সম্ভাজি ওদেরকে বোকা বানিয়েছে। আওরঙ্গজেবের মুখোমুখি হয়ে যখন সে বলবে দুজন নতকী ছাড়া আর কাউকেই পায় নি, তখন তার চেহারার কথা ভেবে কামরান বেগের বুক কেঁপে উঠলো। আওরঙ্গজেব ব্যর্থতা পছন্দ করেন না। তাকে আবার চেষ্টা চালাতে হবে। প্রয়োজন হলে পুরো প্রাসাদ ভেঙ্গে ফেলবে।
তবে এখুনি নয়। তার সমস্ত লোকজনের চুল, দাড়ি আর কাপড়চোপড় ঘামে ভিজে রয়েছে। দুই একজনের গায়ের চামড়ায় কেটে গেছে…আচ্ছা আবার পরিশ্রম শুরু করার আগে হাতমুখ ধুয়ে নিলে হয় না? কামরান বেগ সন্তাজির দিকে ফিরে আদেশ করলো, তুমি কোনো কাজ করনি। চৌবাচ্চায় পানি ভর। তরুণ মারাঠিকে একটু ইতস্তত করতে দেখে সে অবাক হয়ে বললো, “শুনতে পাও নি আমি কি বলেছি?
সন্তাজি মাথা নাড়লো। স্নানাগারেরর দেয়ালের কাছে গিয়ে সে ব্রোঞ্জের একটা চাকা দুই হাত দিয়ে ঘুরাতে শুরু করতেই পাথরের একটা ঢালু পথ বেয়ে পানি এসে চৌবাচ্চায় পড়তে শুরু করলো। কামরান বেগ মূল কামরায় গিয়ে তার লোকদের সাথে কথা বলতে লাগলো। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে অবাক হয়ে দেখলো চৌবাচ্চায় পানি ভরতে কেন এত সময় লাগছে। আর এর মেঝেটাও সমান নয়। একদিকে চার-পাঁচ ইঞ্চি গভীরতার পানি ভরেছে আর অন্য প্রান্তে টাইলও ঢাকা পড়ে নি। অগভীর অংশের কাছে গিয়ে কামরান বেগ লক্ষ করলো, নিচের একধারে চৌবাচ্চার দেয়াল আর মেঝে যেখানে মিশেছে। সেখানে কোনো চুনকাম করা হয়নি। ফাটল দিয়ে পানি নিচে চুঁইয়ে পড়ছে। মিস্ত্রি কি ঠিক মতো কাজ করেনি…?
তারপর পানি পড়ার শব্দের উপর দিয়ে তার মনে হল যেন একটা আজব অন্য ধরনের চাপা শব্দ সে শুনতে পেয়েছে। চৌবাচ্চাটি খালি করার পর কোনো ইঁদুর হয়তো পানির নলের ভেতরে ঢুকে পড়েছে? সে আদেশ করলো, ‘চুপ!’ তারপর হাঁটু গেড়ে চৌবাচ্চার কিনারায় গিয়ে সামনে ঝুঁকে আবার শোনার চেষ্টা করলো। কোনো শব্দ নেই…যা হচ্ছিল তা থেমে গেছে। তারপর শুনতে পেল সন্তাজি চিৎকার করে বলছে, দয়া করে থামুন! আপনারা ওদেরকে পানিতে চুবিয়ে মারবেন!’ তারপর মুখ তুলে দেখলে তরুণ মারাঠি দৌড়ে ব্রোঞ্জের চাকাটির কাছে গিয়ে উল্টোদিকে ঘুরিয়ে এটা বন্ধ করলো। কামরান বেগ উঠে দাঁড়িয়ে তার কাধ ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে জিজ্ঞেস করলো, বুঝিয়ে বল। কি বলতে চাচ্ছ? কে ডুবে মরছে?’ যদিও তার মনে হল উত্তরটা সে জানে।
‘চৌবাচ্চার নিচে এক কোণে একটি গর্ত করা হয়েছে। কবি-কুলেশ এটা একটা লুকোবার জায়গা হিসেবে তৈরি করেছিল। এর আগে আমি যখন এখানে আসি তখন দেখেছিলাম…জানিনা ওরা এখানে আছে কি-না, তবে এখুনি কিছু শব্দ পেয়ে কথাটা বললাম–পানিতে ভরা থাকলে লুকোনোর জায়গাটা ব্যবহার করার কথা নয়। কেননা পানি চুঁইয়ে নিচে চলে যাবে।
