থাম ছেড়ে আওরঙ্গজেব একটা জানালার কাছে ছুটে গিয়ে বাইরে তাকালেন। পাখিগুলো চক্রাকারে আকাশে উড়ছে আর ভীত হয়ে চিৎকার করছে, উড়ন্ত পাখিগুলোর কারণে আকাশ কালো হয়ে রয়েছে। বুরুজের ছাদের একটি বড় টুকরা সাদা মার্বেল পাথর পানির ফোয়ারার উপর পড়তেই ফোয়ারাটি ভেঙ্গে গেল। ছড়ছড় করে প্রবল বেগে পানি পড়ে মার্বেল পাথরের উঠান ভাসিয়ে দিল। ছাদের লাল টালি ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে মার্বেল পাথরের পায়ে চলা পথের উপর ছড়িয়ে পড়লো। উঠানের এক কোণে একজন শ্রমিক সম্ভবত একজন মালি দেয়ালের গায়ে ঠেস দিয়ে রয়েছে আর আরেকজন মালি তার মাথার সাদা পাগড়ির প্যাঁচ খুলছিল। খুব সম্ভব এটা দিয়ে সে অপর লোকটির পায়ের নিচের যে জায়গায় কেটে রক্ত ঝরছিল তাতে বাঁধন দেবে। দুর্গের যতটুকু অংশ আওরঙ্গজেব দেখতে পাচ্ছিলেন, তাতে কেবল এই একজনকে দুর্ঘটনায় আহত মনে হচ্ছে। কিন্তু হেরেম আর জাহানারার অট্টালিকার কি অবস্থা? তার নিজের দালানটির মতো জাহানারার ভবনটিও একইরকমভাবে নির্মিত হওয়ায় আশা করা যায় সেটি হয়তো অক্ষত রয়েছে, তবে তাকে সেটা জানতে হবে। তিনি ঘুরে কোরচির দিকে তাকালেন, সে তখন কাঁপা কাঁপা হাতে মাটি থেকে জগটি তুলছিল।
‘ওটা এখন থাক। তুমি এক ছুটে গিয়ে দ্যাখে এস হেরেম আর জাহানারা বেগমের দালানের কোনো ক্ষতি হয়েছে কি-না। তারপর তার মনে পড়লো, কেল্লার দেয়ালের চারদিকে সাধারণ মানের বাড়িঘর ছড়িয়ে রয়েছে। তারপর বললেন, ‘আর দেহরক্ষী দলের সেনা কর্মকর্তাদের শহরে গিয়ে দেখতে বল সেখানে কিরকম ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।’
ঘণ্টাখানেক পর তিনি খবর পেয়ে নিশ্চিন্ত হলেন যে, হেরেম আর জাহানারার মহলে তেমন ক্ষয়ক্ষতি হয় নি। হেরেমে সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল, তবে গুরুতর ক্ষতি বলতে কেবল, উপর থেকে চুনসুরকি খসে পড়ে একজন পরিচারকের পায়ে বড় ধরনের আঘাত লেগেছে। হেকিমরা তার ভাঙ্গা পা কেটে ফেলতে যাচ্ছেন।
তারপর তাঁর দেহরক্ষী দলের প্রধান তাঁকে শহরের অবস্থা বললো, ‘জাহাপনা, শহরে বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। শহরের উত্তরের ফটকের একটি অংশ ভেঙ্গে পড়েছে। খিলানের উপরের মূল পাথরটি ভেঙ্গে পড়ে একটি গাধা-গাড়ি আর এর গাড়োয়ানকে চাপা দিয়েছে। ফটকের একজন দাড়োয়ান মাথায় সাংঘাতিক আঘাত পেয়েছে, এখনও কথা বলতে পারছে না। বাঁচবে বলে মনে হয় না। যমুনা নদীর তীরের কাছে শহরের দেয়ালের দশফুট অংশ ভেঙ্গে পড়েছে। এর কাছে একটি মসজিদের মিনার ভেঙ্গে পড়েছে আর একটি হিন্দু মন্দিরের পেছনের দেয়ালও ভেঙ্গে দুই টুকরা হয়ে গেছে। বেশিরভাগ কাদা-মাটির ইটের তৈরি ঘরবাড়ি ভেঙ্গে ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। কয়েকটি ঘরের ধ্বংসাবশেষের নিচে লোকজন আটকা পড়েছে। অন্যান্য জায়গায় কাঠের ভাঙ্গা টুকরা আর ছাদের খড় ঘরের ভেতরে চুলার আগুনে পড়ে দাউ দাউ করে জ্বলছে। কোনো কোনো জায়গায় আগুন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।’
