এই রকম একটি জগৎই ডোরিয়েনের কাছে সত্য ছিল অথবা জীবনে যা-যা আমরা পেতে চাই তাদের মধ্যে ছিল একটি এবং এই নতুল অথচ মেজাজি অনুভূতির সন্ধালে তিনি এমন কয়েকটি চিন্তার আশ্রয় নিলেন যেগুলি তাঁর কাছে একেবারে অপরিচিত ছিল। তিনি তা ডানতেনও কিন্তু তাদের প্রভাবের মধ্যে তিনি নিজেকে ছেড়ে দিয়েছিলেন। তারপরে কৌতূহল চরিতার্থ হওয়ার পরে তিনি সেগুলিকে চরম ঔদাসীন্যে ছুঁড়ে ফেলে দিতেন। মানসিক অবস্থার দিক থেকে এইটাই ছিল তাঁর মতো চরিত্রের মানুষের কাছে একমাত্র স্বাভাবিক জিনিস; অন্তত কিছু আধুনিক মনস্তত্ত্ববিদেরা সেই কথাই বলেন।
একবার গুজব রটে গেল যে তিনি রোমান ক্যাথলিক প্রার্থনায় আসা-যাওয়া করছেন। সত্যি কথা বলতে কি রোমান ক্যাথলিক ধর্মীয় রীতিনীতিগুলি তাঁকে যথেষ্ট আকর্ষণ করেছিল। কেন? কারণ একানকার ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলিতে প্রতিদিন যে আহুতি দেওয়া হত, প্রাচীন যুগের সমস্ত নির্মম বলিদানের চেয়েও ত কঠোর; তাছাড়া, এখানে যাতায়াত করার পেছনে আরো । একটা উদ্দেশ্য তাঁর ছিল। সেটাই হচ্ছে, মানুষের জীবনের যে অনন্তু ট্রাজিডি প্রকাশ করার জন্যে এই ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে–এখানে তার বিন্দুমাত্র চিহ্ন নেই। এখানে গিয়ে তিনি মার্বেলে বাঁধাই মেঝের ওপর হাঁটু মুড়ে বসে থাকতে ভালোবাসতেন; ভালোবাসতেন পাদরীদের ক্রিয়াকলাপ লক্ষ করতে ফুলের নক্সা কড়া ইস্ত্রিকরা ঢিলে জামা পরে পাদরী তাঁর সাদা হাত নেডে-নেডে মন্দিরের পর্দার পাশে ঘুরে বেড়ান; মাঝে-মাঝে। যিশুকে উদ্দেশ্য করে নিজের পাপের ভলো নিজের বুকের ওপরে তিনি আঘাত করেন–এই সব দেখতে তিনি ভালোবাসতেন। গির্জা থেকে বেরিয়ে আসার সময় কখনো বা কালো পোশাক পরা মানুষদের অবাক হয়ে তিনি দেখতেন, কখনো-কখনো ছায়াছন্ন জায়গায় তাদেরই পাশে বসে তাদের জীবনের অসংলগ্ন টুকরো টুকরো কাহিনি শুনতেন।
কিন্তু কোনো বিশেষ নীতি অথবা রীতির পরিপোষক হয়ে নিজের বুদ্ধিবৃত্তিকে নষ্ট করার মতো ভুল তিনি করতেন না। নিজের বাড়িটিকে কিছুতেই তিনি দু’দণ্ডের পান্থশালা বলে ভাবতে পারতেন না; অতি সাধারণ বস্তুকে আমাদের কাছে অদ্ভুতভাবে প্রকাশ করার। পরমাশ্চর্য ক্ষমতা অতীন্দ্রিয়বাদরে রয়েছে। কিছুদিনের জন্যে তিনি এর কবলে পড়েছিলেন; আবার কখনো-কখনো বা ডারউইনের বস্তুতান্ত্রিক নীতির পরিপোষক হয়ে মানুষের চিন্তা আর উচ্ছ্বাসের মধ্যে একটা অপরূপ সামঞ্জস্য খুঁজে বার করার চেষ্টায় তিনি মশগুল হয়ে থাকতেন। তবু যে কথা আগেই বলেছি, কোনো বিশেষ নীতিকেই তিনি বাস্তব জীবনের চেয়ে বড়ো করে দেখতে চাইতেন না। পরীক্ষা-নিরীক্ষার বাইরে মানুষের সমস্ত ধীশক্তি যে কতটা মূল্যহীন তা তিনি বিশেষভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। তিনি জানতেন আধ্যাত্মিক রহস্য উন্মোচনের ব্যাপারে আত্মার চেয়ে প্রবৃত্তির অবদান কম নেই।
