ব্যাপারটা বুঝতে না পেরে হলওয়ার্ড তাঁর দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। চারপাশে বন্ধ ঘরটার অবস্থা দেখে মনে হল অনেক দিন সেখানে কেউ বাস করেনি।
একটি বিবর্ণ ফ্লেমিশ গালচে, পর্দা দিয়ে ঢাকা একখানা বড়ো ছবি, একটি পুরনো ইটালিয়ান ক্যাসোনি, আর প্রায় খালি একটা বুক-কেস-ঘরের আসবাবপত্র বলতে মোটামুটি এই; তা ছাড়া রয়েছে একটা চেয়ার আর একটা টেবিল। কুলুঙ্গির ওপরে আধপোড়া একটা বাতি ছিল; ডোরিয়েন সেটা জ্বালানোর সঙ্গে-সঙ্গে দেখা গেল সারা ঘরটার ওপরে পুরু ধুলো জমেছে, মাঝে-মাঝে কার্পেটটা ফুটো হয়ে গিয়েছে। তাঁদের শব্দ পেয়েই একটা ইঁদুর ছুটে পর্দার পেছলে লুকিয়ে পড়ল। ব্যাঙের ছাতার ভিড়ে স্যাঁতসেঁতে গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে।
বেসিল, তোমার ধারণা একমাত্র ভগবানই মানুষের আত্মা দেখতে পান? তাই না? ওই পর্দাটা একপাশে টেনে দাও; তুমি আমার আত্মাটা দেখতে পাবে।
স্বরটা কেবল নিরুত্তাপই নয়, যথেষ্ট নিষ্ঠুর।
তাঁর দিকে ভ্রুকুটি করে হলওয়ার্ড বললেন: ডোরিয়েন, হ্য তুমি উন্মাদ হয়ে গিয়ে; না হয় তো, অভিনয় করছ।
ডোরিয়েন বললেন: পর্দাটা তুমি সরাতে চাও না? তাহলে আমি নিজেই তা সরিয়ে দিচ্ছি। এই বলে একটা হেঁচকা টান দিয়ে পর্দাটা খুলে ফেললেন তিনি; তারপরে মেঝের ওপরে ছুঁড়ে দিলেন সেটাকে।
ভয়ে হঠাৎ চিৎকার করে উঠলেন হলওয়ার্ড। সেই স্বল্প আলোতে মনে হল ক্যানভাসের ওপর থেকে একটা বীভৎস মুখ তাঁর দিকে কুটিল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে। সেই দৃষ্টির মধ্যে এমন একটা কিছু ছিল যা তাঁর মন ঘৃণা আর বিরক্তিতে ভরিয়ে তুলল। হায় ভগবান, যা তিনি দেখছেন তা কি ডোরিয়েন গ্রের মুখ? খুঁটিয়ে দেখলেন তিনি। সেই বীভৎসতার মধ্যে, চেহারা তার যত বিকৃতই হোক, সেই অপরূপ সৌন্দর্যকে একেবারে নষ্ট করতে পারেনি। ক্ষীয়মান কেশগুলির ওপরে এখনো কিছু রঙিন আভা ছড়িয়ে রয়েছে। ঠোঁট দুটির রঙ এখনো বিবর্ণ হয়ে যায়নি। ব্যভিচারে নিষ্প্রভ চোখ দুটি থেকে নীলাক্সন ছায়াটুকু এখনো একেবারে মুছে যায়নি; পাথরে কুঁদাই করার মতো সুন্দর নাক আর মসৃণ কণ্ঠ থেকে বঙ্কিম ভঙ্গিটির সৌন্দর্য এখনো নষ্ট হয়নি। হ্যাঁ, ডোরিয়েনের প্রতিকৃতিই বটে। কিন্তু কে একাজ করলে? এই রঙ-তুলি তো তাঁরই নিজের প্রেমের পরিকল্পনাও তো তাঁরই নিজস্ব। জ্বলন্ত বাতিটা তুলে নিয়ে প্রতিকৃতিটির সামনে এসে দাঁড়ালেন তিনি। ফ্রেমের বাঁ দিকের কোণে তাঁর নিজেরই নাম খোদাই করা রয়েছে।
