কামরান বেগ সন্তাজিকে জিজ্ঞেস করলো, এই গাড়িগুলো কী নদী থেকে মালামাল আনছে?
‘হ্যাঁ, জনাব। প্রাসাদের রসদ নদীপথে এনে এখান থেকে প্রায় আধামাইল দূরে নদীর একটি ঘাটে এনে রাখা হয়, তারপর গরুর গাড়িতে বয়ে প্রাসাদে নিয়ে আসা হয়। নদীর প্রবল স্রোত আর দুই নদীর সঙ্গমস্থলের তীব্র স্রোতের কারণে নৌকাগুলো আসতে অনেক সময় দেরি হয়।
‘গাড়ির মাল কোথায় খালাস করা হয়?
‘প্রাসাদের মূল উঠানে খালাস করা হয়, সেখান থেকে সিঁড়ি সোজা মাটির নিচে মদের ভাঁড়ারে নেমে গেছে।
কয়েক মিনিট পর গরুরগাড়িগুলো আবার প্রাসাদ থেকে বের হয়ে নদীর দিকে চলে গেল। কামরান একমুহূর্ত চিন্তা করলো। তার পরিকল্পনা ছিল ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে অন্ধকার আর ছদ্মবেশের উপর নির্ভর করে তার লোকেরা প্রাসাদে ঢোকার চেষ্টা করবে–তবে এখন একটা আরো ভালো পথ বের হয়ে এসেছে…। সে বললো, “আচ্ছা গাছের আড়ালে আড়ালে গা ঢাকা দিয়ে বাগানের মধ্য দিয়ে আমরা খুব তাড়াতাড়ি নদীর ঘাটে পৌঁছতে পারি না?’ সন্তাজি মাথা নেড়ে সায় দিতেই সে আবার বললো ‘চমৎকার, তাহলে সেখানে আমাদেরকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চল।
প্রায় আধাঘণ্টা পর কামরান বেগের লোকেরা অতর্কিত আক্রমণ করে দুই গারোয়ানকে ছুরি মেরে লাশগুলো ঝোঁপের আড়ালে টেনে নিয়ে গেল। সাথে সাথে কামরান বেগ দশজনকে এক একটা গাড়িতে চড়তে বললো। দুজন বসবে গারোয়ানের আসনে আর বাদবাকিরা পিপা আর বস্তার আড়ালে লুকাবে। তার বাকি সৈন্যদেরকে ফটকের উল্টোদিকে আগের জায়গায় গিয়ে লুকিয়ে অপেক্ষা করতে বললো, আর লড়াইয়ের শব্দ পাওয়ার সাথে সাথে ওরা প্রাসাদে ঢুকে পড়বে। তারপর সে সন্তাজিকে ঠেলা দিয়ে প্রথম গাড়িতে উঠে বসে একটা পানি নিরোধক কাপড় গায়ের উপর টেনে নিল।
গাড়োয়ানের আসনে বসা লোকটি চাবুক হাঁকাতেই গাড়ি চলতে শুরু করলো। নদীর পথ ধরে চলতে চলতে প্রাসাদের এক পাশ দিয়ে ঘুরে মূল ফটকের দিকে এগোল। ভাগ্যের কি পরিহাস, কামরান বেগ ভাবলো। যখন সে নিজে ছোট ছিল, তখন সম্ভাজি আর শিবাজি বেতের ঝুড়িতে লুকিয়ে আগ্রা দুর্গ থেকে পালিয়েছিল। আর এখন সম্ভাজিকে আবার ধরতে সে নিজে লুকিয়ে একটি প্রাসাদে ঢুকছে। আর এক মিনিট, তারপরই ওরা উঠানে ঢুকে পড়বে…ছুরির বাটে হাত রেখে শক্ত হয়ে বসলো, কেউ কিছু বললেই লাফ দিয়ে উঠবে। শুনতে পেল একজন প্রহরী কিছু একটা বলে উঠতেই তার এক লোক উত্তর দিল। সন্তাজি আগেই ওদেরকে শিখিয়ে রেখেছিল ওরা কিভাবে নমস্কার করে আর কি উত্তর দিতে হবে। গাড়িটা একটা বাঁক নিয়েই উঠানে ঢুকে থেমে দাঁড়াল।
কামরান বেগ ফিস ফিস করে সবাইকে বললো, যেখানে আছ সেখানেই বসে থাক! অন্য গাড়িটাকে আসতে দাও।’ তবে প্রায় সাথে সাথে পেছন থেকে ষাড়ের মৃদু ডাকের সাথে সাথে গরুর গাড়ির কাঁচকাঁচ শব্দে বুঝা গেল দ্বিতীয় গাড়িটাও এসে পড়েছে।
তারপর কামরান বেগ একটা চিৎকার আর সেই সাথে অর্তনাদ শুনতে পেল। গায়ের উপর থেকে কাপড়টা ফেলে দিয়ে সে লাফ দিয়ে গাড়ি থেকে নেমে পড়লো। পেছনের দ্বিতীয় গাড়িটার দিকে তাকিয়েই বুঝতে পারলো কি ঘটেছে। একজন মারাঠি মাটির উপর হাত-পা ছড়িয়ে গলা কাটা অবস্থায় চিৎ হয়ে পড়ে রয়েছে আর তার দুই লোক তার কাছেই দাঁড়িয়ে রয়েছে, সে হয়তো গাড়ির ভেতরে উঁকি দিয়ে ওদেরকে দেখে ফেলে চিৎকার করতে যাচ্ছিল। কামরান বেগ চিৎকার করে বললো, সবাই গাড়ি থেকে নেমে পড়, এখুনি!
