দুটো ঠোঁট কামড়িয়ে ঘৃণার সঙ্গে ডোরিয়েন বললেন: বেসিল, চুপ করা এমন সব বিষয় নিয়ে তুমি আলোচনা করছ যাদের সম্বন্ধে তুমি কিছুই জান না। আমি ঘরে ঢুকলে বারউইক মেই ঘর ছেড়ে উঠে যায় কেন সে প্রশ্ন তুমি আমাকে করেছ। তার কারণ এই নয় যে সে আমার সম্বন্ধে বিশেষ কিছু জানে, তার কারণ হচ্ছে এই যে তার সম্বন্ধে আমি সব কিছু ভানি। ধমনীতে তার যে বিষাক্ত রক্ত বইছে তারপরেও সে কেমন করে পরিষ্কার থাকবে? হেনরি অ্যাসটন আর যুবক পার্থের কথা তুমি আমাকে বলেছ। আমি কি প্রথম লোকটিকে পাপ কাজ করতে শিখিযেছি না, লমপট হওয়ার মদত দিয়েছি দ্বিতীয় মানুষটিকে? যদি কেন্টের মুখ। ছেলে বন্তীর মেয়েকে বিয়ে করে তাতে আমার কী যায় আসে? যদি আদ্রিয়ান সিঙ্গলটন বিলের ওপরে তার বন্ধুর নাম ভাল করে তার জন্যে কৈফিযৎ দেওয়ার কথা কি আমার? ইংলন্ডের লোকেরা সব বিষয়েই কী রকম হইচই করে তা আমি জানি। নোংরা খাবার টেবিলের ধারে বসে এখানকার মধ্যবিত্ত সম্প্রদায় নিজেদের নৈতিক কুসংস্কার নিয়ে মহা আড়ম্বরে ঢাক-ঢোল পেটায; অভিজাত সম্প্রদায়ের লাম্পট্য নিয়ে তারা দেদার আলোচনা করে এইটা প্রমাণ করার জন্যে যে তারা অতিশয় চতুর, আর যাদের তারা কুৎসা করছে তাদের সঙ্গে তারা ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত। এদেশে পরের কুৎসা কুড়ানোর যোগ্যতা তাদেরই রয়েছে যারা অভিজাত আর বুদ্ধিমান। যারা নিজেদের নীতি নিয়ে এত বড়াই করছে তাদের দৈনন্দিন জীবনটাই বা কী? বন্ধুবর, তুমি ভুলে যাচ্ছ যে আমরা সবাই কপট মানুষের সমাজে বাস করছি।
হলওয়ার্ড একটু জোরেই বললেন: ডোরিয়েন, কথাটা তা নয়। সেদিক থেকে ইংলন্ড যে যথেষ্ট খারাপ, আর এখানকার সমাজ যে ভুল ছাড়া কিছু ঠিক করে না তা আমি জানি। সেই জন্যেই আমি চাই তুমি পরিচ্ছন্ন হও। কিন্তু তুমি তা হতে পারনি। প্রভাব বিস্তারের ফলে যে প্রতিক্রিয়া দেখা যায় তারই পরিপ্রেস্কিতে মানুষকে বিচার করার অধিকার আমাদের রয়েছে। মনে হচ্ছে সম্ভ্রমবোধ, সততা, আর চারিত্রিক নিষ্কলুষতা সবই তুমি হারিয়ে ফেলেছে। তুমি তাদের ভোগের উন্মাদনায় উন্মত্ত করে তুলেছ, অধঃপাতের অতল গহ্বরে তলিয়ে গিয়েছে তারা। তুমি তাদের সেই পথে পরিচালিত করে। হ্যাঁ, তুমি তাদের পরিচালক। তবু তুমি হাসতে পার, ঠিক এখন যেমন তুমি হাসছ। কিন্তু বিপদটা এখানেই শেষ নয়। আমি জানি তুমি আর হেনরি অচ্ছেদ্য। অন্য কোনো কারণ না থাকলেও, ঠিক সেই কারণেই তার বোনের কলক রটনা করাটা তোমার উচিত হয়নি।
সাবধান বেসলি; তোমার কথার ঝাঁঝটা বড়ো বেশি তীব্র হয়ে পড়ছে।
