আওরঙ্গজেব নির্দেশ দিলেন, তার দেহটি নিয়ে যেসব শহর আর গ্রাম সে দখল করেছিল সেসব জায়গায় ঘুরিয়ে দেখাও। প্রত্যেক জায়গায় একজন করে সতনামি বন্দীকে কোতল করবে আর লাশগুলো শিকলে বেঁধে ফেলে রাখবে পচার জন্য, যাতে কারও মনে সন্দেহ না থাকে যে ওরা মারা গিয়েছে আর তার অনুসারীরা যে কোনো মানুষের মতোই মরণশীল। তারপর মাহুতের দিকে ফিরে বললেন, ‘হাতি ঘুরাও। আমরা এখন দিল্লি ফিরে যাবো। সন্ধ্যার অন্ধকার পথ দিয়ে হাতি চলা শুরু করতেই তিনি সামনে যে কাজগুলো বাকি আছে সেগুলোর কথা ভাবতে শুরু করলেন পাঞ্জাবে শিখ বিদ্রাহীদের দমন করতে হবে, শিবাজি দক্ষিণে ধীরে ধীরে তার শক্তি সংহত করছে, তাকে আবার ধরতে হবে, আর সাম্রাজ্যের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে পারস্যের সহায়তায় উচ্ছশৃঙ্খল উপজাতিরা যে বিদ্রোহ শুরু করেছে তাও দমন করতে হবে। এতকিছু ভাবনার পরও সেই মহিলার কথাগুলো তাঁর মাথায় তখনও প্রতিধ্বনিতৃ করছিল। যতই তিনি নিজেকে মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন যে, ঐ মহিলাটি একজন বিকৃতমস্তিষ্ক কাফের আর তিনি একজন বিচার বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ এবং এমন একটি ধর্মের অনুসারী যেখানে এই ধরনের অভিশাপের কোনো স্থান নেই, তারপরও তাঁর মন থেকে কথাগুলো চলে যাচ্ছিল না।
*
সিফিরকে দেখে একটু অস্থির মনে হচ্ছিল, বিয়ের মুকুটের নিচে তার চোখে সতর্ক দৃষ্টি দেখা যাচ্ছে। তাকে নিরীক্ষণ করে আওরঙ্গজেব ভাবলেন, দীর্ঘ বারো বছর গোয়ালিয়রের দুর্গে আটক থাকার পর তাঁর ভ্রাতুষ্পত্রের একটু সন্ত্রস্ত থাকাটাই স্বাভাবিক। লাল কেল্লায় মূল ময়দানে বিয়ের অনুষ্ঠান তখন শেষ পর্যায়ে চলে এসেছে। সিফিরের চৌকোণা চওড়া কপাল আর মুখের সাথে তার বাবা দারা শিকোহর চেহারার কোনো মিল নেই। অথচ তার বোন জানির সাথে তার বাবার বেশ মিল রয়েছে। হয়তো সে তার প্রয়াত মা নাদিরার মতো দেখতে হয়েছে। আওরঙ্গজেব ভ্রু কুঁচকালেন। অনেক চেষ্টা করেও তিনি নাদিরার কথা কিছুই মনে করতে পারলেন না, শুধু এটুকু মনে পড়লো যে, তাঁর ভাই সবার চেয়ে তাঁকেই বেশি ভালোবাসতেন আর যখন তিনি আর দারা তাঁর সেনাদলের তাড়া খেয়ে পালাচ্ছিলেন, তখন পালাবার সময় পথেই তিনি মৃত্যু বরণ করেন।
এই বিয়ের ধারণাটিও জাহানারার মাথা থেকে এসেছিল। তিনি আওরঙ্গজেবকে বুঝিয়ে বলেছিলেন, বন্দী সিফিকে গোয়ালিয়র দুর্গ থেকে মুক্ত করে তাকে বিয়ে করার অনুমতি দিয়ে তুমি আবার সবার কাছে প্রমাণ করবে যে, আমাদের পারিবারিক কলহের দিনগুলোর অবসান হয়েছে। আর আমাদের মধ্যে যদি কেউ আবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু করতে চাইলেও, এই বিয়ে তা অনুৎসাহিত করবে। তবে এই সিদ্ধান্তটি নিতে আওরঙ্গজেব বেশ লম্বা সময় নিলেন। দারার অনেক সমর্থক এখনও রয়েছে। তাঁর সাম্রাজ্যের মধ্যে অনেকেই তাঁকে হটিয়ে দারার একমাত্র জীবিত ছেলেকে সিংহাসনে বসাবার ষড়যন্ত্র করতে পারে। মোগল রাজবংশের মাঝে যে বিভক্তি হয়েছে তার অবসান ঘটাবার জন্য তিনি যে যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন, তা জাহানারাকে দেখাবার জন্য তিনি ভারসাম্য বজায় রেখে ইচ্ছার বিরুদ্ধে