মূর্তিটা তখনো চেয়ারের ওপরেই বসে রয়েছে, মাথাটা তার টেবিলের ওপরে নামানো; পিঠটা উঁচু হয়ে উঠেছে-হাত দুটি অদ্ভুতভাবে রয়েছে ছড়ানো। তার পিঠের ওপর গভীর একটা ইক্ষতচিহ্ন না থাকলে, আর তার ওপরে কালো রক্ত জমাট বেধে না উঠলে, সবাই ভাবত লোকটি ঘুমোচ্ছেন।
কত তাড়াতাড়ি কাজটা শেষ হয়ে গেল! অদ্ভুতভাবে শান্ত হয়ে গেলেন তিনি; জানালার ধারে এসে খুলে দিলেন শার্সিগুলো; তারপরে বেরিয়ে এলেন বারান্দায়। বাতাসে কুয়াশা উড়ে গিয়েছে; অজস্র সোনালি নক্ষত্রে খচিত হয়ে আকাশটাকে একটা দানবীয় ময়ূরের পেখমের মতো দেখাচ্ছে। রাস্তার দিকে তাকিয়ে দেখলেন পুলিশ রোঁদে বেরিয়ে নিস্তব্ধ বাড়িগুলির বন্ধ দরজার ওপরে তার লম্বা লণ্ঠন ঘুরিয়ে-ঘুরিযে আলো ফেলছে। এক কোণে লাল রঙের একটা পুলিশের গাড়ি চকিতে দেখা দিয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। লম্বা আলোয়ান জড়িয়ে একটি মহিলা রেলিং-এর ধার দিয়ে সন্তর্পণে স্মৃতিপদে এগিয়ে এল। মাঝে-মাঝে সে থামল, যি তাকাল পেছনের দিকে পুলিশম্যান তার সামনে এগিয়ে এসে কী যেন বলল। হাসতে-হাসতে মেয়েটি টলতে টলতে চলে গেল। যাওয়ার সময় হেঁড়ে গলায় অতিস্থের মতো গানের কয়েকটা কলিও আওড়ালা একটা ঠান্ডা হাওযা পার্কের ওপর দিয়ে বয়ে গেল। গ্যাসের আলোগুলি কাঁপতে লাগল, কাঁপতে কাঁপতে নীলচে হয়ে গেল তারা। পত্রহীন গাছগুলি তাদের সেই কালো কালো লোহার মতো শক্ত ডালগুলি এপাশে-ওপাশে নাড়াতে লাগল। কাঁপতে কাঁপতে পিছিয়ে গিয়ে জানালাটা বন্ধ করে দিলেন তিনি।
দরজার সামনে গিয়ে চাবি দিয়ে তালাটা খুললেন তিনি। নিহত মানুষটির দিকে তিনি একবার ফিরেও তাকালেন না। তাঁর মনে হল ব্যাপারটা নিয়ে কোনোরকম চিন্তা না করাটাই হল আসল কথা। ওই ছবিটাই হল তাঁর সমস্ত দুঃখ আর দুর্দশার মূল কারণ। যে বন্ধুটি ওই বিপজ্জনক ছবি এঁকেছেন তিনি আজ মৃত। সেটাই যথেষ্ট।
তারপরে বাতিটার কথা তাঁর মনে পড়ে গেল। মুর দেশের কারুকার্য করা অদ্ভুত সেই বাতিদান; মরা রুপো দিয়ে তৈরি; তার গায়ে নীলকান্তমণির বুটি। সেটাকে যথাস্থানে দেখতে না পেয়ে। চাকরটা হয়তো খোঁজাখুঁজি করবে। একটু ইতস্তত করলেন তিনি। তারপরে ঘুরে দাঁড়িয়ে টেবিলের ওপর থেকে সেটি তুলে নিলেন। মৃত মানুষটির দিকে একবার চোখ না ফিরিয়ে তিনি পারলেন না। কী চুপচাপ পড়ে রয়েছে দেহটা। দীর্ঘ হাত দুটি কী ভয়ঙ্কর সাদাই না দেখাচ্ছে! মনে হল যেন একটা ভয়াল মোমের মূর্তি চেয়ারের ওপরে বসে রয়েছে।
