আর যদি তিনি এই শীতল সুদূর পাহাড়ি অঞ্চলে মারা যান তাহলে মারওয়ারের কি হবে? তার একমাত্র পুত্র জগত সিং তার সাথে উত্তরের যুদ্ধাভিযানে এসেছিল, সেও ছয়মাস আগে নিহত হয়েছে। শত্রুদের অতর্কিত আক্রমণে তার ঘোড়াটি আহত হয়ে তাকে গভীর খাদে ফেলে দেয়। তার বংশের অনেক রাজপুত্র সিংহাসনে বসতে চাইবে। তিনি কোনো একটি ব্যবস্থা না করলে সেখানে গৃহযুদ্ধ বেঁধে যাবে আর সেই সুযোগে মোগলরা তার রাজ্য দখল করে নেবে। ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়ে তিনি আবার কাশতে শুরু করলেন, কাশির সাথে ফেনার মতো রক্ত বের হয়ে এল। সাথে সাথে ভেজা একটা কাপড়ের টুকরা দিয়ে ঠোঁট মুছলেন। এই কাপড়টা আজকাল সব সময় তার কাছেই থাকে। আর দেরি করা যাবে না। তিনি পরিচারককে ডেকে বললেন, একটা কাগজ আর কলম নিয়ে এস।’
ভেড়ার চামড়ার কম্বল গায়ে জড়িয়ে বসে তিনি কাঁপা কাঁপা হাতে তার মুখ্য মন্ত্রীর উদ্দেশ্যে একটি চিঠি লিখতে শুরু করলেন। তার উত্তরাধিকার কে হবে সে বিষয়ে তার ইচ্ছার কথা লিখলেন। তার দুইজন স্ত্রী এখন সন্তানসম্ভবা। যদি একজনের ছেলে হয় তবে সে হবে পরবর্তী রাজা। দুজনেরই ছেলে হলে, প্রথম যার জন্ম সে হবে উত্তরাধিকারী। আর যদি কারও পুত্র সন্তান না হয়, তবে তার ভাইয়ের ছেলে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হবে। চিঠি লেখা শেষ করার পর কাগজে গরম মোমের প্রলেপ দিয়ে তার সীলমোহর দিয়ে ছাপ মেরে দিলেন। তারপর যশবন্ত সিং শুয়ে পড়লেন, বাইরে ঝড়ো বাতাস প্রচণ্ড শো শো শব্দ করে চললো। পরিশেষে এখন মৃত্যু যদি শীঘ্রই চলেও আসে তিনি তার রাজ্যের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পেরেছেন, অবশ্য তার মনে হচ্ছে মৃত্যু আসলেই সন্নিকটে।
০৭. একজন রাজার সিংহাসনে আরোহণ- রাজ্যাভিষেক অনুষ্ঠান
দিল্লির লাল কেল্লার দেওয়ান-ই-খাসে আওরঙ্গজেব তাঁর সামনে পা ভাঁজ করে বসে থাকা সভাসদদের দিকে তাকালেন। এদের মাঝে তার দুই মধ্যম পুত্রও বসে রয়েছে। উপদেষ্টাদের সভায় আজম আর আকবরকে আমন্ত্রণ জানিয়ে তিনি দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন। তাদের উপস্থিতিতে তিনি তাদের বুদ্ধিমত্তা যাচাই করতে পারবেন আর সেই সাথে তাদেরকে সরকার পরিচালনার কৌশল শেখাবেন, যা তার বাবা তাকে শেখাতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। এছাড়া শীঘ্রই তিনি তাদেরকে সুবেদার হিসেবে নিযুক্ত করবেন, যেরকম বড় ছেলে মুয়াজ্জমকে গুজরাটের সুবেদার নিযুক্ত করেছেন। তবে এখন তাঁকে আরো জরুরি একটি বিষয়ে মনোনিবেশ করতে হবে। গতকাল একজন কাসিদ কাবুলের কাছে যশবন্ত সিং-এর মৃত্যু সংবাদ নিয়ে এসেছে।
আওরঙ্গজেব বললেন, আপনারা সকলে জানেন আজ কেন আপনাদেরকে এখানে আমি ডেকেছি। যশবন্ত সিং মারা গেছেন। এমন একজন মানুষ যার আনুগত্য প্রশ্নাতীত ছিল না, তার মৃত্যুতে আমি খুব বেশি শোক প্রকাশ করার ভান করতে পারি না। কাজেই শুধু শুধু মিথ্যা ভাবাবেগ না দেখিয়ে আমি সময় নষ্ট করবো না। তার চেয়ে বরং মারওয়াড়ের ভবিষ্যৎ শাসন ব্যবস্থার বিষয়ের দিকে আমরা কথা বলবো। তারপর তিনি তাঁর কোষাধ্যক্ষ সাদাচুলের আবদুল আসিফের দিকে তাকিয়ে বললেন, যশবন্ত সিং-এর কর্মকর্তারা কি বাৎসরিক বকেয়া কর রাজকোষে জমা করেছে?
