জনসাধারণের দেওয়া এই সম্মান তিনি গ্রহণ করেছিলেন। লন্ডনের বিভিন্ন ক্লাবে তিনি যে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন এই ভেবে তিনি বেশ আনন্দ পেতেন। জীবনের সম্বন্ধে তিনি কিছু নতুন দিগন্তের সন্ধান দিয়েছিলেন, প্রচার করেছিলেন কিছু নতুন নীতি এবং এদেরই মাধ্যমে পূর্ণ সম্ভোগের প্রযোভনে কী করে প্রবৃত্তিগুলিকে আধ্যাত্মিকতার পথে। পরিচালিত করা যায় সে পথও বাতলে দেওয়ার চেষ্টা তিনি করেছিলেন।
প্রায় এবং ন্যায়তভাবেই প্রবৃত্তির পূজাকে মানুষ প্রশ্রয় দেয়নি; কারণ, ভোগলালসা মানুষকে তার দাসে পরিণত করে, খর্ব করে তাদের ব্যক্তিত্বকে। এরই জন্যে তার ওপরে মানুষের একটা ভীতি জন্মেছে। তাছাড়া, তারা মনে করে অশঙুল সামাজিক জীবনযাপনের পথে এই ভোগলালসা বিপজ্জনক একটা অন্তরাযের সৃষ্টি করে। কিন্তু ডোরিয়েনের মতে প্রবৃত্তির আসল রূপ আর চরিত্র বলতে ঠিক কী বোঝায় তা অনেকেই জানে না। অভুক্ত রেখে পৃথিবী মানুষকে তার দাস করতে চায় বলেই সে চিরকালই বন্য পশুই রয়ে গেল; তার মনে আধ্যাত্মিক। জ্ঞানের আলো না জ্বালিয়ে, সৌন্দর্য উপভোগ করাটাই যে মানুষের শ্রেষ্ঠ আকাঙ্খা হওয়া উচিত এই শিক্কা না দিয়ে পৃথিবী তাকে যন্ত্রণা দিয়ে হত্যা করতে চায় বলেই না তার পাশবিক প্রবৃত্তিটা এত প্রবল হয়ে উঠেছে। মানুষের ইতিহাস আলোচনা করে তিনি ক্ষতির অনুভূতিতে ক্ষুব্ধ হয়েছেন। কত অর্থহীন ক্ষুদ্র উদ্দেশ্য সাধনের জন্যে কত বড়ো জিনিসই না মানুষকে পরিত্যাগ করতে হয়েছে। ইচ্ছা করে মানুষ উন্মাদের মতো অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছে, অনেক নির্যাতন করেছে নিজেকে; তাদের মধ্যে সুস্থ কোনো জীবনবেদ অথবা বোধ নেই যে-সব কাজ করলে তার অধঃপতন ঘটতে পারে বলে সে মনে করে তার চেয়ে অনেক বড়ো অধঃপতনকে সে মনে নিয়েছে জীবনের এই নেতিবাচক উপলব্ধিতো যে অজ্ঞতাকে সে এড়াতে চেয়েছে ভীবলের বিরাট ভাঁওতাকে পাকে-প্রকারে তাকে সেই অজ্ঞতার কুপে লিপে করেছে। যারা ঘরে থাকতে চায় প্রকৃতি তাদের পাঠিয়েছে মরুভূমিতে–সেইখানে তারা বন্য ভক্তদের সঙ্গে বাস করেছে; আবার সঙ্গীর অভাব পূর্ণ করার জন্যে ঋষির কাছে পাঠিয়ে দিয়েছে বন্য প্রাণীদের। একে প্রকৃতির এক নির্মম পরিহাস ছাড়া আর কী বলা যায়?
