দুটো বেজে দু’মিনিট! বল কী! বড় রাত হয়ে গিয়েছে তো তাহলে তুমি কিন্তু কাল বেলা ন’টার সময় আমাকে তুলে দিয়ো। কিছু কাজ রয়েছে আমার।
দেব স্যার।
সন্ধের দিকে কেউ আমার খোঁজ করছিল?
মিঃ হলওয়ার্ড, স্যার। তিনি এখানে রাত্রি এগারোটা পর্যন্ত বসেছিলেন। তারপরে ট্রেন ধরতে হবে বলে উঠে গেলেন।
তাঁর সঙ্গে দেখা হল না বলে আমি দুঃখিত। কিছু বলে গিয়েছেন তিনি; অথবা কোনো চিঠি দিয়েছেন?
না স্যার। তিনি বলে গিয়েছেন ক্লাবে যদি আপনার সঙ্গে আজ দেখা না হয় তাহলে প্যারিস থেকে তিনি আপনাকে চিঠি দেবেন।
ঠিক আছে ফ্রান্সিস। কাল আমাকে সকাল ন’টায় ঢেকে দিতে ভুলো না।
না স্যার।
চটি পায়ে দিয়ে লোকটি টলতে-টলতে ঘুমের ঘোরে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
টুপি আর কোটটা টেবিলের ওপরে ছুঁড়ে দিয়ে ডোরিয়েন লাইব্রেরিতে ঢুকলেন। ভাবতে-ভাবতে আর ঠোঁট কামড়াতে-কামড়াতে প্রায় মিনিট পনেরো ধরে তিনি পায়চারি। করলেন। তারপরে একটি ব্যাগ থেকে তিনি ব্লু বুকটা টেনে নিয়ে পাতা ওলটাতে লাগলেন। “অ্যালেন ক্যাম্পবেল, ১৫২, হার্ট ফোর্ড স্ট্রিট, মে ফেয়ার’। হ্যাঁ; এই লোকটিকেই তাঁর দরকার।
.
চতুর্দশ পরিচ্ছেদ
পরের দিন সকাল ন’টার সময় চাকরটি ট্রেতে করে এক কাপ চকোলেট নিয়ে ঘরে ঢুকে জানালার শার্সিগুলি খুলে দিল। ডান দিকে পাশ ফিরে একটা হাত গালের নীচে রেখে বেশ আরাম করেই ঘুমোচ্ছিলেন ডোরিয়েন। তাঁকে সেই অবস্থায় দেখলে মনে হবে যেন খেলা অথবা পড়ার পরে ক্লান্ত হয়ে একটা শিশু ঘুমিয়ে পড়েছে।
লোকটি তাঁর কাঁধে বার দুই ঠেলা দেওয়ার পরে তাঁর ঘুম ভাঙল। চোখ খোলার সঙ্গে-সঙ্গে। তাঁর ঠোঁট দুটির ওপরে একটি মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠল। মনে হল যেন একটা মিষ্টি স্বপ্নে এতক্ষণ তিনি বিভোর হয়ে ছিলেন। তবু স্বপ্ন তিনি মোটেই দেখেননি। আনন্দ বা দুঃখ কোনোটাই তাঁর রাত্রিটিকে ভারাক্রান্ত করে তোলেনি। কিন্তু অকারণেই যৌবন হাসো। এটাইটাই হচ্ছে তার সেরা সৌন্দর্য।
ঘুরে বালিশের ওপর কনুইটা রেখে চকোলেটে চুমুক দিলেন তিনি। নভেম্বর মাসের মিষ্টি রোদ তাঁর ঘরের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ল। পরিচ্ছন্ন আকাশ; বাতাসে মিষ্টি রোদের আমেজ। দিনটা মে মাসের প্রভাতের মতোই উজ্জ্বল।
ধীরে ধীরে নিঃশব্দ রক্তাক্ত পদক্ষেপে গতরাত্রির ঘটনাগুলি তাঁর মাথার মধ্যে ভিড় করে। দাঁড়াল; পরিস্ফুট করে তুলল সেই বিপজ্জনক নাটকটিকে তিনি যে দুঃখ পেয়েছেন সেই দুঃখ আর বেদনার স্মৃতি হঠাৎ তাঁকে ভারাক্রান্ত করে তুলল; তারই উত্তেজনায় চেয়ারের ওপরে উঠে বসলেন তিনি এবং যে ঘৃণা বেসিল হলওয়ার্ডকে হত্যা করতে তাঁকে বাধ্য করেছিল। সেই নিদারুণ ঘৃণা আবার এসে দেখা দিল; তাঁর সমস্ত সহানুভূতি হিমশীতল হয়ে জমাট বেঁধে গেল। মৃত লোকটি এখনো সেইখানে একইভাবে বসে