কোন রাজপুত রাজা অবশ্য এ পর্যন্ত তাদের স্বধর্মের লোকদের প্রতি তিনি যে আচরণ করছেন, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিবাদ করে নি। তবে তাঁর গুপ্তচরেরা তাদের আশঙ্কা সম্পর্কে তাঁকে জানিয়েছিল। সেকারণেই উত্তরে মুসলমানদের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধাভিযানে সাধারণত যা করা হত তার চেয়ে অনেক বেশি রাজপুত সৈন্য এবং সেনাপতি তিনি তাঁর সেনাদলে সংযুক্ত করেছিলেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল এদের দেহমনকে অন্য কোনো কাজে ব্যস্ত রাখা, আর কোথাও হিন্দু কোনো সশস্ত্র বিদ্রোহ দেখা দিলে তা থেকে ওরা যেন দূরে থাকে। বিশেষত যশবন্ত সিং-এর বিশ্বস্ততা নিয়ে দীর্ঘদিন থেকে তাঁর সন্দেহ ছিল। গৃহযুদ্ধের সময় তিনি অতিদ্রুত, বেশ সহজভাবে পক্ষবদল করে আওরঙ্গজেবের পক্ষে চলে এসেছিলেন।
আওরঙ্গজেব এবার বললেন, তাঁবুর ভেতরে আসুন যশবন্ত সিং রাজপুত রাজা মাথা নুইয়ে অভিবাদন করে ভেতরে ঢুকলেন, তাকে অনুসরণ করে অন্যান্য সেনাপতিও ঢুকলেন। সবাই ভেতরে ঢোকার পর আওরঙ্গজেব ঘুরে নিজেও ঢুকে তারপর বললেন, আপনারা সবাই বসুন। আমাদেরকে এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে সামনে এগোবার সবচেয়ে ভাল উপায় কোনটি। তবে সবার আগে জানতে হবে, আজ রাতে আমাদের এই শিবিরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট প্রহরী আর পাহারা-চৌকির ব্যবস্থা করা হয়েছে কি-না।
যশবন্ত সিং উত্তর দিলেন, অবশ্যই করা হয়েছে, জাঁহাপনা। আমরা প্রহরীর সংখ্যা স্বাভাবিকের চেয়ে তিনগুণ বৃদ্ধি করেছি আর সীমানা রেখার চারপাশ ঘিরে অশ্বারোহী সেনাদল টহল দিচ্ছে।’
‘বেশ ভাল। আর আগামীকালের জন্য আপনাদের মতামত কী?
যশবন্ত সিং আবার উত্তর দিলেন, পাহাড়ি এই উপজাতিদের সম্পর্কে আমার যথেষ্ট অভিজ্ঞতা রয়েছে। তা থেকে আমি বলতে পারি, রাতের বেলা ওরা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাবে। আর তা যদি ওরা নাও করে, তাসত্ত্বেও জোর করে গিরিপথ পার হওয়ার চেষ্টা করা বোকামি হবে। আমাদেরকে ওদের পাশ কাটিয়ে বা এড়িয়ে যেতে হবে। এটা খুব একটা কঠিন হবে না। এখানে ইতোপূর্বেকার আমার কয়েকটি সফল অভিযানের কথা মনে পড়ে, এই পাহাড়গুলোর মধ্য দিয়ে আরো অনেক গিরিপথ আছে।
আওরঙ্গজব মৃদু হাসলেন। যশবন্ত সিং-এর উপদেশটি বেশ ভাল। সামরিক দক্ষতা আর অভিজ্ঞতা নিয়ে তার বেশ গর্ব রয়েছে। তার এই আত্মতৃপ্ত মতামতটি সম্রাটকে একটি ধারণা দিয়েছে যা এই রাজপুত রাজাটি পছন্দ করবেন না। তবে এতে ক্ষতিকর কিছু করা থেকে তিনি দূরে থাকবেন আর কয়েক বছরের জন্য সম্রাটের ক্ষমতার কেন্দ্র থেকেও দূরে থাকবেন। এই অভিযানটি বিজয় লাভের পর তিনি এই পার্বত্য এলাকায় যশবন্ত সিং-এর নিজ দাবিকৃত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তাকে জানাবেন, নতুন এই পদের জন্য তিনিই একমাত্র উপযুক্ত প্রার্থী আর সেজন্য যশবন্ত সিংকেই তিনি বিদ্রোহীসুলভ উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের সুবেদার নিযুক্ত করছেন।
*
