*
ক্যাটক্যাটে উজ্জ্বল রঙের ডোরাকাটা পোশাক আর মাথায় ডগাচোখা টুপিপরা লোক দুটির চারপাশে মাছি ভনভন করছিল। একটা রোগা উটের পিঠে ওদেরকে বেঁধে রাখা হয়েছিল, উটটি ধীরে ধীরে চলছিল। দূর দিগন্তে বাহাদুরগড় দুর্গের বুরুজ দেখা যাচ্ছে। আওরঙ্গজেব সেখানে বন্দীদের জন্য অপেক্ষা করছেন। একমুহূর্ত একজন বন্দী মাথা তুলে সামনে তাকাল, তারপর আবার তার মাথা বুকে ঝুলে পড়লো। বন্দীদের কি করা হবে সে সম্পর্কে। আওরঙ্গজেবের পরিষ্কার নির্দেশ ছিল। যদি কেউ উদ্ধার অভিযান চালাবার চেষ্টা করে, সেজন্য প্রথম দুদিন যতক্ষণ না কামরান বেগ তার লোকজনসহ সংঘামেশ্বর আর মারাঠি এলাকা থেকে বের হয়ে না আসবে, ততদিন ওরা। রাতে চলবে আর বন্দীদেরকে কাফেলার মাঝে লুকিয়ে রাখবে। তবে তৃতীয়দিন মোগল এলাকায় ঢোকার পর সাথে সাথে সরাসরি সম্রাটের কাছে না এনে সম্ভাজি আর কবি-কুলেশকে রাজদরবারের অবহেলা আর ঘৃণার পাত্র সাজিয়ে সঙের পোশাক পরিয়ে গ্রামের মধ্য দিয়ে নিয়ে আসবে। তারপর তার কাছে বাহাদুরগঁড়ে নিয়ে আসবে।
এছাড়া আওরঙ্গজেবের নির্দেশ বন্দীদেরকে কামরান বেগ কোনো খাবার দেয় নি, কেবল রোজ এক পেয়ালা পানি দিয়েছিল। এতক্ষণে তাদের ঠোঁট ফেটে গিয়ে শুকনো হয়ে রয়েছে আর অনেক সময় দেখে মনে হচ্ছিল ওরা জ্ঞান হারিয়ে ফেলছিল। তবে যত অপমানই করা হোক না কেন ওরা নির্বিকার রইল। দুই ঘণ্টার পর কাফেলাটি দুর্গের প্রধান তোরণের নিচ দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই নাকাড়া বেজে ওদেরকে অভিবাদন জানান হল। কামরান বেগ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। তার অভিযান শেষ হয়েছে। সে সফল হয়েছে। লোকজনসহ চারকোণা উঠানে ঢুকতেই দেখলো শেষ মাথায় একটি বড় কাঠের মঞ্চ নির্মাণ করা হয়েছে। বামপাশে একটি আগুন জ্বালাবার পাত্রে জ্বলন্ত কাঠকয়লা প করা রয়েছে। মাঝখানে চামড়ার পাজামা আর হাতাকাটা জামাপরা একজন লোক একটি লম্বা ছুরির ফলা শান দিচ্ছে। সে একজন রাজকীয় জল্লাদ। কামরান বেগ আগেও তাকে তার কাজ করতে দেখেছে। তার পাশে একটা টেবিলের উপর আরো বেশ কয়েকটি ছোটবড় ছুরি রাখা হয়েছে, রোদে এর ফলাগুলো চকচক করছে। ডান পাশে প্রায় ছয়ফুট উঁচু দুটি শক্ত কাঠের কাঠামো পাশাপাশি খাড়া করে রাখা হয়েছে। মঞ্চের দুদিকে আওরঙ্গজেবের কয়েকজন সেনাপতি আর সভাসদ মুখোমুখি বসে রয়েছেন।