আওরঙ্গজেব বললেন, ‘আগুন নিভাতে আর ভেঙ্গে পড়া বাড়ি-ঘরের নিচে চাপাপড়া লোকজনকে উদ্ধার করতে সৈন্য পাঠাও। আগুন নেভাবার জন্য দরকার পড়লে অন্য বাড়িও ভাঙ্গতে বলবে। আর কোষাধ্যক্ষকে বল যারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের মধ্যে টাকা বিতরণ করতে।
‘আমি এখুনি ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছি, জাঁহাপনা। তবে একটা কথা আপনাকে জানাতে চাচ্ছিলাম। হিন্দুদের মধ্যে কিছু লোক চিৎকার করে বলছিল, আপনি আবার জিজিয়া কর চালু করায় ভগবান রুষ্ট হয়ে ভূমিকম্প ঘটিয়েছেন।’
‘এটা পুরাদস্তুর অযৌক্তিক আর বাজে কথা। হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষ সকলেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে–আর সেই সাথে ওদের সবারই ঘর-বাড়ি ধ্বংস হয়েছে। বরং আমি বলবো এটা আল্লাহর কাছ থেকে অবিশ্বাসীদের জন্য একটা সতর্ক বার্তা হয়ে এসেছে, যাতে ওরা নিজের আত্মা আর ধনদৌলতেরও স্বার্থে সঠিক পথে ফিরে আসে।
‘জাঁহাপনা আপনি যা বলেছেন, তা অবশ্যই সঠিক। তবে আমি খোলা মনে বলতে চাই, এই সহজ সরল লোকগুলোর তাদের হিন্দু ধর্মের প্রতি গভীর বিশ্বাস রয়েছে। কোনো যুক্তি-তর্ক, তা যতই যুক্তিসংগত হোক তাদেরকে টলাতে পারবে না।’
আওরঙ্গজেব মাথা নাড়লেন। জিজিয়া কর পুনরায় চালু করে তিনি আল্লাহর সামনে সঠিক রয়েছেন, পরিণতি যাই হোক না কেন। এ নিয়ে দিল্লির কিংবা সাম্রাজ্যের অন্য কোথাও কোনো ধরনের বিদ্রোহ দেখা দিলে দরকার পড়লে তা দমন করার জন্য তিনি সৈন্যদের প্রস্তুত থাকতে বলবেন।
*
ভোরের একটু আগে রায়গড় দুর্গের মন্দিরের ঘণ্টা ধ্বনি শুনে শিবাজির ঘুম ভেঙ্গে গেল। তার পেট গুড়গুড় করে উঠলো। অবশ্য এর কারণ হচ্ছে এর আগের দিনটি তিনি উপবাস আর প্রার্থনায় কাটিয়েছেন–তবে ভোজন আর উৎসবের সময়ও হয়ে এসেছে। গত চার মাস ধরে তিনি তার অভিষেকের দিনটি নিয়ে পরিকল্পনা করে আসছিলেন। যত সামান্যই তোক খুঁটিনাটি প্রত্যেকটা বিষয় তিনি নিজে দেখাশুনা করছিলেন। এমনকি এসম্পর্কে হিন্দু ধর্মশাস্ত্রের বিশদ বিষয় পড়েছেন যাতে সিংহাসনে আরোহণের যে ধর্মীয় নিয়মাবলি রয়েছে তা খুঁজে বের করে পুনঃপ্রচলন করতে পারেন। মোগলদের অত্যাচারী শাসনে এগুলো সবাই প্রায় ভুলে গিয়েছিল। রাজ্য শাসনের পবিত্র স্বভাব ধর্মটি যে তিনি কত ভাল বুঝেন, তা সবার সামনে তুলে ধরার জন্য জনসমক্ষে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থানে গিয়ে পরিশোধনের যাবতীয় ধর্মীয় আচারানুষ্ঠান পালন করেছেন। এর ফলে ব্রাহ্মণ পুরোহিতরা তাকে পৈতা প্রদান করলেন। তাদের সহযোগিতার কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তিনি সারা হিন্দুস্তান থেকে পঞ্চাশ হাজার ব্রাহ্মণকে আমন্ত্রণ করে এনে তাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করেছেন, যাতে তারা মারাঠার রাজা হিসেবে তার রাজ্যাভিষেক প্রত্যক্ষ করতে পারে।