তাহলেও, আমাকে তা বলতেই হবে; আর তোমাকে সেকথা শুনতেই হবে। শুনতে তুমি বাধ্য। তোমার সঙ্গে লেডি গিয়েনদোলেনের যখন প্রথম পরিচয় হয় তখন তাঁর বিরুদ্ধে কুৎসার একটি বাণীও কারও মুখ থেকে বেরোয়নি। আডকে লন্ডনে এমন একটি ভদ্রমহিলাকেও কি খুঁজে পাওয়া যাবে যিনি তাঁর সঙ্গে গাড়িতে পাশাপাশি বসে পার্কে বেড়াতে যেতে রাজি হবেন? অপরের কথা না হয় ছেড়েই দিলাম। তাঁর নিজের ছেলেমেয়েদের পর্যন্ত তাঁর কাছে থাকতে দেওয়া হয় না। তাছাড়া, তোমার সম্বন্ধে আরো অনেক কুৎসিত কথা প্রচারিত হয়েছে সেগুলির সম্পর্কেই বা বলার কী রয়েছে তোমার? শোনা যায় খুব সকালে নাকি বেশ্যাবাডি থেকে সে ঢাকা দিয়ে তুমি বেরিয়ে আস; আবার সন্ধের পরে লোকের চোখে ধুলো দিয়ে তুমি বারবনিতাদের বাড়িতে ঢুকে পড়া এসব কথা কি সত্যি? এসব কাহিনি কি সত্যি হতে পারে? এসব কথা যখন প্রথম আমার কানে এল তখন আমি হেসেছিলাম। এখন সে-সব কথা শুনে আমি ভয়ে কেপে উঠি। শহরের বাইরে যে বাগানবাড়ি রয়েছে সেটাই বা কী? সেখানে তুমি যে জীবন যাপন কর তার সম্বন্ধেই বা। বলার কী রয়েছে তোমার? ডোরিয়েন, লোকে তোমার নামে কী বলে তা তুমি জান না। তোমার কাছে আমি সৎ ভাষণ দেব না এমন কোনো কথা আমি বলব না। মনে আছে হেনরি একবার বলেছিল দু’দিনের যোগীরা সব সময়েই ওইরকম কথা বলেই এগিয়ে আসে; তারপরে প্রথম চোটেই সেটা তারা ভেঙে ফেলে। আমি তোমাকে সৎ পথে ফিরিয়ে আনতে চাই। আমি চাই তুমি এমন জীবন যাপন কর যাতে সবাই তোমাকে সম্মান করতে পারে তোমার নামের সঙ্গে যে কলঙ্ক জড়িয়ে রয়েছে, আমি চাই সেই কলঙ্ক মুছে ফেলে তুমি একটি পরিচ্ছন্ন। জীবনের পথে এগিয়ে এস। যে সমস্ত নোংরা লোকের সঙ্গে তুমি মেলামেশা করছ, আমি চাই তাদের সঙ্গ তুমি পরিত্যাগ কর। ওভাবে উপহাস করো না আমাকে। নিজের সম্বন্ধে অতটা উদাসীন হয়ো না। মানুষের ওপরে তোমার প্রভাব নিঃসন্দেহে অনস্বীকার্য কিন্তু সেই প্রভাব কুপথে পরিচালিত না করে মানুষকে সুপথে পরিচালিত করুক। লোকে বলে যাদের সঙ্গেই তোমার হৃদ্যতা জন্মায় তাদেরই তুমি খারাপ পথে নিয়ে যাও; আর কারও বাড়িতে তুমি পা। দিলেই লোকে ধরে নেবে যে এবারে সেখানে একটা নোংরা জিনিস ঘটবে। এটা সত্যি কি না। তা আমি জানি নে কী করেই বা জানব? কিন্তু তোমার সম্বন্ধে এই রকমেরই একটা ধারণা। জন্মেছে সকলেরই মুনে। আমি এমন সব ঘটনার কথা শুনেছি যেগুলিকে মিথ্যা বলে উড়িযে দেওয়া অসম্ভব। সেই অক্সফোর্ড থেকেই লর্ড গ্লসেস্টার আমার একজন প্রিয় বন্ধ। তিনি। আমাকে একটি চিঠি দেখালেন। চিঠিটি তাঁর স্ত্রীর। মেনটোল-এর বাগানবাড়িতে নিঃসঙ্গ মৃত্যুশয্যায় শুয়ে তিনি তাঁর স্বামীকে সেই চিঠিটি লিখেছিলেন। সেখানে তিনি যে স্বীকারোক্তি করেছেন তার মধ্যে তোমার নাম কুৎসিত ভাবে জড়ানো রয়েছে। এরকম ভযানক স্বীকারোক্তি জীবনে আর কখনো আমি পড়িনি। আমি প্রতিবাদ করে। বলেছিলাম–এ কথা অসম্ভব, আমি বিশ্বাস করি নে, আমি তাকে ভালোভালেই জানি এরকম কাজ সে কোনোদিন করতে পারে না। তোমাকে কি আমি জানি? আমার অবাক লাগে ভাবতে তোমাকে সত্যিই আমি জানি কি না। এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে তোমার আত্মাটাকে আমার দেখা উচিত।
