এই সমস্ত এবং আরো অনেক অধুনা দুষ্প্রাপ্য রত্নগুলি তিনি যে সংগ্রহ করেছিলেন তার একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে তাঁর নিজের মানসিক বিপর্যয় ভুলে যাওয়ার চেষ্টা। মাঝে-মাঝে যে। আতঙ্কটা তাঁর পক্ষে সহ্য করা কষ্টকর হয়ে দাঁড়াত সেই আতঙ্ক থেকে তাঁকে সাময়িকভাবে মুক্তি দিত ওই রত্নগুলি। তালাবন্ধ যে নির্জন ঘরটিতে তিনি তাঁর শৈশব কাটিয়েছিলেন সেই ঘরের দেওয়ালে নিজের হাতে তিনি সেই ভয়ানক প্রতিকৃতিটিকে টাঙিয়ে রেখেছিলেন। তাঁর জীবনের সত্যিকারের অধঃপতন পরিবর্তনশীল ওই প্রতিকৃতিটির ওপরেই প্রতিফলিত হত। এরই সামনে তিনি সেই সোনালি পর্দাটা ঝুলিয়ে রেখেছিলেন। পরপর কয়েকটি সপ্তাহ তিনি ও-ঘরে ঢুকতেন না। না ঢোকার ফলেই তিনি তাঁর সহড, আনন্দময় জীবনযাত্রায় ফিরে আসতেন। তারপরে হঠাৎ একদিন রাত্রিতে তিনি নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে “ব্লু গেট ফিলড”-এর কাছাকাছি সেই সব ভয়ানক পাড়ায় গিয়ে ঢুকতেন, বিতাড়িত না হওয়া পর্যন্ত সেখানেই দিনের পর দিন কাটিয়ে দিতেন। ফিরে এসে তিনি সেই প্রতিকৃতিটির সামনে বসতেন; মাঝে-মাঝে ছবিটিকে তিনি নিজের মতোই ঘৃণা করতেন; অন্য সময়, ব্যক্তিত্বের গর্বে তাঁর বুক ফুলে উঠত, পাপের অর্ধেক মোহই বোধ হয় এই গর্বে। যে বিকৃতি তাঁকে সহ্য করতে হত সেই বিকৃতির সমস্ত জ্বালা আর যন্ত্রণা যে ওই প্রতিকৃতিটাকে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে এই দেখে গোপনে আনন্দে তিনি হাসতেন।
কয়েক বছর পরে ইংলন্ডের বাইরে বেশি দিন থাকাটা তিনি সহ্য করতে পারলেন না। ত্রোভিল আর আলজিয়ার্সে লর্ড হেনরির সঙ্গে যৌথভাবে তিনি ঘর ভাড়া নিয়েছিলেন। সেখানে তাঁরা একসঙ্গে কয়েকবার শীতকালে বাস করেছিলেন। সেই দুটি বাড়ি তিনি ছেড়ে দিলেন। যে ছবিটি তাঁরই জীবনের একটি অঙ্গ তার কাছ থেকে দূরে সরে থাকতে হ্যাঁ ভালো। লাগত না। তাছাড়া, একটা কেমন ভয়ও ভন্মেছিল তাঁর মনে। যদিও দরজাটিকে সুরক্ষিত করার জন্যে তিনি বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন, দরজার গায়ে শক্ত মজবুত লোহার বেড়া দিয়েছিলেন, তবু তাঁর ভয় হচ্ছিল কেউ যদি তাঁর দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে সেই ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ে।
একথা তিনি ভালোভাবেই জানতেন যে ঘরে ঢুকেও কেউ কিছু বুঝতে পারবে না। কথাটা সত্যি যে মুখের চেহারাটা কুৎসিত এবং কদাকার হওয়া সত্ত্বেও, ছবিটার ওপরে তাঁর। চেহারাটাই প্রতিফলিত হয়েছিল; কিন্তু ছবিটা দেখে কী বুঝবে তারা? কেউ তাঁকে এ নিয়ে বিরক্ত করার চেষ্টা করলে তিনি উপহাস করে তাদের উড়িয়ে দেবেন। তিনি এ ছবি আঁকেননি। সুতরাং সেটা কদাকার দেখালেই বা তাঁর কী? তাছাড়া সত্যি কথাটা বললেও কি তারা তাঁকে বিশ্বাস করবে?