খাইবার গিরিপথের কাছেই তাঁবুতে যশবন্ত সিং শুয়ে রয়েছেন, তার চোখে ঘুম নেই। তাঁবুর চারপাশ ঘিরে শীতের হাওয়ার গর্জন শোনা যাচ্ছে, বাতাসে তাঁবুর ক্যানভাসের দেয়াল কাঁপছিল। পারস্যের মদদে যে বিদ্রোহী আর দস্যুদল উত্তরের গিরিপথ দখল করেছিল আওরঙ্গজেবের সেনাবাহিনী অতিদ্রুত তাদেরকে হটিয়ে দিয়ে গিরিপথগুলো মুক্ত করলো। তবে একাজে সহায়তার জন্য রাজপুতরা ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। তবে তাকে এখানকার সুবেদার নিযুক্ত করায় বিস্মিত হওয়ার সাথে সাথে তিনি বেশ হতাশও হয়েছিলেন। তবে সম্রাট যখন তার অভিজ্ঞতার গদগদ প্রশংসা করছিলেন আর জোরালোভাবে বলেছিলেন যে এই পদের জন্য তিনিই শ্রেষ্ঠ, তখন তাঁর সম্রাটের এই সিদ্ধান্তে প্রশ্ন করার কোনো কারণ তিনি খুঁজে পাচ্ছিলেন না।
এটা বেশ কয়েকমাস আগের কথা। এখানকার শাসনকর্তৃত্ব পাওয়ার পর তার পূর্বসুরিদের মতো তিনিও আবিষ্কার করলেন যে, এই পার্বত্য উপজাতিদের উপর পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা কি কঠিন ব্যাপার। উপজাতিরা তার সীমান্তবর্তী দুর্গে আক্রমণ চালাতো, আর তার রসদ সরবরাহ ব্যবস্থার উপর অতর্কিত হামলা করতো। প্রতিটি হামলার পর তাদেরকে ধরার আগেই ওরা অদৃশ্য হয়ে যেত। তাদের গাদা বন্দুকের পাল্লা তার নিজের সেনাদের চেয়ে বেশি ছিল আর পাহাড়ি ছাগলের মতো ওরা খাড়া পাহাড়ের গা বেয়ে উঠানামা করতো। এছাড়া কোনো মোগল সৈন্য তাদের হাতে ধরা পড়লে ওরা বন্দী সেনার উপর অত্যন্ত জঘন্যভাবে বর্বর নৃশংসতা চালাত। আর এতে অন্যদেরকে বাধ্য করতো দলে ভারী হয়ে তাদের পিছু করতে। কেবল যে কোনো ছুতায় ওদের নিজেদের মধ্যে লড়াই করার স্বাভাবিক প্রবণতাই ওদেরকে সম্পূর্ণ প্রদেশে ছড়িয়ে পড়া ও দখল করা থেকে বিরত রেখেছে। বিশেষত তার রাজপুত সেনারা পার্বত্য অঞ্চল, এর আবহাওয়া আর স্থানীয় অধিবাসীদেরকে সমানভাবে ঘৃণা করে। সমতল এলাকার অন্যদের মতো তিনি নিজেও বেশ কয়েকবার সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত হয়েছেন আর দিন দিন এটা এখন ঘন ঘন হচ্ছে।
নতুন করে ঝড়ো হাওয়ার ঝাঁপটায় তাঁবুটি আবার কেঁপে উঠলো। যশবন্ত সিং কেঁপে উঠলেন। এক গাদা ভেড়ার চামড়ার কম্বল শরীরে জড়িয়ে আর তাঁবুর এক কোণে পিতলের পাত্রে কাঠ-কয়লার আগুন জ্বলা সত্ত্বেও ঠাণ্ডায় তার হাড় পর্যন্ত কেঁপে উঠতে লাগলো। চোখ বুজে তিনি মুখে রোদের উত্তাপের কথা মনে করার চেষ্টা করতে লাগলেন। তার মনে পড়লো সেই বহুদূর চলে যাওয়া অপূর্ব সুন্দর রাজস্থানি মরুভূমিতে সূর্যাস্তের সময় তার বিশাল বেলে পাথরের দুর্গ মেহরানগড় কিরকম লাল হয়ে যেত। আর কি কখনও তিনি তার স্বদেশ দেখতে পাবেন? কোন কারণে তার এতে সন্দেহ হচ্ছে। এখানকার আবহাওয়া আর অসুখবিসুখ তাকে কাবু করে ফেলছে। সূর্য, চন্দ্র আর আগুনের অধিবাসীর একজন পুত্রের কি পরিণতি হয়েছে, এই ঠাণ্ডা, রুক্ষ দেশে অরাজক উপজাতিদের সাথে লড়াই করার জন্য তাকে দণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে। এমন একজন সম্রাট এই দণ্ডাদেশ দিয়েছেন, যাকে তিনি কখনও ভালোবাসেন নি, শুধু নিজের স্বার্থ বা সুবিধার কারণে তাঁর কাজ করছেন। অথচ তাকে এখানে ফেলে রেখে তিনি নিজে দিল্লি চলে গেছেন। হয়তো দেবতারা তাকে এই শাস্তি দিয়েছেন, কেননা শাহজাহান জীবিত থাকতেই তিনি আওরঙ্গজেবের প্রতি আনুগত্য দেখিয়েছেন। তবে সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার হল তিনি অনুভব করতেন যে, সম্রাট তাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করেন না–তবে তার মানে এই নয় যে সম্রাট কাউকে বিশ্বাস করেন। আর বিশেষত যশবন্তের নিজের জাতি বা ধর্মের কাউকেই বিশ্বাস করেন না।
