তরোয়াল হাতে ইব্রাহিম আলি কামরান বেগের মনের কথাটা উচ্চারণ করলো, বুঝলাম না। মারাঠিরা কোথায় গেল? আর ওরা কয়জন ছিল?
কামরান বেগ বললো, “জানি না। হয়তো কেউ কেউ পালিয়ে গেছে আর অন্যরা কবি-কুলেশ আর সম্ভাজিকে সাবধান করতে গেছে। তারপর সে পেছন ফিরে একটা থামের গায়ে পিঠ দিয়ে দাঁড়ান সন্তাজির দিকে তাকিয়ে বললো, কবি কুলেশের ব্যক্তিগত আবাস কোথায়?
তরুণটি একটু ইতস্তত করলো, তারপর উপরের দিকে দেখিয়ে বললো, “উপরে। কামরান বেগ বললো, “নিয়ে চল আমাদের। দশজন লোক নিচে পাহারায় রেখে বাদবাকি লোকজনদের নিয়ে তারপর সে সন্তাজিকে অনুসরণ করে বেলে পাথরের চওড়া সিঁড়ি বেয়ে উপরে একটি মার্বেল পাথরের ঘরের দিকে উঠে চললো।, উপরে উঠে ডান দিকে ঘুরে সন্তাজি ওদেরকে একটি দরজার কাছে নিয়ে এল। দরজার উপর মানুষের মূর্তি খোদাই করা ছিল। ওরা ভাবলো যোদ্ধা? না…আরো কাছে এসে কামরান বেগ দেখলো পেশিবহুল দেহের অধিকারী পুরুষ আর উন্নতবক্ষা নারীর মৈথুন দৃশ্য। চওড়া করিডোরের দুপাশের দেয়ালেও আরো অনেক রঙিন মৈথুন দৃশ্য আঁকা রয়েছে। তবে এই পথের শেষ মাথায় কবি-কুলেশের ঘরের দুই পাল্লার দরজার প্রতি কামরান বেগ আগ্রহ দেখাল।
সন্তাজি ফিস ফিস করলো, এখানেই কবি-কুলেশ থাকেন।’
‘কিরকম দেখতে? কয়টা কামরা আছে?”
বড় একটি ডিম্বাকৃতি ঘর, দুই পাশে পর্দাঘেরা দুটি চোরা কুঠরি আছে আর শেষ মাথায় একটা মার্বেল পাথরের স্নানাগার।
‘কোনো জানালা আছে?
‘প্রত্যেক চোর কুঠরির উপর একটা জানালা আছে। স্নানাগারে কোনো জানালা নেই।’
কামরান বেগ একমুহূর্ত ভাবলো। দরজার পেছনে কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। কেউ থাকলেও সে সাবধান হয়ে গেছে। লোকজনসহ সে একটা ফাঁদের মধ্যে ঢুকতে চায় না, বিশেষত যেখানে মনে হচ্ছে আসা-যাওয়ার একটাই মাত্র পথ। তবে দরজার ওপাশে কি আছে তা কেবল সন্তাজির কথাতে জানা যাচ্ছে। সে সন্তাজিকে বললো, আগে তুমি যাও, গিয়ে দরজাটা খোলার চেষ্টা কর। আর মনে রেখ যদি কাউকে সাবধান করার চেষ্টা কিংবা অন্য কিছু কর তবে আমার লোকেরা তোমাকে গুলি করবে।
সন্তাজি বড় একটা ঢোক গিললো তবে কিছু বললো না, করিডোর দিয়ে ধীরে ধীরে হেঁটে দরজার দিকে গেল। কামরান বেগ তার সৈন্যদের নিয়ে পেছনেই রইল। দরজার কাছে পৌঁছে ঠেলা দিতেই দরজাটি খুলে গেল। কামরান বেগ। অবাক হয়ে দেখলো সন্তাজি যা বর্ণনা দিয়েছিল ওপাশে ঠিক সেরকম একটি বড় কামরা দেখা যাচ্ছে। কয়েকটা নিচু টেবিল পড়ে রয়েছে, তার উপর থেকে খাবারের থালা আর শরবতের গ্লাস ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে এমব্রয়ডারি করা গালিচার উপর পাতা হলুদ আর লাল রঙের কুশণ আর কোলবালিশের উপর। তারপর সে চোখের এক কোণ দিয়ে দেখতে পেল বামদিকে চোরা কুঠরির হালকা রঙের রেশমি পর্দাটা একবার দুলে উঠলো।
