সেযুগের জীবনযাত্রা কী অপরূপই না ছিল! কত প্রাচুর্য আর আড়ম্বরই না ছিল সে যুগে! এমন কি মৃতদের বিলাস-বৈভবের কাহিনি পড়তেও ভালো লাগে কত।
তারপরে তিনি সূচীশিল্পের দিকে ঝুঁকলেন। উত্তর ইওরোপ দেশগুলির ঠান্ডা ঘরের দেওয়ালে যে-সমস্ত প্রাচীরচিত্র আঁকা রয়েছে সেগুলি পর্যবেক্ষণ করার জন্যে তিনি উঠে পড়ে লাগলেন। গুণই বলুন আর অপগুণটি বলুন তাঁর চরিত্রের একটা অসামান্য বৈশিষ্ট্য এই ছিল যে কোনো কিছু ধরার সঙ্গে-সঙ্গে সেটার একেবারে ভেতরে তিনি তলিয়ে যেতেন। সূচীশিল্পের মধ্যেও তিনি ঠিক তেমনিভাবেই ডুবে গেলেন। দেখলেন সেই অপরূপ প্রাচীরচিগুলিকে মহাকাল কী ভাবেই না নষ্ট করে দিয়েছে। দেখে মনে-মনে বেশ কষ্ট পেলেন তিনি। যে কোনোরকমেই হোক, তিনি কালের হাত থেকে মুক্তি পেয়েছেন। গ্রীষ্মের পর গ্রীষ্ম আসচ্ছে; ড্যাফোডিল ফুলগুলি ফুটছে আর বারবার শুকিয়ে যাচ্ছে। রাত্রির বিভীষিকা বারবার তার ঘৃণ্য কাহিনির পুনরাবৃত্তি করছে। কিন্তু তাঁর কোনো পরিবর্তন নেই। কোনো শীতই তাঁর মুখের আদল বিকৃত করতে পারেনি, স্নান করতে পারেনি তাঁর ফুলের মতো দেহ-লাবণ্যকে বাস্তব জগতের সঙ্গে তাঁর প্রার্থক্য কত! কোথায় তারা বিলীন হয়ে গিয়েছে? এথেনাকে খুশি করার জন্যে অল্পসীরা নব-বসন্তের রঙে ছুপিযে যে বিখ্যাত পোশাকটি তৈরি করেছিল, যার জন্যে দৈত্যদের সঙ্গে যুদ্ধ হয়েছিল দেবতাদের–সেই পোশাকটা আজ কোথায়? সেই বিরাট ফিকে লাল নৌকার। পালটি কোথায়? রোমের কলোসিয়ামে নেরো এই পালটিকে বিছিয়ে রেখেছিলেন। এর গায়ে আঁকা ছিল তারকা খচিত আকাশ আর ছিল রথী অ্যাপোলোর ছবি, সোনালি লাগাম গলায় পরে সাতটি ঘোড়া সেই রথ টানছিল, সূর্যের খাবার টেবিলে পাতা সেই অদ্ভুত রুমালগুলি তিনি খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন। এই টেবিলের ওপরে বিশ্বের সেরা রসালো খাবার পরিবেশন করা। হত। রাজা কিলপেরিকের শবাধারের ওপরে তিনশ সোনার মৌমাছি বসানো যে আচ্ছাদনটি সেইটাই বা আজ কোথায়? এই অদ্ভুত পোশাক দেখে পটান্সের বিশপ ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন। এর ওপরে আঁকা ছিল সিংহ, মঘাল সাপ, ভালুক, কুকুর, অরণ্য, ছোটো-ছোটো পাহাড়া, শিকারি–এক কথায় চিত্রকর প্রকৃতির যা কিছু অনুকরণ করতে পারেন–সেগুলির সব ছবি। আর সেই কোট–যে কোট অরলিনস-এর চার্লস একবার পূরেছিলেন–যার হাতের ওপরে। সুন্দর একটি গান লেখা ছিল। শুদু গানই নয়, তার স্বরগ্রামও। প্রতিটি স্বরগ্রাম লেখা ছিল সোনালি সুতো দিয়ে–প্রতিটির ছেদের মধ্যে গাঁথা ছিল চারটি করে মুক্তা। রানি যোয়ান অফ বারগেনডির ব্যবহারের জন্য রিমস-এ যে প্রাসাদটি তৈরি হয়েছিল সেই প্রাসাদের একটি ঘরের কথা তিনি পড়লেন। সুতোয় বোনা তেরোশ একুশটা টিয়াপাখি দিয়ে এই ঘরটি সাজানো ছিল, সাজানো ছিল রাজার অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে, আর ছিল একুশটি প্রভাপতি তাদের প্রতিটি ডানায আঁকা ছিল রানির হাত; এই সৰ নকশাগুলি আগাগোড়া সোনা দিয়ে তৈরি। ক্যাথারিন দ্য মেডিসির কালো ভেলভেটের একটি শোকশয্যা ছিল, তার ওপরে আঁকা ছিল। অসংখ্য বাঁকা চাঁদ আর