আওরঙ্গজেব উঠে দাঁড়িয়ে নববধূ আর বরকে শেষবারের মতো দোয়া করে হাস্যোজ্জ্বল অতিথিদের মধ্য দিয়ে হেঁটে বিয়ের আসর থেকে বের হয়ে গেলেন। খাওয়া-দাওয়া আর আনন্দ উৎসবের মধ্য দিয়ে বিয়ের আসর অনেক রাত পর্যন্ত চলবে। তাকে এখন অনেক জরুরি বিষয় নিয়ে ভাবতে হবে। পেশোয়ার থেকে তাঁর সুবেদার খবর পাঠিয়েছে যে, পারস্যের শাহ-এর কাছ থেকে অস্ত্রশস্ত্র পেয়ে উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের বিদ্রোহীরা দিন দিন আরো শক্তিশালী আর অবাধ্য হয়ে উঠেছে। সব সময়ের মতো মোগল সাম্রাজ্যের ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে ওরা মোগল সাম্রাজ্য এলাকার ভেতরের গ্রামগুলোর উপর আক্রমণ চালিয়ে ধূলিসাৎ করছে আর শান্তিপ্রিয় বণিকদের কাফেলার উপরও লুটপাট চালাচ্ছে।
শীঘ্রই তাঁকে আবার সামনে থেকে সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে যুদ্ধাভিযানে বের হতে হবে। তবে আল্লাহর ইচ্ছায় এবার তিনি ভালোবাসা ও সহমর্মিতার বন্ধনে ঐক্যবদ্ধ একটি রাজপরিবার রেখে যাচ্ছেন। তাঁর সিংহাসনে আরোহণের পর থেকে যে কোনো সময়ের তুলনায় এবারই প্রথম ওরা এরকম একতাবদ্ধ। হয়েছেন। এই বিয়েটি এই একতার একটি জোরালো প্রতীক হয়ে থাকবে।
০৬. উত্তরের দস্যুদল
আওরঙ্গজেব চাদর টেনে তুলে নাক-মুখ ঢাকলেন। উত্তর দিক থেকে বয়ে আসা দমকা হাওয়ার সাথে ধূলি আর কাঁকর চাবুকের মতো মুখে এসে পড়ছিল। পারস্যের সহায়তায় আফগান এলাকায় যে বিদ্রোহ চলছে, তা দমন করার জন্য তিনি সেনাবাহিনী নিয়ে অমসৃণ পাহাড়ের মধ্য দিয়ে চলে যাওয়া একটি গিরিপথ দিয়ে সামনে এগোচ্ছিলেন। অন্তত এখনকার মতো তিনি পাঞ্জাবের লড়াকু শিখদের হুমকি শেষ করে এসেছেন। তাদের প্রধান নেতা তেগবাহাদুর এখন দিল্লিতে তাঁর লাল কেল্লার মূল ফটকের শোভাবর্ধন করছে। অবশ্য এখনও বাকি আছেন শিবাজি। তবে জানমালের প্রচুর ক্ষয়ক্ষতির পরও মোগল সেনারা মারাঠিদের হুমকি-ধামকি দাক্ষিণাত্যের মাঝে সীমিত করে রেখেছে।
ধূলিময় বাতাস বেশ ঠাণ্ডা ছিল, আওরঙ্গজেব পশমি আলখাল্লাটা শক্ত করে গায়ে জড়িয়ে নিলেন। এসময় মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা পূর্বপুরুষ বাবরের কয়েকটি কথা তার মনে পড়লো, যা তিনি ছোটবেলায় পড়েছিলেন। হিন্দুস্তানের গরমের প্রতি অপছন্দ আর ওক্সাস নদীর ওপারে তাঁর নিজদেশ ফারগানার শীতল পর্বত আর বরফে ঢাকা নদীর জন্য তাঁর আকুলতার কথা বাবর লিখেছিলেন। সেই তখনকার দিনে কি সুদীর্ঘ পথ মোগলরা পাড়ি দিয়েছিলেন… তারপর কিরকম বদলে গেলেন। রুক্ষ, হাওয়ায় উড়িয়ে নেওয়া এই পাহাড়গুলো যেমন তাঁর কাছে ভিনদেশী মনে হচ্ছিল, ঠিক তেমনি দেড়শো বছর আগে হিন্দুস্তানের উষ্ণ সমতলভূমিও বাবরের কাছে তাই মনে হয়েছিল।
