তবু এই চাপা কুৎসা অনেকের চোখে তাঁর অদ্ভুত এবং বিপজ্জনক আকর্ষণটিকে বাড়িয়ে তুলেছিল। প্রচুর সম্পদ তাঁর অর্থনৈতিক জীবনে কিছুট নিশ্চয়তা এনেছিল। সমাজ, অন্তত যাকে আমারা সভ্য সমাজ বলি, যাঁরা ধনী এবং সেই সঙ্গে অপরকে মুগ্ধ করার হস্কৃমতা যাঁদের রয়েছে তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো সমালোচনা শুনতে খুব বেশি একটা রাজি নয়। স্বভাবতই সে মনে করে যে চালচলনটাই যে কোনো মানুষের কাছে তার নীতির চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান। তার মতে মানুষের শ্রেষ্ঠ সম্ভ্রম তার একটা ভালো রাঁধুনি থাকার চেয়ে কম দামি। আর তা ছাড়া, মানুষকে খারাপ খানা আর খারাপ মদ খাওয়ানোর পরেও কাউকে সমাজে তিরস্কার করা যাবে না। ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করার সময় লর্ড হেনরি একবার বলেছিলেন অনেক ভালো গুণ থাকা সত্ত্বেও, মানুষ যদি নিমন্ত্রিতদের গরম খাবার দিতে না পারেন তাহলে তাঁর দোষ তুমার্য নয়। কারণ আর্টের নীতি আর সৎ সমাজের নীতি একই অন্তত তাই হওয়া উচিত। এর প্রযোজনীয় অঙ্গ হচ্ছে আদিকা যা কিছু আমরা করি তার মধ্যে চাই নিখুঁত আয়োজনের মর্যাদা; সেই সঙ্গে চাই একটা অবাস্তব আবহাওয়া। কপটতা, সৌন্দর্য আর বুদ্ধি যেগুলির দৌলতে রোমান্টিক নাটক আমাদের আনন্দে দেয়-এর মধ্যেও সেগুলি থাকা চাই। প্রবঞ্চনা কি এতই বিপজ্জনক? আমার মনে হয় তা নয়। আমাদের বহুমুখী ব্যক্তিত্বকে প্রকাশ করার এটা একটা আঙ্গিক মাত্র।
অন্তত ডোরিয়েন গ্রে-র মতবাদ সেই রকমই। যারা মানুষের অহং বোধকে সহজ, সাধারণ, শাশ্বত এবং একই ধাতু দিয়ে গঠিত মনে করে তাদের সেই অগভীর মনস্তত্ত্বর কথা ভেবে তিনি অবাক হয়ে যেতেন। তাঁর মনে হত মানুষ নিজের মধ্যেই বহু জীবন যাপন করে, তার অনুভূতির সীমা নেই-তার চিন্তাধারা অদ্ভুত, তার উচ্ছ্বাস বাঁধনহারা; তার দেহ মৃতের বিপজ্জনক রুগ্ন বীজাণু দিয়ে গড়া। দেশের বিভিন্ন ডানহীন শীতল ছবির গ্যলারিতে তিনি ঘুরে বেড়াতেন এবং তাঁর ধমনীতে যে সব বংশের রক্ত প্রবাহিত ছিল সেই সব বংশের বিরাট-বিরাট প্রতিকৃতির দিকে তাকিয়ে-তাকিয়ে দেখতেন। রানি এলিজাবেত এবং রাজা জেমস-এর রাজত্বের স্মৃতিচারণ” গ্রন্থে ফ্রান্সিস অসবর্ন ফিলিপ হারবার্ট-এর যে বিবরণ দিয়েছেন, সেই হারবার্টের প্রতিকৃতি সেখানে রয়েছে। এই সুন্দর যুবক ফিলিপ হারবার্টের জীবনই কি তিনি যাপন করছেন? কোনো বিষাক্ত বীডাণু কি দেহ থেকে দেহে সংক্রামিত হয়ে তাঁর শরীরে এসে উপস্থিত হয়েছে? সোনার জল দিয়ে আঁকা আঁটো জামার ওপরে আর হীরার বুটি দেওয়া বর্ম পরে স্যার অ্যানথলি শেরাজ দাঁড়িয়ে