ঠিকই মারাঠি লোকটির চিৎকার শোনা গিয়েছিল। প্রায় দশজন মারাঠি উঠানে ছুটে এল। কামরান বেগের লোকদের ছদ্মবেশ দেখে ওরা একটু থতমত খেতেই মোগলরা একটু সময় পেল। সাদা পাগড়িপরা লম্বা-চওড়া একজন মারাঠি একটু ইতস্তত করতেই কামরান বেগ লোকটির ডান চোখ লক্ষ্য করে ছুরি চালাল। লোকটি আর্তচিৎকার করে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো।
এমন সময় একজন তরুণ মোগল সেনা সাবধান করে চিৎকার দিয়ে উঠলো, ‘উপরে তাকান! সাবধান! কামরান বেগ মাথা নিচু করে সরাতেই ছাদের উপর থেকে একজন মারাঠি তার দিকে লক্ষ্য করে গাদা বন্দুকের গুলি ছুড়লো। গুলিটা তার মাথর উপর দিয়ে সাঁৎ করে উড়ে গিয়ে একটা গরুর গাড়ির কাঠে লাগলো। মারাঠি লোকটি আবার গুলি করার প্রস্তুতি নিতেই মোগল সেনাটি তার পিস্তল বের করে তাকে একটা গুলি করলো। মারাঠি লোকটির হাতে গুলি লাগতেই সে তার বন্দুক ফেলে দিয়ে ছুটে পালাল।
কয়েকগজ দূরে ইব্রাহিম আলি দুজন মারাঠির সাথে লড়াই করছিল। ওদের তরোয়ালের আঘাত এড়িয়ে সে লাথি দিয়ে একজনকে ফেলে দিতেই সে তার সঙ্গীর গায়ের উপর পড়তেই দুজনেই মাটিতে পড়ে গেল। এবার ইব্রাহিম আলি প্রথম জনের পেটে তরোয়ালের ডগা ঢুকিয়ে দিল। তারপর দ্বিতীয়জন উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করতেই তরোয়ালের এক কোপে তার মাথা ধড় থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেললো।
ইতোমধ্যে যে সৈন্যদেরকে কামরান বেগ প্রাসাদের উল্টোদিকে অপেক্ষা করতে বলেছিল ওরাও উদ্যত তরোয়াল হাতে ছুটে এল। ওদের কয়েকজনের তরোয়ালে রক্তের দাগ দেখে বোঝা যাচ্ছে যে বাইরে যে দুজন প্রহরী ছিল ওরা তাদেরকেও শেষ করে এসেছে। সন্তাজির হাত শক্ত করে ধরে কামরান বেগ সামনে কতগুলো ভারী থামের উপর একটা বেলকনির দিকে ছুটতে ছুটতে সবাইকে বললো, সবাই আমার পেছনে পেছন এস! জলদি কর!’ এর নিচে গিয়ে আশ্রয় নিয়ে দেখতে হবে কতজন মারাঠি প্রতিপক্ষ এখানে রয়েছে। তবে চওড়া থামের আড়াল থেকে উঁকি দিয়ে সে দেখলো উঠানটি এখন নির্জন মনে হচ্ছে, লাল টকটকে রক্তের মধ্যে পড়ে থাকা কেবল গোটা ছয়েক মানুষের মধ্যে চারজন স্থির হয়েছে আর দুজনের দেহে তখনও প্রাণ ছিল। এদের মধ্যে তার কোনো লোককে দেখা গেল না। উপরে তাকিয়ে কেবল জ্বলন্ত মশালের অগ্নিশিখার নাচন আর ছায়া ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়লো না।