সিফিরকে মুক্ত করার ঝুঁকি নিলেন। অবশেষে অনেক ভেবে একটি উপায় বের করলেন, যাতে জাহানারার ইচ্ছা পূরণের সাথে সাথে তাঁর নিজের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা যায়। যদিও সিফিরকে গোয়ালিয়র ফিরে যেতে হবে না, তবে সে সম্পূর্ণ স্বাধীনতাও পাবে না–অন্তত এখুনি নয়। নববধূকে নিয়ে সে বরং দিল্লির যমুনা নদীর সেলিমগড় দ্বীপে থাকবে। আরাম আয়াসেই জীবন কাটাবে আর কোনো কিছুর অভাব হবে না, তবে বাইরের পৃথিবীর সাথে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকবে আর গুপ্তচরেরা সবসময় তার উপর নজর রাখবে।
রুপালি সুতা দিয়ে বোনা ঝিকমিক করা বিয়ের ঘোমটায় ঢাকা দীর্ঘাঙ্গি যে তরুণীটি সিফিরের পাশে বসে রয়েছে, সে আওরঙ্গজেবের নিজেরই মেয়ে জুবদাতুন্নেসা। সম্রাট আকবরের সময় থেকে শুরু করে এই প্রথম একজন মোগল সম্রাটের মেয়ের বিয়ে হল। অবশ্য এটিও জাহানারার কারণেই হয়েছে। তিনি যুক্তি দেখিয়ে বলেছিলেন, এটা ঠিক নয় যে, একজন সম্রাটের মেয়ে বিয়ে করতে পারবে না? স্বামী-সন্তানের সুখ থেকে কেন তাদেরকে বঞ্চিত করা হবে?’ আওরঙ্গজেব অনুভব করলেন, এই কথাগুলো রওশনআরার মৃত্যুর ঠিক আগের কথাগুলো প্রতিধ্বনি করছে। তিনি জাহানারার চোখে বেদনার আভাস দেখতে পেলেন–সেটা নিজের জন্য কিংবা রওশনআরার জন্য কিংবা হয়তো উভয়ের জন্যই হতে পারে।
সিংহাসনের সম্ভাব্য দাবিদার প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্ম সীমিত করার জন্য সম্রাট আকবর যে নিয়ম প্রচলিত করেছিলেন, এযাবত তিনি তা নিয়ে কখনও প্রশ্ন তুলেন নি। তবে এই মোল্লারা তাঁকে জানালেন যে, কোরআনে এর কোনো ভিত্তি নেই। তাছাড়া তিনি দেখলেন যে, এটি যৌন অপরাধ উৎসাহিত করতে পারে। রওশনআরা তার যৌনাচারের কারণ হিসেবে একেই দায়ী করেছিলেন। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হচ্ছে, সম্ভবত এই নিয়মটি এর উদ্দেশ্য সাধনে ব্যর্থ হয়েছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম রাজবংশের ভেতরে যে সংঘাত চলেছে, এটি তা প্রতিরোধ করতে পারে নি। বিষয়টি নিয়ে অনেক বিবেচনা করে তিনি নিশ্চিত হলেন যে, আবেগ নির্ভর এবং অযৌক্তিক আইন দিয়ে সাম্রাজ্যের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা যাবে না। সাম্রাজ্য দৃঢ়ভাবে টিকিয়ে রাখার সর্বোত্তম এবং একমাত্র উপায় হচ্ছে ধর্মীয় শিক্ষার উপর ভিত্তি করে সরকার ও পরিবার, উভয়ের উপর কঠোর এবং অটল নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা। তাঁর অনেক পূর্বপুরুষ তাদের জীবনের পরবর্তী বছরগুলোতে দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন–মদ, আফিম এমনকি মেয়ে-মানুষে মজে গিয়ে এদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সাম্রাজ্য শাসন করেছিলেন। অথচ তাদের উচিত ছিল নির্মমভাবে নিজেদের কর্তৃত্ব ঘোষণা করা। তিনি সে ভুলটি করবেন না। রাজত্বের শুরুতে তিনি যেরকম কঠোর হাতে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন, শেষেও সেরকম নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবেন। কাজেই তাঁর মেয়েদের বিয়ে হলে তিনি সেরকম কোনো হুমকির আশংকা করেন না।
