আকবর বললেন, কিন্তু বাবা, মোগল কর্মকর্তাদের আগমনে মারওয়াড়িরা খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়বে। আর আপনি যদি ওদের একটিও পবিত্র স্থান ভেঙ্গে ফেলেন, তবে সেটা আগ্রাসন কিংবা বিনা উস্কানিতে একটি লড়াইয়ের নমুনা হিসেবে দেখা হবে না? এই লোকগুলোতে আমাদের মিত্র। আর বিশেষত এমন একটি সময়ে আমরা ওদেরকে ক্ষুব্ধ করে তুলছি, যখন ওরা ওদের মৃত রাজার শোকপালন করছে। তাছাড়া এমনিতেই আমাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ চলছে–দাক্ষিণাত্যে শিবাজি ছাড়াও সাম্রাজ্যের অন্যান্য এলাকাতেও বিদ্রোহ চলছে, তাই না? এধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার আগে আমাদের কি আরো বিবেচনা করা উচিত না?
এমন সময় আজম বলে উঠলো, তুমি সব সময় কাজে না লেগে দেরি করার কারণ খুঁজে বেড়াও। তুমি কি কখনও কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারো না ভাই?
আওরঙ্গজেব ভাবলেন, ধীরস্থির এবং সবার প্রিয় আকবরের তুলনায় আজম তার মৃত ইরানি মায়ের দুর্দমনীয় মেজাজ পেয়েছে। আযম অবশ্য ঠিকই বলেছে। আকবরকে শিখতে হবে যে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে কর্মের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়াটাই একমাত্র উপায়। তবে অধৈর্য আর উগ্র আজমেরও কিছু শেখার দরকার আছে–সভাসদদের সামনে তার জিহ্বা সামলাতে হবে। খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে শাহজাদাদের ঝগড়া করা উচিত নয়। ভ্রু কুঁচকে তিনি এক হাত তুললেন। বাবার চোখে ভর্ৎসনার আভাস পেয়ে আজম চুপ করলো। আকবরকে দেখে মনে হচ্ছিল ভাইয়ের মন্তব্য শুনে সে মনে কষ্ট পেয়েছে। আওরঙ্গজেব আকবরের দিকে ফিরে বললেন, ‘আকবর, যেটা তোমার কাছে বৈধ প্রশ্ন মনে হয়েছে তা তুমি আলোচনায় পেশ করেছ, তবে একবার নিজেকে প্রশ্ন কর : রাজপুতরা কি আসলেই আমাদের মিত্র? ওরা আমাদের ধর্মের নয় আর আমাদেরকে সামন্তপ্রভু স্বীকার করেছে, কেননা আমাদের উদারতা থেকে ওরা উপকৃত হচ্ছে। ওদের উপর প্রাথমিক বিজয়লাভের পর আমার প্রপিতামহ সম্রাট আকবর ওদের প্রতি খুব বেশি উদারতা দেখিয়েছিলেন। আর তাই করেছিলেন তোমার পিতামহ–তিনি ওদের কাছ থেকে কেবল ভাসা-ভাসা আনুগত্যের শপথ খুঁজেছিলেন। আর তারপর যখন নতুন একজন রাজপুত রাজা সিংহাসনে বসলো, ওরা সবাই তাদের ঔদ্ধত্য আর অহঙ্কার দেখাতে উৎসাহিত করলো। রাজপুতরা একটি উচ্চণ্ড এবং বিশৃঙ্খল জাতি। ওদের সাথে প্রশংসা আর আপসমূলক আচরণ না করে, আমাদের পূর্বপুরুষদের উচিত ছিল ওদের উপর আমাদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করা। এখন যশবন্ত সিং-এর মৃত্যুর পর তাদের কাজকর্মে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, কাজেই এই সুযোগে মারওয়াড়িদেরকে ওদের উপরে আমার ক্ষমতার কথা মনে করিয়ে দিতে হবে। আর যদি ওরা আমাকে অমান্য করে তাহলে ওরা নয়, আমরা উপকৃত হব। আশা করি তুমি সেটা বুঝতে পেরেছ আকবর?’
