তবু নিজের জাতের মতো সাহিত্যেও মানুষ তার পূর্বপুরুষদের সন্ধান পেত, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে সম্ভবত বেশি নৈকট্য অনুভব করত সে এবং নিশ্চয় তাদের প্রভাব যে তার ওপরে পড়ত সেকথা সে জানত। মাঝে-মাঝে ডোরিয়েন গ্রের মনে হত যে সমস্ত ইতিহাসটাই যেন তাঁর জীবনের কর্মতালিকাযা তিনি করতেন সেগুলির নয়; যা তিনি করবেন বলে মনে করতেন। যে সমস্তু অদ্ভুত এবং বিপজ্জনক অভিনেতারা পৃথিবীর রঙ্গমঞ্চে পাপকে এমন রমণীয় করে তুলেছে, অমঙ্গল করেছে সূক্ষম কারুকার্যের সামিল যাকে ব্যাখ্যা করা সত্যিকার দুরুহ, তাঁর মনে হত তিনি যেন তাদের বেশ ভালোভাবেই চেনেন। তিনি ভাবতেন কোনো এক দুযে রহস্যের মাধ্যমে তাঁর জীবন তাদের জীবনের সঙ্গে মিশে গিয়েছে।
অনবদ্য উপন্যাসের যে নায়ক তাঁর জীবনের ওপরে অতটা প্রভাব বিস্তার করেছিলেন, তিনি তাঁর সেই অদ্ভুত খেয়ালের কথা জানতেন। উপন্যাসের সপ্তম পরিচ্ছেদ তিনি। বলেছেন-বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার ভয়ে, ফুলের মুকুট পরে তাইবেরিয়াস-এর মতো তিনি ক্যাপ্রিয় বাগানে বসেছিলেন, বসে-বসে এলিফ্যানটিস-এর জঘন্ন বইগুলি পড়ছিলেন। বামন আর ময়ূরের দল তাঁর চারপাশে মাথা উঁচু করে ঘুরে বেড়াচ্ছিল আর বাঁশীর সুরের রেশ সুগন্ধী ধূপের বক্ৰগতিকে উপহাস করছিল। তার পরে ক্যালিগুলার মতো আস্তাবলে সবুজ শার্ট পরা ডাকিদের আদর করে ভাগিয়ে দিলেন এবং হিরে বসানো জিম দিয়ে মোড়া ঘোড়াটার সঙ্গে হাতির দাঁতের তৈরি গামলায় তিনি ভোজন করলেন। মার্বেল পাথরে বাঁধানো সারি-সারি আয়নার ধার দিয়ে ডোমিতিযেনের মতো লম্বা বারান্দার ভেতর দিয়ে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন; ভোগের আয়োজনে জীবনের পাত্র উপছে পড়ার ফলে যার জীবনে বাঁচার সমস্ত আনন্দে নষ্ট হয়ে যায় সেই রকম মানুষের মতো নিজের দেহটাকে নষ্ট করার জন্যে শীর্ণ দুটো চোখ দিয়ে সেই সারিবদ্ধ আয়নাগুলির মধ্যে তিনি ছোরার ছায়া খুঁজে বেড়াতে লাগলেন। পরিষ্কার পান্নার ভেতর দিয়ে সার্কাসের রক্তাভ ধ্বংসাবশেষের দিকে উঁকি দিয়ে দেখলেন; তারপরে সাদা খচ্চরবাহিত লাল মুক্তাখচিত পালকিতে চড়ে পমে গ্রনেটের রাস্তার ওপর। দিয়ে তিনি স্বর্ণ মন্দিরের দিকে এগিয়ে গেলেন। ইলোব্যালাস-এর মতো নিজের মুখ তিনি। রঙ দিয়ে ছাপিয়ে নিলেন, মহিলাদের মধ্যে বার বার অবিশ্বাস ছড়ালেন, কার্থেজ নিয়ে এসে সূর্যের সঙ্গে বিয়ে দিলেন তাঁরা কী করে দিলেন সে রহস্য আডও কেউ বুঝতে পারেনি।
এই আজগুবি পরিচ্ছেদটি ডোরিয়েন বার-বার পড়তেন; তার ঠিক পরের দুটি পরিচ্ছেদ তাঁকে যথেষ্ট আকর্ষণ করেছিল। পরিচ্ছেদ তো নয়; সূক্ষ্ণ কারুকার্য করা জাজিমের মতো। তার ওপরে নিপুণ চাতুর্যের সঙ্গে আঁকা ছিল কতকগুলি ভীতিপ্রদ আর সেই সঙ্গে সুন্দর মূর্তি, সেই মূর্তিগুলিকে পাপ, রক্ত, আর ক্লান্তি দানবীয় অথবা উন্মত্ত করে তুলেছিল; সেই মূর্তিগুলির চরিত্রগুলির বলাই ভালো, একটি হচ্ছে মিলানের ডিউক ফিলিপোর। তিনি তাঁর স্ত্রীকে হত্যা করে তাঁর ঠোঁটের ওপরে লাল রঙের বিষ মাখিয়ে রঙিন করে রেখেছিলেন। উদ্দেশ্য যে দেহটিকে তিনি আদর করতেন সেই স্ত্রীর মৃত ঠোঁট দুটি চুম্বন করে তাঁর প্রেমিক যেন মৃত্যু বরণ করেন। আর একটি চরিত্র হচ্ছে