সোফা থেকে প্রায় লাফিয়ে উঠলেন ডোরিয়েন; ভয়ে মুখটা তাঁর প্রায় সাদা হয়ে উঠল, তিনি বিড়বিড় করে বললেন: আমার আত্মাকে দেখা!
গম্ভীরভাবে আর বেশ গভীর দুঃখের সঙ্গে হলওয়ার্ড বললেন, হ্যাঁ, তোমার আত্মাকে আমি দেখতে চাই কিন্তু একমাত্র ভগবানই তা পারেন।
ডোরিয়েনের ঠোঁটের ভেতর থেকে উপহাসের একটা তিক্ত হাসি বেরিয়ে এল।
তুমি নিজেই তা দেখবে এস, আজই, আজ রাত্রেই–টেবিল থেকে বাতিটা নিয়ে চিৎকার করে বললেন তিনি এস। এটা তোমার নিজের হাতেই তৈরি হয়েছে। তুমি তা দেখতে পাবে না। কেন? ইচ্ছে হলে পরে একথা তুমি বিশ্বাবাসীকে জানাতে পার। কেউ তোমাকে বিশ্বাস করবে না। যদি তারা তা করে তাহলে তারা আমাকে আরো বেশি পছন্দ করবে। এই যুগের পহষ্ক যত সাফাই-ই তুমি গাও না কেন আমি একে ভালো করেই চিনি। আমি বলছি, আমার সঙ্গে তুমি এস। ব্যভিচারের বিরুদ্ধে অনেক বকবক করেছ তুমি। এবার তুমি তা নিজের চোখে দেখতে পাবে।
তাঁর প্রতিটি কথার মধ্যে একটা গর্বের আবেগ ঝরে পড়ল। ছেলেমানুষের মতো দম্ভভরে তিনি মাটিতে পা ঠুকলেন। দ্বিতীয় কেউ তাঁর জীবনের গোপন রহস্যের অংশীদার হবে এই চিন্তায় তিনি একটা ভয়ঙ্কর আনন্দ পেলেন। তাঁর লজ্জা আর অপমানের মূলাধার সেই প্রতিকৃতিটি যিনি নিজের হাতে এঁকেছেন সেই কীর্তির ভয়ঙ্কর স্মৃতিটা তাঁকেও যে বাকি জীবনটা বযে। বেড়াতে হবে এই ভেবে ডোরিয়েনের মন পৈশাচিক উল্লাসে নেচে উঠল।
তাঁর কাছে সরে এসে এবং তাঁর কঠোর চোখ দুটির দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে ডোরিয়েন আগের কথারই পুনরুক্তি করলেন; হ্যাঁ। আমার আত্মা আমি তোমাকে দেখাব। যা একমাত্র ভগবানের দেখার কথা বলে তোমার মনে হয়েছিল সেই জিনিসটাই নিজের চোখে তুমি দেখতে পাবে।
হঠাৎ ঘুরে দাঁড়ালেন হলওয়ার্ড বললেন: ডোরিয়েন, ভগবানের কুৎসা করছ তুমি। ওরকম কথা বলা তোমার উচিত নয় কথাগুলি কেবল বিপজ্জনকই নয়, অর্থহীন।
আবার হাসলেন ডোরিয়েন: তাই মনে হচ্ছে তোমার?