আর সেই জন্যেই তিনি সুগন্ধী জিনিসের প্রকৃতি আর গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে গবেষণা করতেন। এই গবেষণার ফলে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন মনের এমন কোনো অনুভূতি নেই আত্মিক জীবনের অনুভূতির সঙ্গে যার অমিল রয়েছে বুঝতে পেরেছিলেন বলেই তিনি তাদের আসল রূপটি খুঁজে বার করার চেষ্টা করতেন; বার করার চেষ্টা করতেন কেন বিশেষ একটি উপাদান আমাদের কাছে বিশেষ একটি ভাবের প্রতীক হয়ে দেখা দেয়।
অন্য সময় নিজেকে তিনি গানের জলসার মধ্যে সম্পূর্ণভাবে ডুবিয়ে দিতেন। লম্বা জাফরি টানা ঘরের মধ্যে মাঝে-মাঝে তিনি অদ্ভুত ধরনের কনসার্ট-এর আয়োজন করতেন। এই ঘরের ভেতরে ছাদটির রঙ সোনালি দেওয়ালগুলি অলিভ-সবুজ বানিশ করা। এখানে বসে। উন্মত্ত ডিজপসিরা ছোটো-ছোটো তারের যন্ত্রে উদ্দাম ঝংকার তুলে গান করত, আবার কখনো। বা সবুজ শাল জড়িয়ে গম্ভীর মেজাজের টিউনিশিযান গাযকরা বিরাট বীণাযন্ত্রের কালে মোচড দিয়ে গান গাইত; সেই সঙ্গে নিগ্রোরা দাঁতে দাঁত চিপে তামার ঢাকের ওপরে একটানা কাঠি পিটিয়ে যেত, আর ঘন লাল মাদুরের ওপরে হাঁটু মুড়ে বসে মাথায় পাগড়ি বেঁধে রোগাটে ইডিমানরা পেতল অথবা শরকাঠির তৈরি লম্বা সানাই ফুকত; মনে হত বিরাট ফণাওয়ালা সাপও যেন তাদের সেই গান শুনে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যেত। সেই অনার্য সঙ্গীতের রুক্ষ বিরতি আর কর্কশ অসঙ্গতি মাঝে-মা মন বিরক্তিতে ভরিয়ে দিত; তখন স্কুবার্ট, চোপিন অথবা বিটোফেন-এর বিরাট সুর-সঙ্গতিও তাঁর কাছে নেহাৎ জলো বলে মনে হত। প্রাচীন অবলুপ্ত ভাতির কবরখানা থেকে অথবা পাশ্চাত্য সভ্যতার সঙ্গে যে-সব জাতির সম্পর্ক তখনো একেবারে নিঃশেষ হয়ে যাযনি তাদের কাছ থেকে অনেক অদ্ভুত-অদ্ভুত বাদ্যযন্ত্র তিনি সংগ্রহ করেছিলেন। সেই যন্ত্রগুলিকে বাজাতে বেশ ভালো লাগত তাঁরা বাযযা নিগ্রো ইনডিযানদের অদ্ভুত বাদ্যযন্ত্র তিনি সংগ্রহ করেছিলেন। এই যন্ত্রটির দিকে চোখ মেলে তাকালো কোনো অধিকার ওদের মহিলাদের ছিল না; এমন কি রীতিমতো উপবাস এবং বিশুদ্ধ না হয়ে ওখানকার যুবকরাও ওই বাদ্যযন্ত্রটি সপর্শ করতে পারত না; পেরুভিযা থেকে তিনি সংগ্রহ করেছিলেন মাটির পাত্র যেগুলি থেকে পাখির কর্কশ কণ্ঠের স্বর শোনা যেত অথবা চিলিতে আলফনসো মানুষের হাড় দিয়ে তৈরি যে ফুটের সুর শুনেছিলেন সেই ফুট সংগ্রহ করেছিলেন তিনি। কুমড়োর খোলের মধ্যে ছোটো-ছোটো নুডি বোঝাই করে সেই খোলগুলিকে তিনি রঙ মাখিয়ে দিয়েছিলেন। এগুলি ছাড়া আরো কত রকমের যে অদ্ভুত আর অপরিচিত, অর্ধপরিচিত বাদ্যযন্ত্র তিনি সংগ্রহ করেছিলেন তাদের একটি নিখুঁত তালিকা দেওয়া প্রায় অসম্ভব। মেকসিকো থেকে লম্বা ‘ক্ল্যারিন’, আমাজন থেকে কর্কশ ‘তুরে’, সাপের চামড়ায় মোড়া লম্বা সিলিন্ডারের মতো ঢাক–ইত্যাদি ইত্যাদি। এই বাদ্যযন্ত্রগুলির অদ্ভুত চরিত্র তাঁকে মুগ্ধ করেছিল। এই সব দেখে তাঁর কেমন যেন মনে হয়েছিল প্রকৃতির মতো। আর্টের উদগতেও দৈত্য-দানো, রাক্ষস-খোক্ত রয়েছে। তাদের স্বরও বেশ ভয়ঙ্কর। তবু কিছুদিনের মধ্যে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়তেন। সেই ক্লান্তি দূর করার জন্যে তিনি ছুটে যেতেন অপেরাতে; কখনো একা, আবার কখনো বা লর্ড হেনরির সঙ্গে। তানহাউসাররে নাটক দেখে কেমন যেন তন্ময় হয়ে যেতেন; সেই মহান নাটকের প্রস্তাবনায় নিজের জীবনের ট্র্যাজিডি দেখতে পেতেন।