সূর্য বুটিদার কাপড় দিয়ে তৈরি ছিল এর মশারি। সোনা আর রুপোর জমির ওপরে লতা আর ফুলের মালা ছিল আকা; তাদের ধারে-ধারে বসানো ছিল মুক্তোর। চিকন। রানির রুচিমতো রুপোর ঝালরের ওপরে কালো ভেলভেটের সারি-সারি পর্দার মধ্যে বিছানাটি পাতা ছিল। চতুর্দশ লুই-এর ঘরে পনেরো ফুট উঁচু অনেকগুলি নারীমূর্তি ছিল। তাদের ওপরে ছিল সোনার কারুকার্য। পোলান্ডের রাজা সোবিয়েস্কির রাজকীয় শয্যাটি তৈরি হয়েছিল নীলকান্ত মণির নকশা দিয়ে সঙ্গে সুতো দিয়ে লেখা ছিল কোরানের বাণী। এর। পাগুলো ছিল রুপোর; পা-দানিগুলি হিরে দিয়ে মোড়া। এটা নিয়ে আসা হয়েছিল তুর্কীদের শিবির থেকে এর বিরাট মশারির ছাউনির নীচে মহম্মদের পতাকা ছিল আঁটা।
এইভাবে পুরো একটি বছর ধরে তনুজ আর সূচীশিল্প নিয়ে তিনি অনেক গবেষণা করলেন, সংগ্রহ করলেন অনেক প্রাচীন স্মারক চিহ্ন, দিল্লির সূষ্ক মসলিন থেকে ঢাকার সুচারু। ফিনফিনে বস্ত্র–প্রতীচ্যে যার নাম ছিল ‘বাতাসৰষন’ এবং সন্ধ্যার শিশিব’–অদ্ভুত ছবি আঁকা ভয়ভার কাপড় চিনদেশের বেগলে পর্দা, সিসিলির বুটি, স্পেনের ভেলভেট, সবুজ সোনার জাপানি ব্যন শিল্প আর চমৎকার পালকের পাখি
গির্জা সংক্রান্ত অন্যান্য অনেক বিষয়ের মতোই ধর্মী সাজপোশাক সম্বন্ধেও তাঁর বিশেষ একটা আগ্রহ জন্মেছিল। তাঁর বাড়ির পশ্চিম দিকের গ্যালারিতে অনেকগুলি সিডার কাঠের বাক্স সারিবন্দিভাবে সাজান ছিল সেইখানে অনেক দুষ্প্রাপ্য আর সুন্দর প্রাচীন স্মারক চিহ্ন তিনি সংগ্রহ করে রেখেছিলেন। সত্যি কথা বলতে কি ওগুলি ব্রাইড অফ ক্রায়েস্ট-এর। পোশাকের ধ্বংসাবশেষ ছাড়া আর কিছু নয়। তাঁর উপবাসসর্দিষ্ট শীর্ণ দেহ এবং স্ব-নির্বাচিত দুঃখ আর হস্কৃত যে দেহটিকে জর্জরিত করে ফেলেছিল সেই দেহটিকে ঢেকে রাখার জন্যে কালো আর সাদায় মেশানো লাল রঙের পোশাক পরার প্রয়োডনীয়তা ছিল তাঁর। শুধু তাই নয়; সেই পোশাকটি সূম বস্ত্র দিয়ে তৈরি এবং হীরামণিমুক্তা খচিত। পাদরীরা ধর্মীয় । শোভাযাত্রার সময় যে রকম ফিকে লাল সিল্ক আর গোলাপী রঙের সোনার সুতো দিয়ে কাড করা জমকালো ঢিলে জামা পরতেন সেই জাতীয় কিছু পোশাকও সংগ্রহশালায় তাঁর ছিল। সেই সব ঢিলে জামার ধারে-ধারে ভার্জিনের জীবন থেকে নেওয়া কিছু কিছু টুকরো ঘটনার ছবিও ছিল আঁকা। মাথার টুপিতে রঙিন সিল্ক দিয়ে আঁকা ভার্কিলের অভিষেকের ছবিটিও সুচারুরূপে আঁকা ছিল। পঞ্চদশ শতাব্দীর একটি ইতালিয়ান ভাস্কর্য এটি। আর একটি ওই জাতীয় জামার ধারে সবুজ ভেলভেটের আঁকা অ্যাকানথাস পাতরা কয়েকটি ছবিও ছিল। এই সব পাতার বিশদ নকশা আঁকা হয়েছিল রুপালি সুতো আর রঙিন ক্রিমট্যাল দিয়ে লাল আর সোনালি সিল্কের সুতো দিয়ে ঢিলে জামাগুলি বোনা হয়েছিল; তাদের ওপরে আঁকা ছিল। অনেক সাধু-সন্তের ছবি। তাদের মধ্যে একটি হচ্ছে সেন্ট সিবাসটিনেরপ্যাশন এবং ক্রায়েস্টের ক্রুশিফিকেশন-এর প্রতীক চিহ্ন হিসাবে তিনি যে ধর্মীয় পোশাকটি পরেছিলেন সেটি সবুজ রঙের সিল্ক দিয়ে তৈরি তার সঙ্গে মেশানো ছিল নীল সিন্ধ সোনার বটি গীত রঙের দামাস্কাস সিল্ক আর সোনার জাজিম। সেই সঙ্গে ছিল সিংহ, ময়ূর এবং অন্যান্য প্রতীক চিহ্ন।