ভেনিসবাসী পিঘাত্রো বারবি-ইনি পরিচিত ছিলেন দ্বিতীয় পল নামে। দম্ভের বশবর্তী হয়ে তিনি ফরমোসাস-এর খেতাব গ্রহণ করতে। চেয়েছিলেন। তাঁর মুকুটের দাম দু’হাজার ফ্লোরিন। ওই মুকুটটি সংগৃহীত হয়েছিল ভয়ঙ্কর পাপের পথে আর একটি চরিত্র হচ্ছে গ্যিাঁ মারিযা ভাইকেতি। জীবন্ত মানুষের পেছনে তিনি ডালকুত্তা ছেড়ে দিতেন। তাঁর নিহত দেহটিকে তাঁর প্রেমিকা বারবনিতা গোলাপ ফুলে ঢেকে দিয়েছিলেন। সাদা ঘোড়ার পিঠে বর্জিয়াকেও দেখা যাবে সেখানে। তাঁর পাশে ঘোড়ার পিঠে চলেছেন ফ্রাট্রিসাইড। তাঁর বড়ো ঢিলে জামাটি পেরোত্তোর রক্তে ভেজা। আর রয়েছেন ফ্লোরেন্স-এর যুবক কার্ডিনেল আর্কবিশপ পিয়েত্রা রিয়েরিযো-ইনি হচ্ছেন চতুর্থ। সিক্সতাস-এর পুত্র এবং প্রিয়পাত্র। তাঁর সৌন্দর্য যেমন অপরূপ, লাম্পট্যও তেমনি সীমাহীন। সাদা এবং গাঢ় লাল সিল্কের তাঁবুতে আরাগনের লিওনোরাকে তিনি অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন। সেই তাঁবুতে ছিল অপ্সরীর দল, আর ছিল একরকমের জীব-প্রাচীন গ্রীক কাহিনিতে যারা ছিল অর্ধেক মানুষ আর অর্ধেক ঘোড়া। গ্যানিমিড অথবা হাইলাস-এর মতো ভোডের সভায় উৎসর্গ করার জন্য একটি ছেলেকে তিনি সাজিয়েছিলেন। সেই সঙ্গে ছিলেন এভেলিন। মৃত্যুর দৃশ্য ছাড়া তাঁর বিষাদকে নষ্ট করা যেত না। মানুষের যেমন লাল মদের দিকে ঝোঁক থাকে তাঁর তেমনি ঝোঁক ছিল লাল রক্তের ওপরে। শয়তানের বাচ্চা বলে পরিচিত ছিলেন তিনি আরো শোনা যায় নিজের আত্মার সদগতির জন্যে নিজের বাবাকে পাশা খেলায় তিনি হারিয়ে দিয়েছিলেন। সেই জন্যে ছিলেন গিয়ামবাতিস্তা সিবো। মানুষটি রসিকতা করে নিজের নাম নিয়েছিলেন ‘ইনোসেন্ট’ বলে। তাঁর অসাড় শিরার মধ্যে একজন জুইস ডাক্তার তিনটি ছেলের দেহের রক্ত ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। ইসোতার প্রেমিক এবং রামিনির লর্ড সিগিসমনদো মালাতেস্তাকেও দেখা যাবে সেখানে। দেবতার শত্রু হিসাবে রোমে তাঁর কুশপুত্তলিকা পোড়ানো হয়। গলায় একখানা রুমাল বেঁধে তিনি পলিসেনাকে হত্যা করেছিলেন, পান্নার কাপে করে বিষ দিয়েছিলেন জিনেভ্রাকে এবং লজ্জাকর ভাবের আবেশে খৃশ্চানদের পূজা করার জন্যে একটি অখৃস্টান ধর্মমন্দির নির্মাণ করিয়েছিলেন। ষষ্ঠ চার্লসকেও সেখানে আপনারা খুঁজে পাবেন। তিনি তাঁর ভাই-এর স্ত্রীকে এমন উন্মত্তের মতো ভালোবাসতেন যে তাই দেখে একজন কুষ্ঠরোগী তাঁকে সাবধান করে দিয়েছিল এই বলে যে উন্মাদ রোগে আক্রান্ত হওয়ার বেশি দেরি তাঁর নেই। সেই চার্লস যখন সত্যি-সত্যিই পাগল হয়ে গেলেন তখন তাকে সান্ত্বনা দিতে পারত একমাত্র সারালেন তাস; সেই তাসের ওপরে আঁকা থাকত প্রেম, মৃত্যু, আর উন্মাদের ছবি। সেই সঙ্গে দেখতে পাওয়া যাবে ফিটফাট পোশাক পরা গ্রিফোনেতা ব্যাগলিযোনির ছবি; মাথায় তাঁর মণিমুক্তা খচিত টুপি, অ্যাকানথাসের মতো কোঁকড়ানো চুলের স্তবক। তিনি সস্ত্রীক অ্যাসটোরিকে খুন করেছিলেন, সিমোনেতোকে হত্যা করেছিলেন তাঁর চাকর সমেত। সিমোনেতে তাঁর মৃত্যুকে এমন সহজভাবে গ্রহণ করেছিলেন যে পেরুগিযায় মৃত্যুশয্যায় তাঁকে নির্লিপ্তভাবে শুয়ে থাকতে দেখে কেউ চোখের জল না ফেলে পারেনি; আর যে আটালানটা তাকে অভিশাপ দিয়েছিলেন তিনিই শেষ পর্যন্ত আশীর্বাদ করেছিলেন তাঁকে।
