একবার তিনি রত্ন আহরণে মনোযোগী হলেন, ফ্রান্সের অ্যাডমিরাল আনে দ্য ডায়যে যেমন তাঁর পোশাকে পাঁচশো ষাটটি রত্ন বসিয়েছিলেন সেই রকম একটা উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি একবার একটি নাচের পোশাক তৈরির কারখানায় হাজির হলেন। এই বাতিকটা তাঁকে এমনভাবে গ্রাস করে ফেলেছিল যে শেষ পর্যন্ত এটা থেকে মুক্তি পাননি তিনি। সারাদিন ধরে রত্নগুলিকে নানান ভাবে তিনি সাড়াতেন, গুছোতেন, খুলতেন, আবার বসাতেন; এগুলির মধ্যে ছিল অলিভ রঙের ক্রিসোবেরিল মণি; আলোর সামনে ধরলে এগুলি লাল হয়ে যায়; সিমোফেন; গোলাপ-রঙা বা মদের মতো হলুদ রঙের পোখরাজ; লাল টকটকে দারুচিনি পাথর; কমলা আর বেগনে রঙের সপাইনেল, সেই সঙ্গে ছিল নীলকান্ত আর পদ্মরাগ মণি। সানস্টোনের রক্তিমাভা, আর মুনস্টোনের মুক্তার মতো শ্বেত আভা অত্যন্ত ভালোবাসতেন। তিনি। আমস্টার্ডাম থেকে বিরাট মাপের তিনটি পান্না তিনি সংগ্রহ করেছিলেন।
এই রত্নগুলির সম্পর্কে অদ্ভুত অদ্ভুত গল্পও তিনি আবিষ্কার করেছিলেন। অ্যালফেনসোর ‘ক্লেরিক্যালিস ডিসিপ্লিনা’তে একটি সাপের উল্লেখ রয়েছে। তার চোখের মণি দুটি সত্যিকারের মণি দিয়ে তৈরি; রঙ তার লালচে-কমলালেবুর মতো, ইমাথিয়া-বিজয়ী আলেকজান্দারের যে ব্রোমান্টিক কাহিনি প্রচলিত রয়েছে তাতে শোনা যায়, ডর্ডন উপত্যকায় এই ধরনের সাপ দেখা যায—’সত্যিকারের পাল্লা দিয়ে তাদের পিঠগুলি মোড়া’। ফিলোট্র্যাটাসের কাহিনি থেকে জানা যায় একরকমের ড্রাগন রয়েছে যাদের মাথায় সত্যিকারের হিরে বসানো রয়েছে। সোনালি অষ্কর আর লাল পোশাক দেখিযে এদের ঘুম পাড়িয়ে হত্যা করা হয়। প্রখ্যাত অপরসায়নবিদ পেরে দ্য বোনিফেস-এর মতে ওই হিরে মানুষকে অদৃশ্য করে দেয়; আর ভারতে অকীক নামে যে একরকম কঠিন আর মূল্যবান পাথর পাওয়া যায় তার সম্বন্ধে ভূয়সী প্রশংসা তিনি করেছেন। কর্নেলিয়ান নামে একরকম দামি পাথর রয়েছে যা মানুষের ক্রোধ নষ্ট করে, আর ঘুমের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। হাসিনথ। সুরার মাদকতা নষ্ট করে পদ্মরাগ মণি। গারনেট জাতীয় মণি দৈত্য-দানোদের তাড়িয়ে দেয়, হাইড্রোপিকাসের ভয়ে বিবর্ণ হয়ে যায় চাঁদ। চাঁদের তিথি অনুযায়ী সেলেনাইট পাথরের বাড়া-কমা চলো মেলোসিস নামে একরকমের পাথর রয়েছে চোর খুঁজে বার করার দুষ্কমতা যার অদ্ভুত বাচ্চাদের রক্ত গায়ে লাগলে এর গুণ নষ্ট হয়ে যায়। সদ্য নিহত একটা কোলাব্যাণ্ডের মাথার খুলি থেকে লিওনার্ডাস ক্যামিলা একটা দামি পাথর বার করতে দেখেছিলেন, বিষের ক্রিয়া প্রতিহত করার ক্ষেত্রে এর শক্তি যথেষ্ট। আরব দেশের হরিণের বুকের ভেতরে একভাতীয় পাথরের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে যার সম্পর্শেই প্লেগ সেরে যায় আরব দেশের পাখির বাসায় একরকমের পাথর রয়েছে, ডেমোক্রিটাসের মতে যা ধারণ করলে আগুন থেকে পোড়ার কোনো ভয় মানুষের থাকে না।
