এঁদের সকলেরই একটা ভয়ঙ্কর আকর্ষণ ছিল। রাত্রিতে ডোরিয়েন এঁদের ছবি দেখতেন; দিনের বেলায় এঁরা তাঁর কল্পনাকে বিব্রত করে তুলত। রেনাসাঁর যুগে অদ্ভুত-অদ্ভুত উপায়ে মানুষকে বিষ খাইয়ে মারা হত; কোথাও শিরস্ত্রাণে বিষ মাখিযে, কোথাও জ্বলন্ত টর্চ বিষাক্ত করে, কোথাও নকশাকাটা দস্তানা কোথাও মুক্তাখচিত পাখা দিয়ে। ডোরিয়েন গ্রে বিষাক্ত হয়েছিলেন বই পড়ে। এমন মুহর্তও তাঁর এসেছিল যখন নিছক সৌন্দর্য উপভোগের উপায়। হিসাবেই অমঙ্গলকে তিনি গ্রহণ করতেন।
.
দ্বাদশ পরিচ্ছেদ
দিনটা হল নভেম্বর মাসের ন’তারিখ। যেদিন তিনি আটতিরিশ বছরে পড়লেন তার আগের রাত্রি। পরে এই দিনটির কথাই তাঁর বেশি মনে দিল।
রাত্রি প্রায় এগারোটা হবে। লর্ড হেনরির বাড়ি থেকে ডিনার খেয়ে ফিরছিলেন তিনি। রাত্রিটা ঠান্ডা কনকনে। ঘন কুয়াশা জমেছিল আকাশে। মোটা ফারের কোট ছিল তাঁর গায়ে। গ্রসভেনর স্কোয়ার আর সাউথ অডলি স্ট্রিটের কোণে সেই অন্ধকারে একটি লোক তাঁর পাশ দিয়ে পেরিয়ে গেলেন। লোকটি বেশ দ্রুতই হাঁটছিলেন; ধূসর রঙের আলেস্টারের কলারটা তাঁর ওলটানো ছিল। তাঁর হাতে ছিল একটা ব্যাগ। চিনতে পারলেন ডোরিয়েন পথচারী হচ্ছেন বেসিল হলওয়ার্ড হঠাৎ কী ডানি কেন ভয় পেয়ে গেলেন তিনি। পথচারীকে চেনার কোনো লক্ষণ না দেখিযে তিনি নিজের বাড়ির দিকে হন-ইন করে এগিয়ে চললেন।
কিন্তু তুলওযার্ড তাঁকে দেখতে পেলেন। ডোরিয়েন বেশ বুঝতে পারলেন হলওয়ার্ড ফুটপাতের ওপরে দাঁড়িয়ে পড়েছেন। তারপরেই তিনি দ্রুতগতিতে তাঁর দিকে এগিয়ে এলেন। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে তাঁর হাত ডোরিয়েলের হাত সস্পর্শ করল।
ডোরিয়েন, কী ভাগ্য! প্রায় ন’টা থেকে তোমার লাইব্রেরিতে তোমার জন্যে আমি অপেক্ষা করছিলাম। শেষ পর্যন্ত তোমার চাকরের ওপরে কেমন যেন দয়া হল আমার বেরিয়ে আসার সময় সে দরজা খুলে দিল। আমি তাকে শুয়ে পড়তে বললাম। আজ রাত্রির ট্রেনেই আমি প্যারিসে চলে যাচ্ছিা যাওয়ার আগে বিশেষ করে তোমার সঙ্গেই আমি দেখা করতে। চেয়েছিলাম। আমার পাশ দিয়ে পেরিয়ে যেতে মনে হল তোমাকে আমি দেখেছি-অথবা, তোমার ওই ফার কোটটাকে। কিন্তু আমি ঠিক বুঝতে পারিনি। তুমি কি চিনতে পারনি আমাকে?
প্রিয় বেন্সিল, এই কুয়াশায়? কী যে বল! গ্রসভেনর স্কোয়ারটাকেও চিনতে পারছি নো মনে হচ্ছে আমার বাড়িটা এরই কাছাকাছি একটা ভাযায হবে; কিন্তু ঠিক কোন ভাষায় সেটা ঠাহর হচ্ছে না। অনেক দিন তোমার সঙ্গে দেখা হয়নি। তাই তুমি চলে যা বলে বেশ কষ্ট হচ্ছে আমার। কিন্তু মনে হচ্ছে, তাড়াতাড়িই ফিরে আসছ তুমি!