সে এগিয়ে গিয়ে তরোয়ালের ডগা দিয়ে পর্দাটা ফাঁক করলো। দুইজন সুন্দরী মেয়ে, পরনে স্বল্পবসন দেখে মনে হচ্ছে সম্ভবত নর্তকী, আতঙ্কে বড় বড় চোখ করে ওদের দিকে তাকিয়ে রয়েছে।
‘সন্তাজি এদিকে এস! এদেরকে বল আমরা ওদের কোনো ক্ষতি করবো না, তবে আমি জানতে চাই সম্ভাজি আর কবি-কুলেশ কোথায় আছে।
সন্তাজি দ্রুত কামরান বেগের কথাগুলো তর্জমা করে ওদেরকে শোনাল। তারপর একটি মেয়ের উত্তর শোনার পর কামরান বেগের দিকে ঘুরে বললো, ‘এরা কবি-কুলেশের বাড়ির পরিবার পরিজন। সে বললো, কবি-কুলেশ আর সম্ভাজি এখানে ছিলেন, তবে ওদেরকে এখানে পর্দার আড়ালে লুকিয়ে থাকতে বলে ওরা চলে গেছে। কোথায় গেছে সে দেখেনি।’
কামরান বেগ মেয়েটির দিকে তাকাল। যে মেয়েটি কথা বলেছিল বেশ লম্বা, কোঁকড়ানো চুলে মেহেদি রঙ করা আর লাল ঠোঁট–সে তার দিকে তাকাল। তার ভারী বুকের দ্রুত উঠানামা দেখে মনে হল সে সন্ত্রস্ত হয়েছে। সে কি সত্যিকথা বলছিল? হয়তো বলছিল।
তাই যদি হয় তবে সম্ভাজি কোথায় গেল? বহুবছর ধরে গুপ্তচরের কাজ করতে করতে সে শিখেছে যুক্তি ছাড়াও অন্তর্জানেরও একটি মূল্য আছে। সমস্ত কিছু বিবেচনা করে বোঝা যাচ্ছে সম্ভাজি বেশি দূর যায় নি–যাওয়ার সে সময় পায়নি। দরজার তালা খোলা রেখে ওরা মোগলদেরকে বোকা বানাবার চেষ্টা করেছে, যাতে ওরা ধরে নেয় যে, শিকার এখান থেকে পালিয়ে গেছে। হয়তো সে পালিয়েছে কিংবা পালায়নি…কামরান বেগ দ্রুত চিন্তা করলো। তারপর বললো, ইব্রাহিম আলি, ঘরের বাইরে লোক রাখ নজর রাখার জন্য, যদি কাউকে আসতে দেখে তবে যেন আমাদেরকে সাবধান করে। আর বাকি যারা আছ, তোমরা তন্ন তন্ন করে এই কামরার সবকিছু খুঁজে দেখ। প্রত্যেকটা পর্দা আর আসবাবের পেছনে উল্টে দেখ যেখানে কেউ লুকিয়ে থাকতে পারে। সবকিছু টেনে খুলে ফেল। দেয়ালে টোকা দাও। দেখো এমন কোনো চিহ্ন পাওয়া যায় কি-না যেখানে ওরা লুকিয়ে থাকতে পারে।
তবে আধঘণ্টা পর জমকালো কামরাটির সবকিছু তছনছ ওলটপালট করলেও কিছুই পাওয়া গেল না। লোকগুলোর মুখ দিয়ে দরদর করে ঘাম পড়ছিল। স্নানাগারে গিয়ে দেয়াল থেকে টাইল উপড়ে ফেললো, পাঁচফুট গভীর শূন্য পানির চৌব্বাচ্চার উপর লাফিয়ে দেখলো, তবে এটা বেশ শক্ত মনে হল। আর সবকিছু নীরব কেবল ওদের নিঃশ্বাস আর বিরক্তি প্রকাশ করা ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। আর বাইরে যারা ছিল কিংবা নিচে উঠানে যারা ছিল তারাও কিছু দেখেনি কিংবা কিছু শুনেনি। পুরো প্রাসাদটি মনে হচ্ছে নির্জন, এমনকি একজন চাকরও নেই, প্রহরী তো দূরের কথা…
