চুপ কর!’
না, আমি চুপ করবো না! আপনি মনে করেন আমি আপনাকে ভয় পাই? যে মানুষ তার নিজের ভাইদের হত্যা করেছে আর তাঁর ছেলেদের কাছ থেকে সম্মান আদায় করতে পারে নি? আমি জানি আকবর আপনার সম্পর্কে কি ভাবেন তিনি আমাকে প্রায়ই বলতেন। তিনি বলতেন কিভাবে আপনি আপনার ঈশ্বরের নামের দোহাই দিয়ে আমার স্বধর্মের লোকদের বিরুদ্ধে প্রতিটা বিদ্বেষপূর্ণ আচরণের বিশ্বাসযোগ্যতা দেখিয়েছেন। আকবর জানেন আপনি কি তিনি আপনাকে একজন “বক ধার্মিক” বলতেন, যা এখন আমিও বলছি! আর তার মতো আমিও আপনাকে আর আপনার সাথে আর যারা নোংরা কাজগুলো করে তাদের সকলকে ঘৃণা করি। পরবর্তী জীবনে আপনি এমনকি একটি কীট কিংবা ইঁদুর নন বরং একটি মাছি কিংবা একটি পরজীবী কীট…’
আওরঙ্গজেব উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, যথেষ্ট হয়েছে! আমি অনেকক্ষণ তোমার প্রলাপ শুনলাম। জল্লাদ তোমার কাজ শুরু করে দাও। সম্ভাজিকে দিয়ে শুরু কর, ধীরে সুস্থে সময় নিয়ে কর। তবে তার শরীরের যে অঙ্গই প্রথমে কাটো, জিহ্বাটা শেষ পর্যন্ত রেখে দিও। এটা শেষ হওয়ার আগে সে আমাকে বলবে আমি যা জানতে চাই। তারপর আমি তোমাকে বলবো এটা কেটে ফেলতে, যাতে তার দয়াভিক্ষা আমাকে শুনতে না হয়!
দুজন প্রহরী সম্ভাজির দুইবগলের নিচে হাত দিয়ে তাকে টানতে টানতে মঞ্চের দিকে নেওয়া শুরু করতেই তিনি চিৎকার করে উঠলেন, আমি কখনও আপনার কাছে ক্ষমাভিক্ষা করবো না বরং তার আগে আমি আমার জিহ্বা কামড়ে ছিঁড়ে ফেলবো।’ মঞ্চে তাকে ফেলে দেওয়ার পর সম্রাটের কাছ থেকে ইঙ্গিত পেয়ে সবার সামনে দাঁড়ান একজন জ্যেষ্ঠ সেনাপতি এবার সামনে এগোলেন। তার হাতে একটি লম্বা কাগজের টুকরা ছিল। তিনি বেশ জোরে কাগজটি থেকে পড়তে শুরু করলেন, যাতে সবাই শুনতে পারে।
সম্ভাজি, তুমি একজন খারেজি বিশ্বাসঘাতক। তুমি সম্রাট আওরঙ্গজেব আর তাঁর প্রজাদের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করেছ। তোমার অপরাধের কারণে নিষ্পাপ মানুষের রক্ত ঝরেছে। তোমার মৃত্যুর আগে তোমাকে তোমার অপরাধের জবাবদিহি করতে হবে আর আমি যা যা প্রশ্ন করবো তার উত্তর দিতে হবে। উত্তর দিতে তুমি যত দেরি করবে ততই তোমার কঠোর শাস্তির যন্ত্রণা বেড়ে যাবে।
‘আমি অপরাধি নই, আমি একজন দেশপ্রেমিক। আমি কোনো কথার উত্তর দেব না!
সেনাপতি বললেন, ঠিক আছে। তারপর তিনি মাথা নাড়তেই জল্লাদ সম্ভাজির ক্ষীণদেহের দিকে এগোল। তিনি ততক্ষণে কোনোমতে দুপায়ের উপর খাড়া হয়েছেন। সঙের জামার কলার বাম হাতে ধরে জল্লাদ তাকে টেনে তুলে ডান হাতে তার পেটে একটি ঘুষি চালাল। তাকে ধরে না রাখলে সম্ভাজি মাটিতে লুটিয়ে পড়তেন। জল্লাদের বজ্রমুষ্টিতে ধরে থাকা অবস্থায় তিনি একটা ভাঙ্গা পুতুলের মতো দুলতে লাগলেন। তারপর আবার ঘুষি মারতেই সম্ভাজি রক্তবমি করতে শুরু করলেন।
‘প্রথম প্রশ্ন। মারাঠিদের মূল ধনাগার কোথায়? আমরা জানতে পেরেছি ছয়মাস আগে তুমি প্রচুর পরিমাণে সোনা আর রত্ন নতুন একটা জায়গায় স্থানান্তর করেছ।’
সম্ভাজি হাঁপাতে হাঁপাতে কোনোমতে উত্তর দিলেন, “আমি কখনও তোমাদেরকে তা জানাব না আর তোমরা কখনও তা খুঁজে পাবে না।’
‘আবার প্রশ্নটা করছি। ধনরত্ন কোথায় রেখেছ?