রয়েছেন। সাদা আর কালো রঙের অস্ত্রশস্ত্রের স্তূপ তাঁর পায়ের কাছে পড়ে রয়েছে। এই মানুষটি ভবিষ্যৎ বংশধরদের। উন্যে কী রেখে গিয়েছেন? নেপলস-এর ডিযোভানার প্রেমিক কি তাঁর জন্যে পাপ আর লজ্জা গিয়েছেন দিয়ে? এই মৃত ব্যক্তিটি সাহস করে যা চিন্তা করতে পারতেন না, তাঁর নিজস্ব কাগুলি কি তারই স্বপ্ন? এইখানে রঙচটা ক্যানভাসের ওপরে লেডি এলিজাবেথ দেবার তাঁর জমকালো পোশাক আর মুক্তাখচিত কাঁচুলি পরে হাসছেন। তাঁর ডান হাতে একটি ফুল, বাঁ হাতে দামাস্কাস গোলাপের বন্ধনী। পাশে একটি টেবিল। সেই টেবিলের ওপরে একটি ম্যানডোলিন এবং একটি আপেল। সবুজ ফিতে দিয়ে তৈরি করা কয়েকটি বড়ো-বড়ো গোলাপ ফুল তাঁর সূচলো জুতোর ওপরে সেলাই করা ছিল তাঁর জীবনের কথা তিনি ডানতেন; তাঁর প্রেমিকদের সম্পর্কে যে অদ্ভুত কাহিনি লোকের মুখে-মুখে ঘুরে বেড়াত তাও তাঁর অজানা ছিল না। এলিজাবেথের চঞ্চল মানসিকতার কিছুটা কি তিনি নিজেও পেয়েছেন? সেই অণ্ডাকৃতি ভারী-ভারী চোখ দুটি গভীর কৌতুকের সঙ্গে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইল। জর্জ উইলোবির প্রতিকৃতির কথাই ধরা যাক। কী ভয়ঙ্কর দেখতে মানুষটি! চুলে তাঁর পাউডারের প্রলেপ; মুখের ওপরে তাঁর অদ্ভুত ধরলের দাগ। তাঁর মুখের চেহারা কুর; রঙ কালো। কামনায ভরা তাঁর ঘৃণায় বঙ্কিম হয়ে উঠেছে। অষ্টাদশ শতাব্দীর মার্কনি বলে তিনি পরিচিত ছিলেন। যৌবনে তিনি ছিলেন লর্ড ফেরারস-এর দোস্ত। দ্বিতীয় লর্ড। বেকেনহাম-এর সম্বন্ধেই বা তিনি কী বলবেন! প্রিন্স রিজেন্টের উদ্দাম উচ্ছল দিনের বন্ধু। ছিলেন তিনি; মিসেস ফিটডারবার্ট-এর সঙ্গে যুবরাজের গোপনে যে বিবাহ হয়েছিল তারও সাক্ষী ছিলেন তিনি। কী গর্বিত, সুন্দর চেহারা তাঁর। কী উদ্ধত তাঁর ভঙ্গিমা! তাঁর সেই উচ্ছ্বাসের কিছু অংশ কি তিনি ডোরিয়েনকে উইল করে দিয়ে গিয়েছেন? বিশ্বের লোক তাঁকে দুষ্ট চরিত্রের বলে জানে। কার্লটন হাউস-এ তিনিই রক্তের বন্যা বইয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর পাশে কালো পোশাক পরা বিশীর্ণ চেহারার আর একটি প্রতিকৃতি। এটি তাঁর স্ত্রীর। তাঁর রক্তের শিহরনও ডোরিয়েলের শিরায় প্রবাহিত হচ্ছে কী অদ্ভুত! আর তাঁর মায়ের ছবি! ভদ্রমহিলার মুখটি ছিল লেডি হ্যামিলটনের মুখের মতো। তাঁর কাছ থেকে কী পেয়েছেন তিনি তা। জানেন। তিনি পেয়েছেন দেহের সৌন্দর্য, আর পেয়েছেন অপরের সৌন্দর্য উপভোগ করার তীব্র কামনা। ব্যাকানন্টি পোশাক পরে তিনি যেন তাঁকে উপহাস করছেন। তাঁর চুলে। আঙুলের পাতা জড়ানো। ছবির রঙটা বিবর্ণ হয়ে গিয়েছে, কিন্তু তাঁর অদ্ভুত চোখ দুটি তাঁর পিছু পিছু এখনো ঘুরে বেড়াচ্ছে।