সবার চোখ তার উপর, এটা বুঝতে পেরে কামরান বেগ তার লোকদেরকে থামতে বলার পর সবাই ঘোড়া থেকে নামলো। সহিসরা ঘোড়াগুলোকে সরিয়ে নিতে শুরু করলো, এমন সময় উপর থেকে শিঙ্গা ফুঁকতেই পরিশ্রান্ত ঘোড়াগুলো চঞ্চল হয়ে উঠলো। মাথা ঘুরিয়ে কামরান বেগ দেখলো উঠানের প্রায় পনেরো ফুট উপরে মঞ্চের দিকে মুখ করা কারুকাজকরা বেলেপাথরের একটি বেলকনিতে আওরঙ্গজেব এসে দাঁড়ালেন। তার পরনে সাদাসিধা পোশাক। তিনি যে আসনে বসলেন তার দুপাশে বিশাল আকারের সবুজ রঙের মোগল পতাকা উড়ছিল। তার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা একজন পরিচারক সঙ্গে সঙ্গে ময়ূরের পালকের একটি বিশাল পাখা নিয়ে তাকে বাতাস করতে শুরু করলো। তিনি বললেন, ‘স্বাগতম কামরান বেগ। তুমি আর তোমার সাহসী লোকেরা আমার সাম্রাজ্যের জন্য বিশাল একটি কাজ করেছ। তুমি সেই নারকি বিধর্মী শিবাজির বিধর্মী ছেলে আর তাকে যে আশ্রয় দিয়েছিল সেই অধঃপতিত লোকটিকেও ধরে এনেছ। ওদেরকে সামনে নিয়ে এস যাতে আমি ভাল করে দেখতে পারি। সম্রাটের চারজন দেহরক্ষী যেখানে উটের উপর বন্দীদের বেঁধে রাখা হয়েছিল সেদিকে ছুটে গেল। উটের পিঠ থেকে নেমে নামিয়ে বন্দীদেরকে টানতে টানতে আওরঙ্গজেবের সামনে এনে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দিল। ‘এখন তুমি যেখানে আছ সেটাই তোমার সঠিক স্থান–ধূলিমাটি, যারা সত্যিকার খোদাকে মানে না আর তাঁর বিশ্বাসী বান্দা, আমার বিরোধিতা করেছে। কেবল একটি কারণে তুমি বাঁচতে পারবে সম্ভাজি, আর তা হল তোমার ভুল স্বীকার করা আর ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করা।
ফাটা ঠোঁট নিয়ে সম্ভাজি চিৎকার করে বললেন, ‘হিন্দু দেবতারাই আসল ভগবান….। একজন সত্যিকার ঈশ্বর কি করে আপনাকে এসব অন্যায় করার অনুমতি দিল?
তাহলে আর কোনো কথা নেই। তোমরা দুজনেই মরবে। তবে এর আগে তুমি আমাকে বল, আমি যা জানতে চাই–তোমার লুকোনো সম্পদ কোথায় আছে, তোমার কাছ থেকে ঘুষ খেয়ে যেসব মোগল কর্মকর্তা আর সেনাপতিরা তোমাকে তথ্য দিয়েছে তাদের নামসহ আর যা কিছু জান সব বল। আমি তোমার ন্যায়সঙ্গত শাসক তোমাকে জানাতে নির্দেশ দিচ্ছি।’
সম্ভাজি বেলকনিতে বসা আওরঙ্গজেবের দিকে অবাধ্যভাবে ঘৃণা নিয়ে তাকিয়ে রইল। তারপর তিনি বললেন, “আমার যাই হোক, আমার দেশের লোকেরা হিন্দুস্তান থেকে আপনাকে আর আপনার সাম্রাজ্যকে ঝেটিয়ে বিদায় করবে… আমি দেখতে পাচ্ছি আপনি মৃদু হাসছেন। কেন হাসছেন? তার কারণ প্রতারণা আর বিশ্বাসঘাতকতার মধ্য দিয়ে আপনি আমাকে আপনার ক্ষমতার মধ্যে এনেছেন। তার মানে আপনিই সত্যিকার ব্যর্থ। নিজেকেই জিজ্ঞেস করুন আপনার এই ঘৃণিত রাজত্বকালে আপনি আসলে কী অর্জন করেছেন? কিছুই না! আপনার সাম্রাজ্য বিদ্রোহে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। আমার বাবা, যাকে আপনি পরাভূত করতে পারেন নি তার নাম চিরদিন হিন্দুস্তানে বেঁচে থাকবে, কেননা তিনি ছিলেন একজন বীর এবং মানুষের জন্য অনুপ্রেরণা। আর আপনার নাম তখনই উচ্চারিত হবে যখন লোকে আপনার অন্যায় আর অত্যাচারের কথা স্মরণ করে আপনাকে অভিশাপ দেবে।