তন্ময় হয়ে আওরঙ্গজেব এসব ভাবছিলেন, তারপর হঠাৎ বাস্তবে ফিরে এসে দেখলেন তাঁর সামনের ঘোড়সওয়ারীদের চলার গতি ধীর হয়ে এসেছে। আরো সংকীর্ণ দুই ধার উঁচু একটি গিরিপথে ঢোকার চেষ্টা করতে গিয়ে ওরা একে অপরের সাথে ধাক্কাধাক্কি শুরু করেছে। এই গিরিপথটিতে চারজনের বেশি অশ্বারোহী চলার মতো জায়গা নেই। আধঘণ্টা পর তাদেরকে অনুসরণ করে যখন তিনি রাজকীয় হাতির পিঠে চড়ে ছায়াঘেরা গিরিপথের মাঝে ঢুকলেন– সেনাবাহিনীর পূর্বেকার বিন্যাসে ফিরে আসার জন্য একটু সময় লেগেছিল আর অগ্রগামী দলটিও তাঁর আগে প্রায় এক মাইল দূরে চলে গিয়েছিল। মাঝখানে একা পড়ে গিয়ে আওরঙ্গজেব একটু শীতলতা অনুভব করলেন। উপরের দিকে তাকিয়ে দেখলেন পাথর আর ছোট ছোট নুড়িপাথরে ঢাকা পাহাড়ের চূড়ার আড়ালে শরতের সূর্য ঢাকা পড়েছে। একচিলতে যে আকাশ দেখা যাচ্ছিল সেখানে হঠাৎ প্রচণ্ড চিৎকার করতে করতে কতগুলো কালো প্যাচা এসে অন্ধকারে ঢেকে দিল। একটি মুহূর্ত তার মনে হল উপরের পাথরের মাঝে কিছু একটা নড়াচড়া করছে। ওটা কি গাদা বন্দুকের গুলি চালানোর ক্রমাগত পট পট শব্দ? নাকি শুধু ছুটে চলা মেঘ ছায়া সৃষ্টি করেছে আর অনেক দূরে বাজ পড়ার মৃদু গুড়গুড় শব্দ? তারপর হঠাৎ তার সমস্ত দেহরক্ষী তাকে চারপাশ থেকে ঘিরে তাদের ঘোড়ার রাশ টেনে ধরলো। ঘোড়াগুলো তখন মৃদু হেষাধ্বনি করে বিপদসঙ্কেত দিল।
সামনে কি হয়েছে দেখার জন্য আওরঙ্গজেব তার দেহরক্ষীবাহিনীর একজন সেনা কর্মকর্তাকে বলতে যাবেন, এমন সময় তিনি একটি চিৎকার শুনতে পেলেন, “আমার পথ ছাড়। আমাকে জাঁহাপনার কাছে গিয়ে খবর পৌঁছাতে হবে। তারপর দেখলেন সামনের একটু হট্টগোলের মধ্য থেকে একজন তরুণ অশ্বারোহী বেরিয়ে এসে তাঁর সামনে দাঁড়ান দেহরক্ষীদের সারির সামনে থামলো। আওরঙ্গজেব আদেশ করলেন, “ওকে আসতে দাও। সাথে সাথে দেহরক্ষীরা দুপাশে সরে দাঁড়াল। একমুহূর্ত পর তিনি হাত তুলে তরুণটিকে প্রথানুযায়ী সম্রাটকে কুর্ণিশ করা থেকে বিরত করে বললেন, ‘ঐসব লৌকিকতা এখন থাক। সামনে কি হয়েছে? কেউ হামলা করেছে?
‘হা জাহাপনা। আমার বাবা ইউসুফ খান আজ অগ্রগামী দলের নেতা। সামনের বাঁক ঘুরে গিরিপথের সবচেয়ে সংকীর্ণ পথে ঢুকতেই পাহাড়ের চূড়া থেকে একপশলা গুলিবৃষ্টি হল। সামনের সারির কয়েকজন ঘোড়সওয়ার ঘোড়ার উপর থেকে পড়ে গেল। আমার মনে হয় দু-তিনজন আহত হয়েছিল–ওদের ঘোড়াগুলো ভয় পেয়ে সওয়ারিসহ দ্রুত গিরিপথের উপরের দিকে কিছুটা পথ ছুটে গেল। আমার বাবা দলের পরবর্তী সারির রক্ষী সেনাদেরকে ঘোড়া থেকে নেমে আক্রমণ মোকাবেলা করার জন্য প্রস্তুত হতে বললেন। বিশেষত তিনি বরকন্দাজদের বললেন গাদা বন্দুকে গুলি ভরে প্রস্তুত হতে। গুলিগুলো কোথা থেকে এসেছিল তা দেখার জন্য তারপর আমরা উপরের দিকে তন্ন তন্ন করে খুঁজলাম। তবে কাউকে দেখা গেল না–তারপর হামলাকারীরা দ্বিতীয়বার গুলিবর্ষণ করে আমাদের কয়েকজনকে হতাহত করলো। হট্টগোলের মধ্যে আরো কয়েকটা ঘোড়া ছুটে পালাল।
