক্ষমাণ অতিথিদের উপর ছোট ছোট সোনালি ও রুপালি পদ্মফুল ছিটিয়ে দিল। সমাগত অতিথিদের মধ্যে ছিল দুর্গ এবং এর চারপাশের গ্রামগুলোর হাজার হাজার মানুষের মধ্যে বাছাই করা অতি গুরুত্বপূর্ণ কিছু লোক, যারা তার অভিষেক উৎসব পালন করবেন। আর রাজ সিংহাসনের পেছনে গগা ভট্ট দাঁড়িয়ে ছিলেন।
