‘পরেরবার আমাদের শত্রুরা গুলি ছোঁড়ার সময় যেসব জায়গা থেকে ধোঁয়া বের হয়েছিল, সেদিকে লক্ষ্য করে বাবা আমাদের বন্দুকধারী সেনাদেরকে গুলি ছুঁড়তে বললেন। উপরে উঠে শত্রুপক্ষের গতিবিধি সম্বন্ধে তথ্য সংগ্রহ করার জন্য তারপর তিনি চারজন গুপ্তদূতকে খাড়া পাহাড়ের গা বেয়ে উঠতে বললেন। যাইহোক ওরা পাথুরে পাহাড়ের গায়ে পা রাখার জায়গা খুঁজে কোনোমতে উঠার চেষ্টা করতেই উল্টোদিকের চূড়া থেকে আবার গুলি বর্ষণ হল। দুইজন দুই হাত দুই দিকে ছুঁড়ে নিচে পড়ে গেল। একজন নিচে গিরিপথের পাথুরে পথে পড়ে গিয়ে মাথা ফাটাল। অন্যজনের দেহটি পাহাড়ের পাথুরে গা বেয়ে গড়িয়ে নিচে পড়ে স্থির হয়ে রইল। আমার বাবা চিৎকার করে বাকি গুপ্তদূতদের ফিরে আসতে বললেন, তারপর রক্ষীবাহিনীর বাকি সদস্যদের পিছু হটে বাঁক পেরিয়ে নিরাপদে অবস্থান নিতে বললেন। তারপর তিনি আমার কাছে এসে বললেন দ্রুত ছুটে গিয়ে আপনাকে খবরটা জানাতে। ‘ওখানে কয়জন হামলাকারী আছে?’
‘আমি ঠিক জানি না। তবে এক একবার গুলিবর্ষণের সময় মনে হয়েছিল একসাথে অনেক গাদা বন্দুক ব্যবহার করা হয়েছিল। আর প্রত্যেকবার বিশ থেকে ত্রিশজন মানুষ কিংবা ঘোড়া আহত হয়ে পড়ে গিয়েছিল। যে দূরত্ব থেকে হামলাকারীরা গুলি ছুঁড়ছিল তাতে আমার ধারণা, দশটির মধ্যে একটা গুলি লক্ষ ভেদ করার কথা। সে হিসেবে শত্রুর সংখ্যা তিনশোর কম হবে না।’
‘তুমি যা বললে, তাতে আমার মনে হচ্ছে সংখ্যাটা আরো বেশি হবে। গিরিপথটি ওরা বন্ধ করে দিয়েছে?
‘আমারও তাই মনে হয়। এখানে আসার ঠিক আগে আমি একজন সেনাকে উপরে উঠে দেখতে বলেছিলাম। সে উপরের ঢাল থেকে চিৎকার করে জানাল সামনের আরেকটি বাঁকের কাছে পথের উপর গাছের গুঁড়ি-ডালপালা আর বড় বড় পাথর ফেলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে রাখা হয়েছে। তবে তার দেখার ভুলও হতে পারে।
‘আমার তা মনে হয় না।’ এই কথাটি বলে আওরঙ্গজেব থেমে কিছুক্ষণ ভাবলেন। অজানা সংখ্যক তবে যথেষ্ট পরিমাণে হামলাকারী আর সামনে যাওয়ার রাস্তা বন্ধ থাকার অবস্থায় পিছু হটাই এখন বুদ্ধিমানের কাজ হবে। তিনি তরুণটিকে বললেন, তুমি তোমার বাবার কাছে ফিরে যাও। তাকে বল পিছু হটে আসতে। তারপর সম্রাট তার দেহরক্ষীদেরকে বললেন, সৈন্যসারি ধরে পেছনে গিয়ে অন্য অধিনায়কদেরকে বল পেছনে ফিরে যেতে, তবে সতর্ক করে দেবে ওরা যেন সামনে আর পেছনের দলের সাথে সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করে শৃঙ্খলা মেনে চলে। সেনাদলের কোনো অংশ যেন অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়ে পড়ে।
*
সেদিন সন্ধ্যায় গিরিপথের ঢোকার মুখে একটি সমতল জায়গায় তবু স্থাপন করা হল। আগুন জ্বালাবার পর আওরঙ্গজেব একটি সমরসভা ডেকে অধিনায়কদের আসার অপেক্ষা করছিলেন। যেরকম আশা করা হয়েছিল, সেনা প্রত্যাহার সেরকম হলেও তিনি প্রায় একশো সেনা হারিয়েছিলেন। বেশিরভাগ পাহাড়ের উপর থেকে গাদা বন্দুকের গুলি লেগে নিহত হয়েছিল। এছাড়া হঠাৎ দু একজন উন্মত্ত হামলাকারী চিৎকার করতে করতে তাদের লুকোনো জায়গা থেকে বের হয়ে আফগান তলোয়ার হাতে সৈন্যদলের উপর হঠাৎ হামলা করেছিল। কয়েকজনকে হতাহত করার পর ওরাও যথারীতি নিহত হল।
