যা তুমি বলতে।
তার মধ্যে কোনো নোংরামি ছিল না, ছিল না ঘৃণা করার মতো কিছু জিনিস। তুমি আমার কাছে এমন একটি আদর্শ ছিলে ঠিক যেরকমটি আর কোনোদিনই আমার চোখে পড়েনি। কিন্তু এই মুখটা তো দেখছি ছাগলের।
এটি হচ্ছে আমার আত্মার মুখ।
হায় ভগবান, এই জিনিসটাকে আমি এতদিনে পুজো করে এসেছি? এর চোখ দুটো তো শয়তানের।
নৈরাশ্যের ভঙ্গি করে ডোরিয়েন বললেন: আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই স্বর্গ আর নরক দুইই রয়েছে, বেসিল।
আবার প্রতিকৃতিটির দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন বেসিল; তাকিয়ে রইলেন তার দিকে; তারপরে চিৎকার করে বললেন: হায় ভগবান, এটাই যদি সত্যি হয়…তোমার জীবন নিয়ে যদি এইরকম খেলাই তুমি সত্যি-সত্যিই খেলে থাক থাহলে লোকে তোমার সম্বন্ধে যা ভাবে তার চেয়ে তো দেখছি তুমি অনেক বেশি খারাপ, অধঃপাতের আরও অনেক নীচে তুমি নেমে গিয়েছ।
এই বলে বাতিটি তুলে আবার তিনি ক্যানভাসটাকে পরীক্ষা করতে লাগলেন। ওপরটা মোটেই বিকৃত হয়নি। যেমন তিনি রেখেছিলেন ঠিক তেমনিই রয়েছে; বিকৃতি যা ঘটেছে তার সবটাই ওই ভেতর থেকে। অবচেতন মনের কোনো একটি বিশেষ আর রহস্যময় চোরা পথ দিয়ে পাপের কুষ্ঠ বাইরে বেরিয়ে এসে ছবিটিকে কুরে কুরে খেয়ে ফেলছে। জলে বোঝাই কবরের মধ্যে মৃতদেহের পচনও এর মতো ভয়ঙ্কর নয়।
হাত কাঁপতে লাগল তাঁর; বাতিটা হাত থেকে মাটির ওপর পড়ে গেল; শিখাটা ছিটকে পড়ল চারপাশে পা দিয়ে মাড়িয়ে আলোটা নিবিয়ে দিলেন তিনি তারপরে টেবিলের পাশে যে সরু একটা চেয়ার ছিল সেইখানে বসে দুটো হাত দিয়ে মুখটাকে ঢেকে দিলেন। হায় ভগবান, ডোরিয়েন; এ কী শিক্ষা, এ কী ভয়ঙ্কর শিক্ষা!!
কোনো উত্তর এল না ডোরিয়েনের কাছ থেকে। জানালার কাছ থেকে একটা চাপা আর্তনাদে ফোঁপাতে লাগলেন তিনি।
হলওয়ার্ড বললেন: ডোরিযেত, ভগবানের কাছে প্রার্থনা কর। শৈশবে আমাদের কী কণ্ঠস্থ করতে হয় বল তো? “হে ভগবান, পাপের পথে আমাদের পরিচালিত করো না; আমাদের পাপ তুমি ক্ষমা কর; আমাদের পবিত্র কর তুমি।” এস, আমরা দুজনে মিলে সেই প্রার্থনাই করি। তোমার দম্ভের প্রার্থনা পূর্ণ হয়েছে, তোমার অনুতাপ করার প্রার্থনাও ভাবান পূর্ণ করবেন। তোমার সৌন্দর্যকে আমি খুব বেশি পূজা করতাম। শাস্তি পেয়েছি যথেষ্ট।
ধীরে-ধীরে ঘুরে দাঁড়ালেন ডোরিয়েন; অশ্রুসিক্ত লোচনে তাকিয়ে রইলেন তাঁর দিকে বললেন: অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে, বেসিল।
প্রার্থনার সময়-অসময় নেই, ডোরিয়েন; এস, আমরা দুজনে একসঙ্গে হাঁটু মুড়ে বসে চেষ্টা করে দেখি প্রার্থনার কোনো পদ আমাদের মনে আসে কি না! “যদিও তোমার পাপ লাল টকটকে হয়ে উঠেছে, তবু তাকেই আমি বরফের মতো সাদা করে দেব”–এই ধরনের একটা প্রার্থনা রয়েছে না?
