জল্লাদ আবার ছুরি তুলতেই কামরান বেগের পেট উগলে উঠলো, সে বমি করতে একপাশে ঘুরলো। নিজেকে সামলাবার চেষ্টা করতে গিয়ে সে লক্ষ করলো মঞ্চের এই ভয়ংকর কার্যকলাপ দেখে শুধু তার একারই বমি বমি ভাব হয় নি। সম্রাটের পেছনে তার দেহরক্ষী প্রধান উমর আলি ঠোঁট কামড়ে মাটির দিকে তাকিয়ে রয়েছে।
নির্বিকার চেহারা নিয়ে জল্লাদ নিয়মনিষ্ঠভাবে তার বিভীষিকাময় কাজটি করে যেতে লাগলো, আওরঙ্গজেব এবার কবি-কুলেশের দিকে তাকালেন। সে তখন তার শাস্তির জন্য অপেক্ষা করছিল। মানুষের চরিত্র বুঝার যে ক্ষমতা তার আছে, তা থেকে তিনি বুঝতে পারলেন, সম্ভাজি রাজি না হলেও এই সেনাপতি কথা বলতে হয়তো রাজি হবে। এটা এমন নয় যে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আসলে খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর গুপ্তচরদের কাছ থেকে অবিশ্বস্ততার তথ্য পেয়ে তিনি যাদেরকে সন্দেহ করেছেন তাদের উপর নজর রাখা হচ্ছে। আর এখন গোলকুন্ডা আর বিজাপুর তাদেরকে আর অর্থসাহায্য দেবে না, কাজেই এই ধনাগার সম্পর্কে জেনেই বা কি লাভ? মোগল সম্পদের তুলনায় এটি সাগর সৈকতে এক কণা বালুর মতো। সবচেয়ে জরুরি বিষয়টি ছিল জনসমক্ষে সম্ভাজির অপমান আওরঙ্গজেবের ইচ্ছার কাছে নতিস্বীকার কর। এটা করতে যত দিন লাগুক তিনি সন্তুষ্ট হতে চাইছেন যে, সাম্রাজ্যের প্রতিটি মানুষ বুঝুক এত বছর পার করেও তাদের সম্রাট এখনও একটি বলবীর্য শক্তি হিসেবে রয়েছেন। যাকে কেবল একটি বোকা কিংবা মূর্খ অমান্য করার সাহস দেখায়।
*
তবে মনে হল শেষ পর্যন্ত তিনি সেই সন্তুষ্টি পাবেন না। দুই সপ্তাহ পর আওরঙ্গজেব আবার বেলকনিতে বসে জল্লাদের কাজ লক্ষ করলেন, জল্লাদ সম্ভাজি আর কবি-কুলেশের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ কাটছে। মাংসপিণ্ড আর হাড় দেখে তাদেরকে আর মানুষ হিসেবে চেনা যাচ্ছে না। এখন শেষ অপমানজনক কাজটি বাকি রয়েছে, কাটা মুণ্ডুটা নিয়ে দাক্ষিণাত্যের গ্রামে গ্রামে ঘুরিয়ে দেখান। যে কোনোভাবেই হোক এতদিন অত্যাচার করার পরও সম্ভাজি আর কবি-কুলেশ তার বিরোধিতা করার শক্তি আর সাহস খুঁজে পেয়েছিল। যখন সম্ভাজির ধরা পড়ার খবর তাঁর কাছে পৌঁছেছিল তখন আওরঙ্গজেব হাঁটুগেড়ে বসে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেছিলেন যে, তাঁর সাম্রাজ্য এখন নিরাপদ হয়েছে এবং তার বিজয় সম্পূর্ণ হয়েছে। তবে এখন মনে হচ্ছে পূর্ণ বিজয় অর্জিত হয় নি আর হয়তো তিনি শিবাজির মতো আরেকটি মারাঠি বীর সৃষ্টি করেছেন।
২০. রাজদূত