দরজায় চাবি দিয়ে চুপি-চুপি সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে এলেন তিনি। কাঠের সিড়িঁগুলি মচমচ করল; মনে হল, তারা যেন যন্ত্রণায় গোঙিয়ে উঠছে। কয়েকবারই তিনি থামলেন; উৎকর্ণ হয়ে দাঁড়ালেন। না। চারপাশ নিস্তব্ধ। যে শব্দ তাঁর কালে ঢুকেছিল সেটা তাঁরই পায়ের।
লাইব্রেরিতে ঢুকে এলেন তিনি, ঘরের এক কোণে ব্যাগ আর কোটটা পড়ে রয়েছে। ওগুলিকে কোথাও লুকিয়ে রাখতে হবে। ঘরের দেওয়ালের ভেতরে একটা গোপন কুঠরি ছিল। তার মধ্যে তিনি তাঁর গোপন ভিজনিসগুলি রাখতেন। সেই দেরাজটা খুলে ব্যাগ আর কোট তার ভেতর ঢোকালেন। পরে যথাসময়ে ওগুলিকে সহজেই পুড়িয়ে ফেলা যাবে। তারপরে তিনি ছোটো ঘড়িটা বার করে দেখলেন। দুটো বাজতে কুড়ি মিনিট বাকি।
বসে পড়ে ভাবতে লাগলেন তিনি। যা তিনি করেছেন তার জন্যে ইংলন্ডে প্রতিটি মাসে প্রতিটি বছরে মানুষকে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করা হয়। আকাশে-বাতাসে হত্যার উন্মত্ততা ছড়িয়ে পড়েছে। কোনো ধূমকেতু পৃথিবীর খুব কাছাকাছি এসে পড়েছে।..তবু, তিনিই যে হত্যাকারী তার প্রমাণ কী? রাত্রি এগারোটার সময় বেসিল হলওয়ার্ড তাঁর বাড়ি থেকে। বেরিয়ে গিয়েছেন। তাঁকে ফিরে আসতে কেউ দেখেনি। অধিকাংশ চাকরই সেলবি রয়্যালে গিয়েছে। তাঁর নিজস্ব পরিচারক গিয়েছে ঘুমোতে প্যারিস! হ্যাঁ। বেসিল প্যারিসেই গিয়েছেন। তাঁরই সময়সূচী অনুযায়ী মাঝরাতের ট্রেনেই তিনি প্যারিসের পথে রওনা হয়েছেন। নিজেকে লোকচক্ষু থেকে লুকিয়ে রাখার স্বভাব যে তাঁর রয়েছে একথা কে না জানে। সুতরাং তিনি যে মারা গিয়েছেন সে-সন্দেহ মানুষের হতে কয়েক মাস সময় লাগবে। দীর্ঘ কয়েকটি মাস। তার ভেতরে তাঁর সমস্ত পশ্চাৎ চিই একেবারে নষ্ট করে ফেলা সম্ভব হবে।
হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ে গেল তাঁর। ফার-এর কোট আর টুপি চড়িয়ে তিনি হলঘরে বেরিয়ে এলেন। একটু থাকলেন। ফুটপাতের ওপরে পুলিশ পাহারা দিচ্ছে। সে-শব্দ তাঁর কালে এল। তাদের লণ্ঠনের আলো গোল হয়ে শার্সির কাঁচের ওপরে পড়েছে তাও তিনি দেখলেন। নিঃশ্বাস টিপে অপেক্ষা করলেন তিনি।
তারই একটু পরে চাবিটা টেনে নিয়ে তিনি পকেটের মধ্যে ফেলে দিলেন; তারপরে খুব আস্তে-আস্তে দরজাটা বন্ধ করে, তিনি বেলটা বাড়াতে লাগলেন। মিনিট পাঁচেকের ভেতরেই। তার ব্যক্তিগত পবিচারক গায়ে কোনোরকমে পোশাকটা উড়িয়ে সামনে এসে দাঁড়াল। চোখেমুখে তখনো তার বেশ ঘুম জড়িয়ে রয়েছে।
দু’পা এগিয়ে এসে তিনি বললেন: ফ্রান্সিস, তোমাকে ঘুম থেকে টেনে তোলার জন্যে আমি দুঃখিত। কিন্তু আমি “ল্যাচ কীটা আনতে ভুলে গিয়েছি। কটা বাজে বল তো?
চোখ দুটো মিটমিট করে লোকটি বলল: দুটো বেড়ে দু’মিনিট হয়েছে স্যার।