হ্যাঁ। আজ রাত্রে তোমাকে যে-সব কথা বললাম সেগুলি তোমারই মঙ্গলের জন্যে। তুমি জান, আমি চিরদিনই তোমার সত্যিকার বন্ধু।
আমাকে ছুঁয়ো না। তোমার বলা শেষ কর।
চিত্রকরের মুখের ওপরে বেদনার একটা জ্বালা তড়িৎগতিতে ফুটে উঠে মিলিয়ে গেল। একটু থামলেন তিনি। কেমন যেন মায়া হল তাঁর। ঘটনা যাই হোক, ডোরিয়েন গ্রের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে মাথা ঘামানোর কী অধিকার তাঁর রয়েছে! তাঁর সম্বন্ধে যে-সব কুৎসা ছড়িয়েছে তার কিছুটাও যদি সত্যি হয় তাহলেই কি কম কষ্ট তিনি পেয়েছেন? তারপরেই তিনি সোজা। হয়ে দাঁড়ালেন, এগিয়ে গেলেন ফায়ার প্লেসের কাছে; তাকিয়ে রইলেন জ্বলন্ত কাঠ, কুয়াশার মতো ছাই, আর কেঁপে-কেঁপে ওঠা আগুনের শিখাগুলির দিকে।
শক্ত এবং পরিচ্ছন্ন সুরে ডোরিয়েন বললেন, আমি অপেক্ষা করছি, বেসিল।
ঘুরে দাঁড়ালেন বেসিল, বললেন: তোমার বিরুদ্ধে যে সব অভিযোগ উঠেছে সেগুলির উপযুক্ত জবাব তুমি আমাকে দেবে আমি কেবল এইটুকুই বলতে চাই। তুমি যদি বল গোড়া থেকে শেষ পর্যন্ত অভিযোগগুলি একেবারে মিথ্যা, আমি তাই বিশ্বাস করবা ডোরিয়েন, অভিযোগগুলি। অস্বীকার কর তুমি, কী গভীর উৎকণ্ঠায় আমি ভুগছি তা কি তুমি দেখতে পাচ্ছ না? ভগবানের দিব্যি, তুমি আমাকে বলো না যে তুমি খারাপ, ব্যভিচারী, আর ঘৃণ্য।
ডোরিয়েন গ্রে হাসলেন। তাঁর ঠোঁটের ওপরে ঘৃণার বাঁকা রেখা ফুটে বেরোল। তিনি শান্তভাবে বললেন: ওপরে চল বেসিল। প্রতিদিনের রোজনামচা আমি লিখে রাখি। যে-ঘরে এটি লিখি সে-ঘরের বাইরে সেটি যায় না। আমার সঙ্গে এলে আমি সেটি তোমাকে দেখাব।
তুমি যদি তাই চাও, আমি যাব ডোরিয়েন। মনে হচ্ছে ট্রেন ফেল করেছি আমি। তাতে কিছু যায় আসে না। কাল যেতে পারি। কিন্তু আজ রাত্রিতে কিছু পড়তে আমাকে বলো না। আমি যা চাই তা হচ্ছে আমার প্রশ্নগুলির সোজা উত্তর।
উত্তর আমি ওপরেই দেব। এখানে সে উত্তর আমি দিতে পারব না। বেশি পড়তে হবে না তোমাকে
.
ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদ
ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন তিনি, সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে লাগলেন। তাঁর পিছু পিছু চললেন বেসিল হলওয়ার্ড। নিশিতে পাওয়া মানুষের মতো ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগলেন তাঁরা। জ্বলন্ত বাতি থেকে বেরিয়ে ভূতুড়ে ছায়াগুলি সিঁড়ি আর দেওয়ালের চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল। বাইরের ঝড়ো বাতাসে জানালার খড়খড়িগুলো খটখট করে শব্দ করতে লাগল।
সিঁডির শেষ ধাপে উঠে ডোরিয়েন বাতিটাকে মেঝের ওপরে নামিয়ে রাখলেন; তারপর চাবি বার করে তালাটা খুলে ফেললেন। দরজা খুলে আস্তে-আস্তে জিজ্ঞাসা করলেন তিনিঃ তুমি জানতে চাও, এই না বেসিল?
চাই।
হেসে বললেন ডোরিয়েন: তোমার কথা শুনে আমি খুশি হয়েছি।
তারপরে একটু রূঢ়ভাবেই তিনি বললেন: পৃথিবীতে তুমিই একমাত্র মানুষ আমার সম্বন্ধে সব কিছু জানার যার অধিকার রয়েছে। তুমি যতটুকু ভাবছ আমার জীবন নিয়ে তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু করার প্রয়োজন তোমার রয়েছে।
এই পর্যন্ত বলে বাতিটা তুলে নিয়ে ঘরের মধ্যে ঢুকে গেলেন তিনি। একতাল ঠান্ডা বাতাস তাঁদের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল। বিশ্রী রকমের লাল হয়ে শিখাটা হঠাৎ কেঁপে একবার উঁচু হয়ে উঠল। শিউরে উঠলেন তিনি। বাতিটা টেবিলের ওপরে রেখে তিনি ফিসফিস করে বললেন: দরজাটা বন্ধ করে দাও।