রাজ্যাভিষেকের সময় সিলেন-এর রাজা বড়ো একটা রুবি হাতে পরে শহরের মধ্যে দিয়ে ঘোড়ায় চেপে গিয়েছিলেন। ভন দি প্রিস্ট-এর প্রাসাদের তোরণ দুটি ছিল সার্ডিয়াস পাথরের তৈরি। কোনো মানুষ যাতে বিষ নিয়ে ভেতরে আসতে না পারে এই জন্যে তাদের গায়ে। শিংওয়ালা সাপের ছবি আঁকা রয়েছে। ঢালু ছাদ দিয়ে ঘেরা দেওয়ালের ওপরে ঝুলত দুটো সোনার আপেল, তাদের গায়ে বসানো ছিল দুটো পদ্মরাগ মণি। এর ফলে দিনের বেলায় চকচক করত সোলা; রাত্রিতে শোভা পেত নীলকান্ত মণি। এ মার্গারাইট অফ অ্যামেকি’ নামে লজ-এর একটি নামকরণ রোমান্টিক গ্রন্থে লেখা আছে যে রানির অন্তঃপুরে ক্রোসিলাইট, কারবাঙ্কালস প্রভৃতি যে সব মূল্যবান পাথর অথবা ধাতুর আয়না রয়েছে তাদের দিকে তাকিয়ে দেখলে পৃথিবীর সতী-সাবিত্রীদের দেখতে পাওয়া যায়। জিপাংপুর অধিবাসীরা মৃতদের মুখের মধ্যে গোলাপী রঙের মুক্তো খুঁজে দেয়। মার্কো পোলো তা দেখেছেন। একটি ডুবুরি একটা সামুদ্রিক দৈত্যের কাছ থেকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে একটা মুক্তো সংগ্রহ করে রাজা। পেরোজকে দ্যে। সেই মুক্তো চুরি হয়ে গেলে রাজা চোরকে হত্যা করে সাতদিন শোক করেন। প্রোকোপিয়ান্সের কাহিনি থেকে বোঝা যায় হুনেরা সেই মুক্তো ছিনিয়ে নেওয়ার জন্যে রাজাকে ভুলিয়ে বিরাট একটা গর্তের সামনে নিয়ে আসে। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে সেই মুক্তোটাকে ছুঁড়ে ফেলে দেন। সেইটাকে খুঁজে বার করার জন্যে সম্রাট আনাস-টেসিয়াস পাঁচশ সোনার মোহর পুরস্কার দেবেন বলে ঘোষণা করেন, কিন্তু সেটি আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। মালাবারের রাজাকে একজন ভেনিসবাসী একটা মুক্তোর মালা দেখিয়েছিলেন। সেই মালাতে তিনশ চারটি মুক্তো ছিল। প্রতিটি মুক্তোর দেবতা ছিল একটি। রাজা সেই সব দেবতাদের পূজা করতেন।
ব্রাতোর মতে ফ্রান্সের চতুর্দশ লুই-এর সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার সময় ষষ্ঠ আলেকজান্দারের পুত্র ডিউক দ্য ভ্যালেনটিন-এর ঘোড়ার পিঠ সোনার পাত দিয়ে মোড়া ছিল। তাঁর মাথার টুপিতে গাঁথা ছিল দু’আর রুবি। সেই রুবিগুলি থেকে আলোর রোশনাই ফুটে বেরোত। ইংলন্ডের চার্লস-এর ঘোড়ার পাদানি থেকে চারশ কুডিটা হিরে ঝুলত। তিরিশ হাজার মার্কস দামের দ্বিতীয় রিচার্ড-এর একটি কোট ছিল; তার চারধারে বসানো ছিল রুবি। রাড্যাভিষেকের পূর্বে টাওয়ারে যাওয়ার পথে অষ্ঠম হেনরি যে সোনার ঝালর দেওয়া, অসংখ্য হিরে আর দামি-দামি পাথরে চুমকি বসানো পোশাক পরেছিলেন সেকথা হল’ সাহেব আমাদের জানিয়েছেন। প্রথম জেমস-এর প্রিয়পাত্রেরা কানে সোনার তারের সঙ্গে পাল্লা। বসানো দুল পরতেন। দ্বিতীয় এডওয়ার্ড পিয়ারস গ্যাভেস্টোনকে টকটকে লাল সোনার তৈরি কিছু যুদ্ধাস্ত্র দান করেছিলেন। সেই অস্ত্রগুলির গায়ে নীলকান্ত মণি বসানো। দ্বিতীয় হেনরি কব্জি পর্যন্ত যে দস্তানা পরতেন তাতে বসানো থাকত দামি-দামি পাথর, তাঁর একটি বিশেষ রকমের দস্তানা ছিল যার সঙ্গে গাঁথা ছিল বারোটি রুবি আর বাহান্নটি বেশ দামি পাথর। বার্গেন্ডি বংশের শেষ ডিউক চার্লস দি ব্লাশ-এর টুপিতে গাঁথা ছিল নাশপাতির গড়নের মুক্তো; তার মধ্যে বসানো ছিল অনেকগুলি নীলকান্ত মণি।