ইউসুফ খানের নেতৃত্বে অগ্রগামী বাহিনীর শেষদলটি যখন গিরিপথ থেকে বের হয়ে আসছিল, তখন তিনটি ঘোড়া গিরিসঙ্কট ধরে ওদের দিকে ছুটে আসছিল। প্রতিটি ঘোড়ার জিনের উপর সবুজ পোশাকপরা মোগল সৈন্যের দেহ শোয়া অবস্থায় ছিল। ওদের হাত-পা একসাথে ঘোড়ার পেটের সাথে রশি দিয়ে বাঁধা ছিল। ইউসুফ খানের সেনারা রশি কেটে দেহগুলো আতঙ্কিত ঘোড়াগুলোর পিঠ থেকে নামিয়ে দেখতে পেল ওরা তাদেরই লোক, প্রথম আক্রমণের সময় যাদের ঘোড়াগুলো সামনের দিকে ছুটে গিয়েছিল। ওদেরকে ভয়ঙ্করভাবে বিকলাঙ্গ করা হয়েছে। একজনের লিঙ্গ কেটে তার মুখে পুরে দেওয়া হয়েছে। অন্য দুজনের চোখ খুবলে নেওয়া হয়েছে, নাকের ছিদ্র কেটে ফাঁক করে দেওয়া হয়েছে আর কান আর জিহ্বাও কেটে নেওয়া হয়েছে। মৃতদেহগুলোর সাথে কোনো বার্তা ছিল না, তবে এর অর্থ পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে। এই পাহাড়ি এলাকার বন্য মানুষের মাঝে মোগল আইন চলবে না।
সেনাপতিরা এগিয়ে আসছিলেন। সবার আগে ছিলেন মারওয়ারের শাসক, রাজা যশবন্ত সিং। কমলা রং-এর যুদ্ধবেশপরা তার একজন যোদ্ধা আগে আগে একটি অগ্নিশিখার প্রতীক সম্বলিত পতাকা বয়ে নিয়ে আসছিল। তাকে দেখার সাথে সাথে আওরঙ্গজেবের আরেকজন রাজপুত সেনাপতি–আম্বারের অশোক সিং-এর কথা মনে পড়ে গেল। কয়েকবছর আগে যখন বলখ আর সমরকন্দের বিরুদ্ধে যুদ্ধাভিযান হয়েছিল, তখন একই রকম পরিস্থিতিতে সেনা প্রত্যাহার করার নির্দেশ তিনি অমান্য করেছিলেন। বরং তিনি এবং তার অনেক সৈন্য অদ্ভুত এক ধারণার বশবর্তী হয়ে নিজেদের সম্মান রাখার উদ্দেশ্যে শত্রুর বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে প্রাণ দিয়েছিলেন।
যেসব অঞ্চল সরাসরি মোগল শাসনে রয়েছে, কেবল সেসব জায়গার আওরঙ্গজেব হিন্দু প্রজাদের উপর বিভিন্ন ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করেছিলেন। তার অধীনস্থ সামন্ত রাজ্যগুলো এর আওতার বাইরে ছিল। এর মধ্যে অন্যতম ছিল রাজস্থান, যারা আগের নিয়মেই চলতো। দূরদর্শিতা দেখিয়ে তিনি এই পদক্ষেপটি নিয়েছিলেন, তবে সব সময়ের জন্য নয়। সময় সুযোগ এলে তিনি এই তেজস্বী রাজপুতদের উপরেও তাঁর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করবেন। দীর্ঘদিন থেকে এদের উপর তার আস্থা নেই। এদের পরিবর্তনশীল ব্যক্তিত্বের তল পাওয়া বেশ কঠিন। কেননা এদের মৃত্যু অথবা বিজয়’–এই কৌশলটি সামরিক বা যুদ্ধবিদ্যা সংক্রান্ত কৌশলের সাথে খাপ খায়। আর ওদের কুফরি ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে বলার কিছুই নেই, এদের ধর্মীয় প্রথানুযায়ী নারীরা স্বামীর সাথে জলন্ত চিতার আগুনে ঝাঁপ দিয়ে প্রাণবিসর্জন দেয়।