আকবর শান্তভাবে উত্তর দিল, ‘হ্যাঁ, বুঝেছি বাবা।
*
দিল্লি কেল্লার কেন্দ্রীয় উঠানের পানির ফোয়ারার পাশ দিয়ে দ্রুত হেঁটে আওরঙ্গজেব হেরেমের চন্দনকাঠের ফটকের দিকে চললেন। ফটকের সামনে দাঁড়ান দুজন তুর্কি নারী প্রহরী ফটক খুলে ধরতেই মেয়েমহলের রোজমেরি, প্যাচুলি আর কস্তুরির মৃদু সুগন্ধ তাকে ঢেকে ফেললো। লাল মখমলের পর্দা ঝুলানো উদিপুরী মহলের আবেদনময় প্রমোদমহলের দিকে না ঘুরে জাহানারা হেরেমে এলে যে অনাড়ম্বর কামরাগুলো ব্যবহার করেন সেদিকে চললেন। জাহানারা তাঁর পরিচারিকাকে পাঠিয়ে তাঁকে দেখা করার জন্য অনুরোধ জানাবার সাথে সাথে তিনি এখানে চলে এসেছেন। জাহানারাকে দেখলে তিনি খুশি হবেন। তিনি যা ভেবেছিলেন, সাম্রাজ্যের পাদিশাহ বেগম হিসেবে জাহানারা তার দায়িত্ব অত্যন্ত অধ্যবসায় সহকারে পালন করছিলেন। তিনি যথাযথ আনুষ্ঠানিকতার সাথে রাষ্টদূত এবং করদরাজ্যের রাজাদের স্ত্রীদের অভ্যর্থনা জানাচ্ছিলেন, তাঁর কথা ও বুদ্ধি দিয়ে তাদেরকে মুগ্ধ করছিলেন। এছাড়া বিপদগ্রস্ত রাজ কর্মকর্তা ও অন্যান্য বিধবার সাহায্যের আবেদনের জবাব দিচ্ছিলেন। হেরেমের খোঁজাদের প্রশাসন দক্ষতার সাথে পরিচালনা করছিলেন। এতগুলো নারী যেখানে একত্রে বসবাস করছেন, স্বভাবতই সেখানে তাদের পরস্পরের মাঝে ভুল বুঝাবুঝি আর হিংসাবিদ্বেষ হতে পারে, তিনি সেগুলোরও সমাধা করছিলেন। তাঁর আলাদা ভবনের নির্জনতায় আশ্রয় নেওয়ায় সম্ভবত পরবর্তী কাজটি সহজ হয়েছিল।
আওরঙ্গজেব কামরায় ঢুকে দেখলেন জাহানারা জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। তাঁর পায়ের আওয়াজ শুনে তিনি মাথা উঁচু করে ঘুরে তাকালেন। আওরঙ্গজেব অবাক হয়ে দেখলেন তিনি ভ্রু কুঁচকে রয়েছেন, মুখের হাসিতে আর কালো চোখে কোনো উষ্ণতা নেই। কোনো ভনিতা না করে, কোনো ধরনের সম্ভাষণ না করে তিনি প্রথমে কথা বললেন, ‘আমি গুজব শুনতে পেলাম, মারওয়াড়ের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া আর হিন্দু ধর্মের বিরুদ্ধে নানা-ধরনের বিধি-নষেধ আরোপ করার পরও তুমি সন্তুষ্ট না হয়ে যারা তোমার স্বধর্মের নয় তাদের সবার উপর জিজিয়া কর আরোপ করতে চাচ্ছ। বিধর্মীদের উপর করারোপের প্রথা সম্রাট আকবর উঠিয়ে দিয়েছিলেন। আমার এটা বিশ্বাস হচ্ছে না। এটা সম্পূর্ণ পাগলামি।
হঠাৎ এরকম প্রচণ্ড আক্রমণে আওরঙ্গজেব একটু ইতস্তত করতে লাগলেন। যেভাবেই হোক ভুল বুঝার কারণে জাহানারা যা সত্যি বিশ্বাস করেন তাই বলছিলেন। তাঁর চারপাশে আর যারা আছেন–এমনকি তাঁর পরিবারের সদস্যদের মতোও জাহানারা নিজের স্বার্থে প্রণোদিত হয়ে চলেন না। তিনি যতদূর সম্ভব কণ্ঠস্বর শান্ত এবং নিচু করে বললেন, হ্যাঁ। আমি আমাদের ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী জিজিয়া কর আরোপ করতে যাচ্ছি। এটা করার জন্য আমাকে সমালোচনা না করে বরং তোমার উচিত আমাদের পূর্বপুরুষদের সমালোচনা করা যারা এ প্রথা বিলোপ করেছিলেন।