মহামান্য, আমি, স্যর উইলিয়াম নরিস সিপিও জাহাজ থেকে আপনাকে এই চিঠি লিখছি। মরিশাস থেকে পাড়ি দিয়ে দুই সপ্তাহ পার করে আমার প্রিয়মাতৃভূমি ইংল্যান্ডের পথে রয়েছি। ঘন ঘন পাতলা পায়খানা হওয়ার কারণে আমার শরীর এতটা দুর্বল হয়ে পড়েছে যে, মনে হচ্ছে আমার বয়স কেবল বেয়াল্লিশ বছর হলেও, শেষপর্যন্ত হয়তো আমি আর সেই তীরভূমি দেখা পর্যন্ত বেঁচে থাকবো না। আর তাই আশা করছি মহান মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের দরবারে একজন দূত হিসেবে আমার প্রতিবেদন একটি চিঠি আকারে পেশ করায় আপনি আমাকে ক্ষমা করবেন। ১৬৯৮ খ্রিস্টাব্দের শরৎকালে আমি এই দায়িত্ব নিয়ে ব্রিটেন থেকে রওয়ানা দিয়েছিলাম।
আপনি যেসব উপদেষ্টার সাথে এবিষয়ে আলোচনা করতে চান আর যারা ডাকযোগ পাঠানো আমার তথ্য সম্পর্কে অবহিত নন তাদের জ্ঞাতার্থে আমি জানাচ্ছি, আমার দূতিয়ালির উদ্দেশ্য ছিল আমাদের দেশের বণিকদের বিশেষ সুবিধা দেবার জন্য সম্রাটকে রাজি করান। এছাড়া আপনার তরফ থেকে আমি তাঁর কাছ থেকে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতির নিশ্চয়তা চেয়েছিলাম যে, অসাধু কর্মকর্তা আর বিদ্রোহীর ছদ্মবেশে দস্যুদের লুণ্ঠন থেকে তিনি আমাদের বণিকদের নিরাপত্তা দেবেন।
দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার পর আমি ১৬৯৯ খ্রিস্টাব্দের ২৫ সেপ্টেম্বর হিন্দুস্তানের পূর্ব উপকূলে মসুলিপত্তনে অবতরণ করি। সেখানে আমাদের দূত পিট আমাকে উষ্ণ সম্বর্ধনা দেন। দীর্ঘ এই সমুদ্রযাত্রার কষ্ট আর একঘেয়েমি অভিজ্ঞতার বিবরণ আমি তুলতে চাই না। তবে রাষ্ট্রদূত হিসেবে আমার কাজ শুরু করার ব্যবস্থা করতে গিয়ে বিভিন্ন প্রক্রিয়া, যেমন উপযুক্ত দোভাষী আর মোগল এলাকায় ঢোকার অনুমতি ইত্যাদি পেতে বেশ সময় লাগলো। পরিশেষে এই সব প্রক্রিয়ার পর ক্লান্ত হয়ে আমি আবার জাহাজে চড়ে ১৭০০ খ্রিস্টাব্দের আগস্টে হিন্দুস্তানের পশ্চিম উপকূলে সুরাট বন্দরের উদ্দেশ্যে পাড়ি দিলাম। চারমাস পর সেখানে পৌঁছলাম। সেখানে অবস্থানরত ইংরেজ বণিকদের সহায়তায় বেশ শীঘ্রই সম্রাটের কাছে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে পারলাম। ওরা আমাকে জানাল, তিনি বর্তমানে দাক্ষিণাত্যের তপতি নদীর তীরে দুর্গনগর বোরহানপুর থেকে একটি অভিযানের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। অত্যন্ত বিপদসঙ্কুল এলাকার মধ্য দিয়ে পথ চলে আমি বোরহানপুর পৌঁছে দেখলাম, তিনি আরো দক্ষিণে শিবির স্থাপন করেছেন। এখানে উল্লেখ্য যে, মাঝে মাঝে আমাকে প্রকৃতপক্ষে মারাঠিদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা পার হতে হয়েছিল। তবে ওদের প্রশংসা করতে হয় এজন্য যে, ওরা আমার সাথে যথেষ্ট ভদ্র ব্যবহার করেছিল। দুর্বল শরীর নিয়ে আমি সাথে সাথে আবার রওয়ানা দিয়ে ১৭০১ খ্রিস্টাব্দের ১৭ এপ্রিল সম্রাটের শিবিরে পৌঁছলাম। পানহালা দুর্গের বাইরে তিনি শিবির স্থাপন করেছিলেন। কেননা দশ বছর মারাঠি কজায় থাকার পর তিনি আবার এই দুর্গটি অবরোধ করে পুনরুদ্ধার করার চেষ্টা করছিলেন।