হ্যাঁ, পূর্ণ উপভোগরে জন্যে, লর্ড হেনরিও সেই রকমই আশা করেন, জীবনটাকে নতুনভাবে। ঢেলে সাজাতে হবে: সেই নির্মম, অশোভনীয় কৃচ্ছসাধনা, আধুনিক যুগে যে আবার মানুষের সমাজে কাযেমী হয়ে বসেছে, তাকে নির্বাসনে পাঠাতে হবে। বোধের দিক থেকে, যুক্তিবাদের দিক থেকে এর প্রয়োজনীয়তা কিছুটা স্বীকৃতি পেলেও, এমন কোনো নীতি মানুষের থাকা। উচিত নয যা তার স্বাভাবিক কামানাকে ধ্বংস করে দিতে পারে। জীবনের উদ্দেশ্যই হচ্ছে অভিজ্ঞতা সঞ্চয; সেই সঞ্চযের ফল ভালো কি মন্দ তা যাচাই করা নয়। কৃচ্ছসাধন মানুষের প্রবৃত্তিগুলিকে বিনষ্ট করে বলেই, অথবা ব্যভিচার মানুষের সূক্ষম অনুভূতিগুলিকে ভোঁতা। করে দেয় বলেই, ওই দুটি জিনিসকেই মানুষের সর্বতোভাবে পরিত্যাগ করা উচিত। জীবন নশ্বর-মহাকালের একটি মুহূর্ত। সত্যিকার সুস্থ জীবনবোধের নীতি হবে এই সহজ কথাটা তাকে জানিয়ে দেওয়া। দান্তের মতে সৌন্দর্যের পূজা করে যাঁরা পূর্ণতা অর্জন করেছেন তিনি। নিজেকে জনসাধারণের কাছে সেইভাবে আত্মপ্রকাশ করলেন। গযতিয়ারের মতো দৃশ্যমান ডগৎটিকে তিনি অস্বীকার করতে পারেননি।
আমাদের মধ্যে এমন কেউ-কেউ রয়েছেন যাঁরা প্রভাতের আগে ভাগে না। জানে না যে তার কারণ হচ্ছে হয় তাঁরা স্বপ্নহীন অবস্থায় সারা রাত মরার মতো ঘুমোন, অথবা সারা রাতই তাঁরা ভীতির আতঙ্ক মাঝে-মাঝে আঁতকে ওঠেন, বিকৃত আনন্দে মুষড়ে থাকেন। এই সময়ে তাঁদের মাথার মধ্যে বাস্তবের চেয়ে অনেক বিপজ্জনক ভৌতিক যারা ঘুরে বেড়ায়, প্রবৃত্তিগুলি সারা রাত ধরে তৈরি করে কল্পনার মিনার। দিবাস্বপ্ন দেখার লেশা যাঁদের ব্রেয়েছে তাঁদেরই মন এইভাবে বিপর্যস্ত হয়ে ওঠে। সাদা আঙুলগুলি ধীরে-ধীরে মশারির ভেতর দিয়ে নড়তে থাকে; ভয়ে-আশঙ্কায় কাঁপতে থাকেন তাঁরা। কিম্ভুতকিমাকার কালো কালো চেহারার ছায়াগুলি ঘরের এক কোণে গুঁড়ি দিয়ে ঢেকে, চুপচাপ বসে অপেক্ষা করে। বাইরে তখন পাখির কাকলি জেগে ওঠে, মানুষ কাজকর্ম শুরু করে, পাহাড়ের গা বেয়ে মৃদু বাতাসের তরঙ্গে কার যেন ফোঁপানির শব্দ শোন যায়; নিস্তব্ধ ঘরটির চারপাশে তারা ঘুরে বেড়ায়; যেন ঘুমন্ত মানুষটিকে জাগিয়ে দিতে তারা ভয় পাচ্ছে। তবু তাকে ভাগাতেই হবে। কর্মমুখর জগতে আর বেশিক্ষণ তাদের ঘুমিয়ে থাকাটা ভালো দেখায় না। ধীরে-ধীরে চারপাশের কুয়াশা কেটে যায়, রাত্রির অন্ধকার কেটে গিয়ে জেগে ওঠে প্রকৃতি প্রাচীন ঢঙে পৃথিবীটাকে আমরা চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। নিষ্প্রভ আয়নার বুকে জীবনের প্রতিবিম্ব ফুটে বেরোয়। নিবে-যাওয়া বাতিগুলি যে জায়গায় আমরা রেখেছিলেন ঠিক সেই জায়গাতেই দাঁড়িয়ে। রয়েছে। তাদের পাশে অনাদরে খোলা অবস্থায় পড়ে রয়েছে বই। ঘুমিয়ে পড়ার আগে এই বই হয়তো তাঁরা পড়ছিলেন। রাত্রির আসরে যে ফুলগুলি নিয়ে আমরা আনন্দ করেছিলেম সেই ফুলগুলি শুকিয়ে গিয়েছে, যে চিঠি আমরা পড়তে ভয় পাই অথবা অনেকবার পড়েছি সেটি হয়তো বিছানার ওপরে পড়ে রয়েছে। রাত্রির অবাস্তব ছায়ার মধ্যে থেকে আমাদের পরিচিত ডদগংটি ধীরে ধীরে জেগে ওঠে। যেখান থেকে আমরা চলে এসেছিলেম আবার সেখান থেকে শুরু করি। আবার আগের মতোই গতানুগতিকভাবে দৈনন্দিন জীবন আমাদের যাপন করতে হবে এই অনস্বীকার্য সত্যটা আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায় অথবা আমরা এই ভেবে চোখ খুলি যে নতুন একটি পৃথিবী নতুন আশা নিয়ে আমার কাছে প্রতিভাত হবে অথবা । আমাদের আনন্দের জলেই সেই পুরনো আশা-আকাঙ্ক্ষাগুলি নতুন রঙে সাজিয়ে তুলবে নিজেদের।