না, ছ’মাসের জন্যে ছেড়ে আমি চলে যাচ্ছি। ঠিক করেছি প্যারিসে একটা স্টুডিযো নেব, সত্যিকার বিরাট একটা কিছু কাজ করার ইচ্ছে হয়েছে আমার। যতদিন না সেকাজ শেষ হয়। ততদিন পর্যন্ত স্টুডিয়ো ছেড়ে আমি বাইরে বেরোব না। যাই হোক, নিজের কোনো কথা । তামাকে আমি বলতে চাই তো তোমার বাড়ির সামনে এসে গিয়েছি আমরা। চল, একটু বসে যাই, তোমাকে কিছু বলার রয়েছে আমার।
খুব খুশি হব আমি। কিন্তু তুমি ট্রেন ফেল করবে না?
সিঁড়িতে উঠে “ল্যাচ কী” দিয়ে দরজাটা খুলতে-খুলতে বেশ ক্লান্ত স্বরেই প্রশ্ন করলেন ডোরিয়েন।
ঘন কুয়াশার ভেতর দিয়ে বাতির আলো বেশ কষ্ট করেই বেরিয়ে এল বাইরে। সেই আলোতে হাত-ঘড়ির দিকে তাকিয়ে হলওয়ার্ড বললেন; এখনো অনেক সময় রয়েছে। বারোটা পনেরোর আগে ট্রেন ছাড়ছে না। সত্যি কথা বলতে কি তোমার সঙ্গে দেখা করার জন্যেই আমি ক্লাবের দিকে যাচ্ছিলাম; হঠাৎ রাস্তায় তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। দেখতেই পাচ্ছ ভারী লাগেজ পাঠাতে আমার দেরি হবে না; সেগুলি আমি আগেই পাঠিয়ে দিয়েছি। আমার কাছে রয়েছে কেবল এই ব্যাগটা। ভিকটোরিযা স্টেশনে পৌঁছতে আমার কুড়ি মিনিটের বেশি সময় যাবে না।
তাঁর দিকে তাকিয়ে ডোরিয়েন একটু হাসলেন।
তোমার মতো একজন শৌখিন চিত্রকরের এইভাবে বেড়াতে যাওয়ার রীতিটি নিঃসন্দেহে চমৎকার। একটা গ্লাডস্টোন ব্যাগ আর একখানা আলেস্টার। ভেতরে এস; দরজা খুলে রাখলে কুয়াশা ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়বে। কিন্তু একটা কথা মনে রেখা কোনো সিরিয়ান্স আলোচনা তুমি করবে না। আজকাল সিরিয়াস বলে কোনো জিনিসেরই অস্তিত্ব নেই। অন্তত, থাকা উচিত নয়।
ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে হলওয়ার্ড নিজের মাথাটা নাড়লেন; তারপরে ডোরিয়েলের পিছু পিছু লাইব্রেরিতে হাজির হলেন। বড়ো খেলা উনুনে কাঠের আগুন গনগন করছিল। বাতি। জ্বালানো হল। একটা রুপোর ডাচ সিপরিট কেস-এর ওপরে সোডার বোতল, বড়ো গ্রাম। কয়েকটা বসানো ছিল।
ডোরিয়েন, তোমার অনুপস্থিতিতে তোমার চাকর আমার যথেষ্ট সেবা করেছে। আমার সব কিছু প্রয়োজন সে স্বেচ্ছাতেই মিটিয়েছে; এমন কি তোমার সবচেয়ে দামি সিগারেট পর্যন্ত আমাকে দিতে সে কোনোরকম কুণ্ঠাবোধ করেনি। অতিথিবৎসল হিসাবে সে পয়লা নম্বরী। তোমার আগের সেই ফরাসি চাকরের চেয়ে একে আমার বেশি ভালো লেগেছে। আচ্ছা, সেই লোকটি কোথায়?
কাঁধ কুঁচকে ডোরিয়েন বললেন: মনে হচ্ছে, সে লেডি ব্রাডিলির ঝিকে বিয়ে করেছে। বৌকে সে প্যারিসে ইংরেজ দজি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে, ওখানে এই জাতীয় ফ্যাশনের বেশ দাম রয়েছে। ফরাসিরা কী বোকা, তাই না? কিন্তু তুমি কি জান, চাকর হিসাবে লোকটি মোটেই খারাপ ছিল না। আমি তাকে কোনোদিনই পছন্দ করতাম না সত্যি কথা; কিন্তু তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করার মতো কিছু আমার ছিল না। মানুষে প্রায় এমন অনেক জিনিস কল্পনা করে থাকে যেগুলি চরিত্রের দিক থেকে উদ্ভট। সেও আমার খুব অনুরক্ত ছিল। চলে যাওয়ার সময় বেশ কষ্টই হয়েছিল তার। আর একটু ব্র্যানডি আর সোডা নাও। না, “হক আর সেলডার” নেবে? আমার কিন্তু হক আর সেলটজারই ভালো লাগে বেশি। পাশের ঘরে নিশ্চয় কেউ রয়েছে।
