জাহানারা প্রায় চিৎকার করে বলে উঠলেন, “আওরঙ্গজেব, তুমি কি করে এটা করতে পারলে? আর আমাকে আগে বলেনি কেন? আমাদের পূর্বপুরুষরা যা করার জন্য প্রাণপণে চেষ্টা করে গেছেন তুমি তার সমস্ত পরিত্যাগ করছে। এই কর উঠিয়ে দিয়ে তারা আমাদের জনগণের মাঝে একতা আর সমতা আনার চেষ্টা করছিলেন। তুমি ভুলে গেছ এটা মুসলিম দেশ নয়–আমি তোমাকে আগেই বলেছি এখানকার বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষই হিন্দু। কিন্তু তুমি এমন আচরণ করছে, যা বিভক্তি আর বিদ্রোহ ডেকে আনছে। আমাদের পূর্বপুরুষরা যদি এমন আচরণ করতেন, তাহলে আমাদের সাম্রাজ্য কখনও টিকে থাকতে পারতো না। তুমি আমার কথা শোন…আমার কর্তব্য তোমার সাথে মনখোলা হওয়া। নাছোড়বান্দার মতো যদি এতে অটল থাক, তাহলে তোমার অনেক বিশ্বস্ত প্রজাকে দূরে সরিয়ে দেবে। আর তাদের তীব্র ক্রোধ আমাদের মাথায় আঘাত হানবে। শূন্য থেকে তুমি এমন একটি ঝড় ডেকে আনবে, যা সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। কেন তুমি এটা দেখতে পাচ্ছ না?’ জাহানারা থামলেন, তার চোখমুখ লাল হয়ে রয়েছে।
‘আমি আবার বলছি, করারোপ করাটা আমাদের ধর্মীয় প্রথানুযায়ী একজন শাসকের অবশ্য পালনীয়। আর আমি প্রচলিত মতে বিশ্বাসী একজন মুসলিম শাসক।’ কথাটি বলার সময় অনেক চেষ্টা করেও আওরঙ্গজেব তার কণ্ঠস্বরে উত্তেজনা লুকাতে পারলেন না। তারপর বলে চললেন, আমি দুঃখিত যে কথাটা আগেই তোমাকে বলা হয়নি, তবে এ ব্যাপারে তোমার প্রতিক্রিয়া আমি আগে থেকে আঁচ করতে পেরেছিলাম। তাছাড়া তোমার সাথে ঝগড়া করার আমার কোনো ইচ্ছে ছিল না। এজন্য আমি আন্তরিকভাবে তোমার কাছে ক্ষমা চাচ্ছি। তবে তোমাকে একটা বিষয় বুঝতে হবে যে, এগুলো তোমার বিবেচনার বিষয় নয়। একজন নারী হিসেবে বাইরের পৃথিবীর ব্যাপারে আমার দিক নির্দেশনা তোমার গ্রহণ করা উচিত, যেরকম আমাদের পারিবারিক বিষয়েও তোমার উপদেশ আমি প্রায়ই মেনে চলি।’
জাহানারা তাঁর দিকে এগিয়ে এলেন। একটা মুহূর্ত তার মনে হচ্ছিল তিনি হয়তো তাঁকে আঘাত করতে যাচ্ছেন। কিন্তু তিনি আওরঙ্গজেবের সামনে হাঁটুগেড়ে বসে তার দিকে তাকিয়ে অনুনয় করে বললেন, দয়া করে বিয়ষটি আরেকবার বিবেচনা কর! আমার জন্য আর আমাদের বংশের খাতিরে।’ এবার তিনি তার দুই পা চেপে ধরে বললেন, যদি তুমি এবিষয়ে অটল থাক তবে আমাদের সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়ে যাবে।’
আওরঙ্গজেবের আর কিছুই বলার ছিল না। এনিয়ে আর তর্ক করা মানে নিজেদের মধ্যে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে তা আরো গভীর করে তোলা। দুজনের মধ্যে কেউ হয়তো এমন কিছু বলে ফেলবেন–যার জন্য হয়তো পরে অনুতপ্ত হতে হবে। কাজেই অতীতের কথা না তোলাই ভাল। বোনের হাত থেকে অত্যন্ত ধীরে ধীরে নম্রভাবে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে তিনি পেছনে ঘুরে আড়ষ্টভাবে হেঁটে কামরা থেকে বের হয়ে গেলেন।