রয়েছে, তবে বর্তমানে রোদ এসে তার। গায়ের ওপরে পড়েছে। কী ভয়ঙ্কর! এইরকম ভয়ঙ্কর কাজের দোসর রাত্রির অন্ধখার, দিনের পরিচ্ছন্ন আলো নয়। তাঁর মনে হল গতরাত্রির কথা আবার যদি তিনি ভাবতে শুরু করেন। তাহলে হয় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়বেন, আর না হয়, পাগল হয়ে যাবেন। এমন অনেক পাপ রয়েছে যাদের স্মৃতি সত্যিকারের কাজের চেয়ে অনেক বেশি মানুষকে মুগ্ধ করে। সত্যিকার ভোগ মানুষের প্রবৃত্তির আকাঙ্খা মেটায় সন্দেহ নেই; তাকে আনন্দ দেয়; কিন্তু এই সব। কাল্পনিক বিজয়, যাকে আমরা পাপের মনোচারণ বলি, তারা আমাদের আনন্দ দেয় অনেক বেশি, আমাদের কল্পনাকে অনেক বেশি রাঙিয়ে তোলে। কিন্তু বর্তমান স্মৃতিটা ঠিক সেই জাতীয় নয়। এই স্মৃতি ভযাবহ, বিপজ্জনক–মানুষকে আফিঙের নেশায় আচ্ছন্ন, একেবারে ধ্বংস করে ফেলে তাকে সেই ধ্বংসের হাত থেকে মুক্তি পেতে হলে একে নষ্ট করে দিতে হবে।
আধঘণ্টা এইভাবে বসে থাকার পরে, কপালের ওপর হাতটা বুলালেন তিনি; তারপরে। তাড়াতাড়ি উঠে পড়লেন; পরিপাটি করে পোশাক পরলেন, অন্যান্য দিনের চেয়েও বেশি যত্ন নিলেন প্রসাধনে; পছন্দমতো নেকটাই পরলেন, বাছাই করে নিলেন একটা আংটি। অনেকক্ষণ ধরে চিবিয়ে-চিবিয়ে প্রাতরাশ খেলেন, চাকরদের এবারে কী ধরনের পোশাক তৈরি করিয়ে দেবেন তাই নিয়ে চাকরের সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ আলোচনা করলেন, চিঠিপত্র খুঁটিযে-খুঁটিয়ে পড়লেন। কয়েকটি চিঠি পড়ে তিনি হাসলেন; তিনটি চিঠি পড়ে বিরক্ত হলেন। একখানা চিঠি বারবার তিনি পড়লেন; তারপরে, ভ্রু কুঁচকে সেটিকে ছিঁড়ে ফেললেন। এই জাতীয় চিঠির সম্বন্ধেই লর্ড হেনরি একবার বলেছিলেন; একেই বলে মহিলাদের স্মৃতিচারণ। বাপরে বাপ, কী ভয়ানক!!
এক কাপ কালো কফি খাওয়ার পরে তোয়ালে দিয়ে ধীরে-ধীরে মুখ মুছলেন তিনি; চাকরকে অপেক্ষা করতে বলে লেখার টেবিলের দিকে উঠে গেলেন, সেখানে গিয়ে চিঠি লিখলেন দুটি। একটা তিনি নিজের পকেটে ঢুকালেন আর একটা তাঁর চাকরের হাতে দিয়ে বললেন: ফ্রান্সিস, এটা নিয়ে তুমি ১৫২ নং হার্ট ফোর্ড স্ট্রিটে যাও। মিঃ ক্যাম্পবেল যদি এখন শহরের বাইরে গিয়ে থাকেন তাহলে তাঁর ঠিকানাটা নিয়ে এস।
আবার তিনি একা, নিঃসঙ্গ। চাকরটি চলে যাওয়ার পরেই তিনি একটা সিগারেট ধরালেন; তারপরে এক টুকরো কাগজ নিয়ে ছবি আঁকতে বসলেন; প্রথমে আঁকলেন ফুলের ছবি, তারপরে ঘর-বাড়ির, তারপরে মানুষের মুখেরা আঁকতে আঁকতে হঠাৎ তিনি মন্তব্য করে বসলেন–বেসিল হলওয়ার্ডের মুখের সঙ্গে এই সব কটিরই কোথায় যেন একটা অদ্ভুত সাদৃশ্য রয়েছে। ব্যাপারটা বুঝতে পেরেই ভ্রুকুটি করে উঠে পড়লেন তিনি, বুক-কেস-এর দিকে এগিয়ে গেলেন। সেখান থেকে একখানা বই তুলে নিলেন। বাধ্য না হলে যা ঘটেছে তা নিয়ে আর তিনি আলোচনা করবেন না বলে মনোস্থির করে বসলেন।