ব্যাপারটা কেবল নিম্নশ্রেণির প্রহসনই নয়, ঘৃণ্য, নীচ বিদ্রূপও বটে। ঠিক এইরকম একটি ছবি তিনি আঁকতে পারেন না। তবু এ ছবি তাঁরই। তিনি তা জানতেন। মনে হল, মুহূর্তের মধ্যে তাঁর শরীরের সমস্ত গরম রক্ত জমে বরফ হয়ে গেল। এই কি তাঁর নিজের আঁকা ছবি? এর অর্থ কি? এর পরিবর্তন হল কেন? রুগ্ন মানুষের দৃষ্টি দিয়ে ডোরিয়েন গ্রের দিকে তিনি ফিরে তাকালেন। তাঁর মুখ বিকৃত হল; শুকিয়ে এল জিব। মুখ দিয়ে কোনো কথা বেরোতে চাইল না। তাঁর। কপালের ওপরে তিনি হাত বুলোলেন। চিটচিটে ঘামে ভিজে গিয়েছে কপালটা।
কোনো বড়ো অভিনেতার অভিনয় দেখার সময় মানুষে যেরকম একাগ্র দৃষ্টি দিয়ে বমঞ্চের দিকে তাকিয়ে থাকে, কুলুঙ্গিতে ঠেস দিয়ে ডোরিয়েনও সেইভাবে তাঁর দিকে তাকিয়ে বইলেন। সেই দৃষ্টির মধ্যে সত্যিকার কোনো দুঃখ অথবা আনন্দ বলে কিছু ছিল না। দর্শকের দৃষ্টি দিয়ে তাঁকে দেখছিলেন; সেই দৃষ্টির মধ্যে বিজয় অভিযানের কিছু ইঙ্গিতও যে একেবারে ছিল না সে কথাও সত্যি নয়। কোটের বোতাম থেকে একটা গোলাপ ফুল তুলে নিয়ে তিনি তা দেখছিলেন অথবা মনে হল যেন শুকছিলেন।
শেষ পর্যন্ত হলওয়ার্ডই চিৎকার করে উঠলেন: এ সবের অর্থ কী?
সেই তীক্ষ্ণ স্বর তাঁরই কানে কেমন যেন বেখাপ্পা শোনাল।
ফুলটা হাতের ভেতরে চটকে ডোরিয়েন বললেন: অনেক দিন আগে, আমি তখন ছেলেমানুষ দিলাম, তোমার সঙ্গে যখন আমার প্রথম আলাপ হল সেই সময় আমার নিজের দেহের সৌন্দর্য সম্বন্ধে সজাগ থাকতে তুমি আমাকে শিক্ষা দিয়েছিলো একদিন তোমার একটি বন্ধুর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়েছিলে। যৌবনের বিস্ময় বলতে কী বোঝায় সে-কথা আমাকে। বুঝিয়ে দিয়েছিল। তুমি আমার প্রতিকৃতি শেষ করলে। আমি যে কত সুন্দর সে কথা তখনই আমি বুঝতে পারলামা মুহূর্তের উত্তেজনায়, আমি এখনো ভানি নে তার জন্যে আমি দুঃখিত কি না, আশা করেছিলেম, তুমি সেটাকে প্রার্থনাও বলতে পার…
আমার তা মনে আছে। খুব ভালোভাবেই মনে রয়েছে। না, না, সে অসম্ভব। এই ঘরটা। স্যাঁতসেঁতো ক্যানভাসের ওপরে ব্যাঙের ছাতার মতো একটা আবরণ পড়েছে যে রঙ দিয়ে আমি এটা এঁকেছিলাম নিশচয তার ভেতরে কিছু ধাতব বিষ মেশানো ছিল। আমি তোমাকে বলছি–এ অসম্ভব ঘটনা।
জানালার ধারে এগিয়ে গিয়ে শিশির-ভেজা শার্সির গায়ে মাথাটা চেপে ডোরিয়েন বললেন; অসম্ভব ঘটনাটা কী?
ছবিটাকে তুমি নষ্ট করে ফেলেছ–এই কথাই তুমি আমাকে বলেছিলে।
সেটা মিথ্যে কথা। ছবিটাই আমাকে নষ্ট করেছে।
আমি বিশ্বাস করি নে এটা আমার আঁকা ছবি।
ডোরিয়েন তিক্তভাবে জিজ্ঞাসা করলেন: তোমার আদর্শ এর মধ্যে খুঁজে পাচ্ছ না?
আমার আদর্শ, যা তুমি বলছ…