জাহানারা ডেকে উঠলেন, ‘আওরঙ্গজেব! দাঁড়াও…’ কিন্তু তিনি একবারও ফিরে তাকালেন না।
*
দিল্লির লালকেল্লায় আওরঙ্গজেব রাজমুকুট খুলে একটি কাপড়ের টুকরা দিয়ে কপালের ঘাম মুছলেন। একজন তরুণ পরিচারক–কোরচি লম্বা গলার একটি জগ থেকে একটি রত্নখচিত পেয়ালায় শীতল তরমুজের শরবত ঢেলে তাঁর হাতে তুলে দিল। এইমাত্র তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে জিজিয়া কর পুনরায় চালু করার ঘোষণা দিয়ে এসেছেন। হিন্দুদের তাৎক্ষণিক বিরূপ প্রতিক্রিয়া এড়াতে তিনি যে ঝরোকা বেলকনি থেকে ঘোষণাটি দিয়েছিলেন দরবারের কর্মকর্তারা তার নিচের প্রথম সারিতে উলেমা আর দরবারের মুসলিম সদস্যদের বসার ব্যবস্থা করেছিলেন। মুসলিম পল্টন থেকে প্রচুর সেনা হাতের কাছে অপেক্ষমাণ ছিল। ঘোষণাটি দেওয়ার পর ভিড়ের পেছন দিক থেকে সামান্য প্রতিবাদের চিৎকার শোনা গিয়েছিল। তার ধারণা, একই রকম প্রতিক্রিয়া অন্যান্য স্থানেও হবে।
আওরঙ্গজেব শরবতে একটা লম্বা চুমুক দিলেন। বেলকনির হাওয়া বেশ গরম আর গুমোট ছিল। এমনকি পাখিরাও আকাশে না উড়ে ঝাঁক বেঁধে ছাদে বসে রয়েছে। বর্ষা আসার আর বেশি দিন বাকি নেই, বৃষ্টির সাথে সাথে শীতল স্বস্তি মিলবে। হঠাৎ তার শরীর কেঁপে উঠতেই পেয়ালা থেকে শরবত ছলকে পড়লো। তিনি তো অসুস্থ নন, কিন্তু আসলেই কী তাই? গরমে কিংবা এখুনি যা করে এসেছেন তার কারণে কী মানসিক চাপ হয়েছে? না, আবার আরো জোরে কেঁপে উঠলো–ভূমিকম্প হচ্ছে, বেশ বড় ধরনের ভূমিকম্প। নিচু টেবিলের উপর রাখা শরবতের জগটি মাটিতে পড়ে গেল। ফেনিল গোলাপি রং-এর শরবত নীল আর বাদামি রং-এর ইরানি গালিচার উপর পড়ে ভিজিয়ে দিল। একই সাথে ঝুলন্ত দুটো তেলের বাতি মাটিতে পড়তেই কাঁচ ভেঙ্গে চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো। আওরঙ্গজেব একটা থাম আঁকড়ে ধরে নিজেকে সামলালেন। হাতির দাঁতের কাজকরা একটি আয়না মাটিতে পড়ে ভেঙ্গে চৌচির হয়ে গেল। বাইরে ধপ করে একটা শব্দ হল। বেলকনির চতুর্দিকে সূক্ষ্ম কারুকাজ করা বেলে পাথরের রেলিং-এর একটা অংশ ভেঙ্গে পড়েছে। এর পরপরই বেলকনির দরজার বেলে পাথরের চৌকাঠে আঁকাবাঁকা ফাটল দেখা দিতেই কিছু ফেঁটে যাওয়ার ভারী আরেকটি শব্দ পাওয়া গেল। আর বিশ ফুট নিচে মাটিতে পড়ে বেলকনির বেশিরভাগ অংশই অদৃশ্য হয়ে গেল। কম্পন থেমে গেছে, তবে আরো কয়েকবার ধুপ করে কিছু পড়ে যাওয়ার শব্দ শোনা গেল। ছাদের কিছু অংশ আর দুর্গের ছাদে কামান-গোলা নিক্ষেপের জন্য ছিদ্রবিশিষ্ট বেলেপাথরের বুরুজের সমতল ছাদ নড়বড়ে হয়ে ভেঙ্গে মাটিতে পড়ে গেল।