তবু তিনি ভয় পেয়েছিলেন। নটিংহামশায়ারে তাঁর নিজস্ব প্রাসাদে সমগ্রোত্রীয় যুবকদের ভূরিভোজনে আপ্যায়িত করতে-করতে তিনি চুপ করে দাঁড়িয়ে যেতেন। তাঁর জীবনযাত্রার সেই অহেতুক উজ্জ্বলতা অথবা আড়ম্বর দেখে সবাই যখন অবাক হয়ে হ্যাঁ দিকে তাকিয়ে থাকত ঠিক সেই সময় হয়তো তিনি অতিথিদের পরিত্যাগ করে তাড়াতাড়ি শহর ছেড়ে বেরিয়ে আসতেন; তাঁর ভয় হত হয়তো বা কেউ দরজার তালা ভেঙে সেই ঘরে ঢুকে ছবিটি নিয়ে চম্পট দিয়েছে। কেউ যদি ওটিকে চুরি করে নিয়ে যায় তাহলে কী হবে? এই চিন্তা করার সঙ্গে তিনি ভয়ে হিম হয়ে যেতেন। তাহলে নিশ্চয় পৃথিবীর লোক তাঁর জীবনের গোপন রহস্যটি ডেনে যাবে। হয়তো তারা তাঁকে সন্দেহ করতে শুরুই করে দিয়েছে।
কারণ, তাঁকে অনেকেরই খুব ভালো লাগত–এই কথাটা সত্যি বলে ধরে নিলেও, তাঁকে অবিশ্বাস করত এমন মানুষের সংখ্যাও কম ছিল না। তাঁর জন্ম এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠার দাবিতে যে ‘ওয়েস্ট এনড’ ক্লাবে প্রবেশাধিকার পাওয়ার পূর্ণ অধিকার তাঁর ছিল, সেখানে। একবার প্রায় তিনি ধাক্কা খেয়েছিলেন। শোনা যায় একবার তাঁর একটি বন্ধু ধূমপান করার জন্যে তাঁকে নিয়ে ‘চার্চচিল’ ঘরে ঢোকেন। তাঁদের ঢুকতে দেখেই বারউইক-এর ডিউক এবং আর একটি ভদ্রলোক হঠাৎ উঠে সেখান থেকে বেরিয়ে গেলেন। ব্যাপারটা তাঁর চোখ এড়ায়নি। পঁচিশ বছর অতিক্রম করার পরে তাঁর সম্বন্ধে অদ্ভুত-অদ্ভুত কাহিনি চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল। গুজব রটল হোয়াইট চ্যাপল-এর মতো দূরে একটা ভাটিখানায় কতকগুলি বিদেশি নাবিকের সঙ্গে মদ খেয়ে হুল্লোড় করতে তাঁকে দেখা গিয়েছে। গুজব রটল, চোর-ডাকাত আর মুদ্রা জালকারীদের সঙ্গে তাঁর নাকি দোস্তি রয়েছে এবং তাদের ব্যবসার গোপন রহস্য কী তা তিনি জানেন। শহর থেকে দীর্ঘদিনের অনুপস্থিতি তাঁর চরিত্রে কলঙ্কলেপন করেছিল; যখন তিনি ফিরে আসতেন তখন তাঁকে নিয়ে চারপাশে বেশ কানাঘুষা চলত, দেখা হলে তারা একটা অবজ্ঞার দৃষ্টি দিয়ে আড়চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে-তাকিয়ে যেত। ভাবখানা এই যে তাঁর গোপন রহস্যটা বার তারা করবেই।
অবশ্য এই সব ঔদ্ধত্য আর পরিকল্পিত উপহাসকে তিনি গ্রাহ্য করতেন না; এবং অধিকাংশ লোকের মতে তাঁর সহজ চালচলন, তাঁর পরিচ্ছন্ন নিরপরাধ হাসি, তাঁর অনবদ্য শাশ্বত। যৌবন তাঁর সমস্ত কুৎসার উপযুক্ত জবাব বলে মনে হত। লোকের মুখে শোনা যেত যে যাঁরা তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন তাঁরাও কিছুদিন তাঁর সঙ্গে মেলামেশার পরে তাঁকে পরিত্যাগ করেছেন। যে সমস্ত মহিলারা তাঁকে পাগলের মতো পছন্দ করত এবং তাঁর সঙ্গে নিবিড়ভাবে মেশার জন্যে কোনো সামাজিক কুৎসাকেই গ্রাহ্য করেনি এবং সমস্ত রীতিনীতি বিসর্জন দিতে দ্বিধা করেনি, কিছুদিন পরে ডোবিয়েন গ্রে তাদের ঘরে ঢুকলে তারাও আতঙ্ক কিম্বা অপমানে বিবর্ণ হয়ে যেত।