‘তুমি নিশ্চয়ই কালা। শোননি আমি কি বলেছি?
সেনাপতি এবার মাথা নাড়তেই জল্লাদ সম্ভাজিকে ছেড়ে দিতেই তিনি মঞ্চে টলে পড়ে গেলেন। তারপর তার উপর ঝুঁকে জল্লাদ ছুরির কয়েক পোচে তার দেহ থেকে নোংরা পোশাকটা কেটে ফেলে দিল। সম্ভাজির তারের মতো শক্তিশালী এবং পাকানো শরীরের কয়েক জায়গায় লড়াইয়ের কয়েকটি ক্ষত চিহ্ন ছিল। তার বুকের বাম পাশ থেকে পেটের উপর দিয়ে কুচকি পর্যন্ত একটি লম্বা কাটা দাগের চিহ্ন ছিল। বাম দিকের উরুর নিতম্ব থেকে হাটু পর্যন্ত আরেকটি দাগ ছিল। জল্লাদ তার চুল ধরে তাকে টেনে তুলে কাঠের কাঠামোর দিকে নিয়ে চললো। কাঠামোটির চার মাথায় তার দুই পা আর হাত দুই দিকে ছড়িয়ে শক্ত করে বেঁধে দিল।
সেনাপতি আবার প্রশ্নের তালিকা দেখে বললেন, “আমরা জানতে পেরেছি তুমি রাজদরবারের কয়েকজন সভাসদকে ঘুষ দেবার চেষ্টা করেছিলে। কাদের সাথে তোমার যোগাযোগ হয়েছিল? এবার তার কণ্ঠস্বর পরিষ্কার এবং কর্তৃত্বব্যঞ্জক শোনাল।
সম্ভাজি আবার হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, “আওরঙ্গজেবকে এক পয়সা দিয়ে হিন্দুস্তান ছেড়ে চলে যাওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলাম।’
তৃতীয়বার সেনাপতির ইঙ্গিত পেয়ে জল্লাদ কাঠের বেঞ্চের কাছে এগোল এবং ধীরে সুস্থে একটা পাতলা ধারাল ফলার ছুরি বেছে নিল। তারপর সম্ভাজির পেছনে গিয়ে একজন শল্য চিকিৎসকের দক্ষতা নিয়ে তার মেরুদণ্ড বরাবর ছুরিটা একবার লম্বালম্বিভাবে আরেকবার আড়াআড়িভাবে চালাল। রক্তের একটি ছোট নদী বইতে শুরু করতেই সম্ভাজির শরীর মুচড়ে উঠলো, তবে কোনো চিৎকার করলেন না। তারপর জল্লাদ এবার ছুরির কোনো বদলে পিঠের নিচে যে জায়গায় কাটা অংশগুলো মিলেছে সেখানে ছুরির ডগাটি ধীরে ধীরে ঢুকিয়ে দিল। তারপর সে কাস্তে চালাবার ভঙ্গিতে মাংসপেশি আর চর্বি থেকে তার শরীরের চামড়া ছিলতে শুরু করলো। অবশেষে সম্ভাজি প্রচণ্ডভাবে একবার আর্তচিৎকার করে উঠলেন।
প্রায় নয় ইঞ্চি লম্বা আর তিন ইঞ্চি চওড়া চামড়ার একটি ফালি তুলে নেবার পর জল্লাদ আবার সেনাপতির দিকে তাকাল। তিনি আবার মোগল দরবারের ষড়যন্ত্রকারীদের নাম জানতে চাইলেন। তবে যেভাবে তার শরীর ঝুলে পড়লো, তাতে পরিষ্কার বুঝা গেল সম্ভাজি জ্ঞান হারিয়েছেন। জল্লাদ তার গায়ে এক বালতি ঠাণ্ডা পানি ঢেলে দিতেই তিনি চমকে উঠে জ্ঞান ফিরে পেলেন। আবার প্রশ্নকর্তা তাকে প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করলেন, তবে সম্ভাজি কেবল মাথা নাড়লেন।