না জাহাপনা।’
‘তাহলে ওরা বকেয়া কর পরিশোধ করা পর্যন্ত প্রশাসনের ভার নিতে মারওয়ারে আপনার লোক পাঠাবেন।
আজম জিজ্ঞেস করলেন, মারওয়ারের অধিরাজ হিসেবে সিংহাসনের উত্তরাধিকারের বিষয়ে আপনি কী করবেন?
‘যে কাসিদ যশবন্ত সিং-এর মৃত্যু সংবাদ নিয়ে এসেছিল, সে সাথে করে তার শেষ ইচ্ছাপত্র আর উইলের একটি অনুলিপিও নিয়ে এসেছিল। হঠকারিতা করে সে এই উইলে কে উত্তরাধিকারী হবে তা লিখেছে অথচ একটি করদ রাজ্যের চুক্তির নিয়মে রয়েছে, তার ইচ্ছার কথা পরিষ্কার উল্লেখ করে শেষ সিদ্ধান্ত অধিরাজ হিসেবে আমার হাতে ছেড়ে দেওয়ার কথা। একাজটি করে সে তার নিজের এবং স্বজাতির চরিত্রানুযায়ী ঔদ্ধত্য দেখিয়েছে। যশবন্ত সিং অবশ্য আমার কাজ করতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছে, তাই আমি প্রতিহিংসাপরায়ণ হব না। তার দুই বিধবা স্ত্রী শরৎকালে কাবুল থেকে ফেরার পথে লাহোরে দুটি পুত্র সন্তানের জন্ম দিয়েছে। আমি ওদেরকে দিল্লিতে ডেকে পাঠাবো যাতে ন্যায় সিদ্ধান্ত নিতে পারি। ইতোমধ্যে আমি অস্থায়ীভাবে প্রশাসক হিসেবে মারওয়ারে আমার রাজকর্মচারী নিযুক্ত করবো যাতে রাজপুতরা বুঝতে পারে যে, আমার সাম্রাজ্যে আমার শাসনক্ষমতার শ্রেষ্ঠত্ব দেখাবার ক্ষেত্রে তারা ব্যতিক্রম নয়। মারওয়ারে যাওয়ার জন্য যে রাজ কর্মচারীদেরকে বাছাই করা হবে, তাদেরকে অবশ্যই শক্ত মুসলিম, কঠিন চরিত্রের অধিকারী, বিশ্বস্ত এবং দায়িত্ব-কর্তব্যে নিবেদিত প্রাণ ব্যক্তি হতে হবে। সাম্রাজ্যের অন্যান্য অঞ্চলের মতো হিন্দু ধর্মীয় উৎসব নিষিদ্ধ করে ওরা ফরমান জারি করবে। এছাড়া আমি ওদেরকে আদেশ করছি একটি বিখ্যাত হিন্দু মন্দির বেছে নিয়ে তা ধ্বংস করবে। এটি মারওয়াড়ি আর রাজপুতনার অন্যান্য রাজ্যগুলোর অধিবাসীদের মধ্যে একটা সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে। যাতে ওরা আমার প্রতি যথোপযুক্ত সম্মান প্রদর্শন করে, যা জীবিতকালে যশবন্ত সিং-এর আচরণে আর মৃত্যুর আগে তার শেষ ইচ্ছায়ও দেখা যায় নি।