‘দেখাও কেমন করে গর্তটা খোলা হয়।
সন্তাজি চৌবাচ্চায় নেমে পড়লো, তারপর এর মেঝের এক কোণায় অন্যান্য টালি থেকে একটু বড় আকারের চারকোণা একটি সবুজ মণিখচিত ম্যালাকাইট পাথরের টালির দুই কিনারে আঙুল ঢুকিয়ে ধরে উপরের দিকে টেনে উঠাতে চেষ্টা করলো। প্রাণপণ চেষ্টার পর সে এটা খুলে আনলো। তারপর সেটা কামরান বেগের একটি লোকের হাতে দিয়ে আবার উবু হয়ে চৌবাচ্চায় বসে বেশ সহজেই দ্বিতীয় টালিটা খুলে আনলো। একটু ঝুঁকে ভেতরে উঁকি দিয়ে কামরান বেগ আঁতকে উঠলো। চৌবাচ্চার অগভীর অংশের নিচে একটা গর্ত দেখা যাচ্ছে। সেখানে গলা পর্যন্ত পানিতে ডুবিয়ে তরোয়াল হাতে দুজন মানুষ উবু হয়ে বসে আছে।
কামারান বেগ আদেশ করলো, “ওদেরকে জীবিত টেনে বের করে আন!’
চুল ধরে টেনে আনতেই একটু বয়স্ক, প্রথমজন উপরে উঠে মাটিতে তরোয়াল ফেলে সহজেই উঠে দাঁড়াল। তবে দ্বিতীয় জনকে টেনে তুলার চেষ্টা করতেই সে তরোয়াল দিয়ে কামরান বেগের একজন সৈনিকের গালে তরোয়াল চালিয়ে কেটে দিল। তারপর তাকে ধরে কাবু করে তরোয়াল কেড়ে নেওয়া হল। তার ভেজা পোশাক থেকে ঝর ঝর করে পানি ঝরছিল, সে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে চারদিকে তাকাল। তবে কামরান বেগ কিংবা মোগল সেনাদের দিকে না তাকিয়ে সোজা সন্তাজির দিকে চোখ রাখলো। তারপর বললো, আমি জানি তুমি একজন মারাঠি, তারপরও তুমি বিশ্বাসঘাতকতা করলে!
সন্তাজি তোতলাতে শুরু করলো, ‘সম্ভাজি…মহারাজ…আমি জানতাম গর্তটা পানিতে ভরে যাবে। ভাবলাম আপনি আর কবি-কুলেশ পানিতে ডুবে মরবেন, সেজন্য আমি কথা বলে উঠলাম!’
সম্ভাজি তার স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, ‘মিথ্যা কথা বলো না। কি ঘুষ দিয়ে ওরা তোমাকে হাত করেছে?
‘ওরা কথা দিয়েছে আমার প্রাণ রক্ষা করবে। তবে আমি কখনও একজন বিশ্বাসঘাতক হতে চাই নি…’
তার কথা শুনে সম্ভাজি তার দিকে তাকিয়ে অবজ্ঞা ভরে হাসতেই, সন্তাজি হঠাৎ সামনে এগিয়ে মারাঠি নেতাকে যে দুজন মোগল সেনা ধরে রেখেছিল, তাদের একজনের কোমরে গোঁজা ছুরি বের করে নিজের গলায় একটা পোচ দিল। তার কাটা গলা থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হতে লাগলো, তারপর সে হুমড়ি খেয়ে মার্বেল পাথরের মেঝেতে পড়ে গেল। এক মুহূর্ত দেহটি মুচড়ালো তারপর স্থির হয়ে গেল।
নিচে তাকিয়ে কামরান বেগ দেখলো তার জুতায় রক্তের ছিটা পড়েছে। সে বললো, এই দেহটা নিয়ে যাও আর প্রথামত শেষকৃত্য কর। তবে আগে দুজন সংবাদবাহককে দ্রুতগামী ঘোড়ায় সম্রাটের কাছে পাঠাও। আওরঙ্গজেবের জন্য তারা কেবল এই বার্তা নিয়ে যাবে–আল্লাহু আকবর। তার শত্রু সম্ভাজি শেষ পর্যন্ত আমাদের হাতে ধরা পড়েছে।