ও-পদ বর্তমানে আমার কাছে অর্থহীন, বেসিল।
চুপ! ওকথা বলো না। জীবনে অনেক পাপ তুমি করেছ। হায় ভগবান, ওই হতভাগা জিনিসটা। আমাদের যে ব্যঙ্গ করছে তা কি তুমি দেখতে পাচ্ছ না?
ছবিটির দিকে তাকালেন ডোরিয়েন গ্রে। বেসিলের ওপরে একটা অদম্য আক্রোশ হঠাৎ চেপে বসল তাঁর মনে হল, ক্যানভাসের ওপরে আঁকা প্রতিকৃতিটা ঠোঁট বিকৃত করে বেসিলের। বিরুদ্ধে উত্তেজিত করল তাঁকে। বিরাট একটা উত্তেজনায় কেঁপে উঠলেন তিনি। একটা আহত পশুর উন্মত্ত জিঘাংসা তাঁকে অস্থির করে তুলল। ওই চেয়ারে যে মানুষটি বসে রয়েছে তাঁর ওপরে প্রচণ্ড একটা ঘৃণা এল তাঁরা মনে হল এত ঘৃণা জীবনেআর কাউকেই তিনি করেননি। পাগলের মতো তিনি চারপাশে তাকাতে লাগলেন। তাকের ওপরে একটা জিনিস তাঁর চোখে পড়ল। চকচক করছিল জিনিসটা। এটা কী তা তিনি জানতেন। এটা একটা ছোরা। কয়েকদিন আগে একটা দডি কাটার জন্যে তিনি এটাকে এখানে নিয়ে এসেছিলেন, তারপরে সরিয়ে। নিয়ে যেতে ভুলে গিয়েছিলেন। ধীরে-ধীরে হলওয়ার্ডের পাশ দিয়ে তিনি সেই দিকে এগিয়ে গেলেন। তাঁর পেছনে গিয়ে ছোরাটা তুলে নিয়েই ঘুরে দাঁড়ালেন তিনি। হলওয়ার্ড একটু। নড়লেন; মনে হল তিনি এবারে উঠবেন। দ্রুতগতিতে এগিয়ে গিয়ে ডোরিয়েন সেই ছোরা বেসিলের কানের পেছনে যে বড়ো শিরাটা রয়েছে তার মধ্যে প্রচণ্ড বেগে ঢুকিয়ে দিলেন। মাথার ওপরে জোরে আঘাত করে ফেলে দিলেন মেঝেতে, তারপরে বারবার ছুরিকাঘাত করতে লাগলেন তাঁকে।
একটা চাপা গোঙানি শোনা গেল; মনে হল, চাপ-চাপ রক্তে কারও যেন কণ্ঠস্বর রুদ্ধ হয়ে গিয়েছে। বেসিলের অসহায় দুটি হাত বার তিনেকের মতো কাঁপতে-কাঁপতে ওপরে উঠে শেষবারের মতো মাটির ওপরে লুটিয়ে পড়ল। আরো দু’বার তাঁর বুকে ছোরাটা বসিয়ে দিলেন ডোরিয়েন। মৃত বেসিলের কাছ থেকে কোনো প্রতিবাদ এল না। মেঝের ওপর জলীয় একটা কিছু ঝিরঝির করে গড়িয়ে পড়ল। বেসিলের মাথাটা নীচের দিকে চেপে রেখে একটু অপেক্ষা করলেন তিনি; তারপর টেবিলের ওপরে ছোরাটা ছুঁড়ে দিয়ে কান পেতে রইলেন। কার্পেটের ওপরে ঝিরঝির করে রক্ত পড়ার শব্দ ছাড়া আর কিছুই তাঁর কানে এল না। দরজা। খুলে বাইরে বেরিয়ে এলেন তিনি। চারপাশ নিউন, চুপচাপ। আশেপাশে কাউকেই দেখা গেল না। কয়েক সেকেন্ড চারপাশের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে তিনি বারান্দার রেলিং ধরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপরে চাবিটা বার করে আবার তিনি ভেতরে ঢুকলেন; তারপরে খিল দিয়ে দিলেন ঘরে।
